দেশে জ¦ালানি তেল ও গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট অব্যাহত রয়েছে। ইরানযুদ্ধ এ খাতকে রীতিমতো টালমাটাল করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে ঠিকমতো জাহাজ চলাচল করতে না পারায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে চড়ামূল্যে জ¦ালানি আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গত সপ্তাহে বলেছেন, এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস সংকট স্বাভাবিক পর্যায়ে আসবে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বিদ্যুতের ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ইতোমধ্যে এলএনজিবাহী জাহাজ আসায় দেশে কিছুটা গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। এ মাসে এলএনজিবাহী আটটি জাহাজ আসবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এতে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কাটবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত তো হচ্ছেই, শিল্পকারখানাসহ সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুত সংকট ইস্যু নিয়ে গতকাল ১১ দলীয় জোট ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ কর্মসূচি পালন করেছে। জনসম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে বিরোধীদল রাজনীতি করলে তা সমর্থন পায়। যদিও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে জাতীয় সংসদে সরকারকে বিকল্প পরিকল্পনা ও পরামর্শ দিতে বিরোধীদলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে সাধারণ মানুষ যে চরম ক্ষুব্ধ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা নানাভাবে প্রকাশ করছে। একদিকে গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, আরেক দিকে মাস শেষে তাদের বিল দিতে হচ্ছে। টাকা দিয়ে সেবা না পেলে গ্রাহকদের ক্ষুব্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। এই ক্ষুব্ধতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল। ভুতুড়ে বিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। চলতি মাসের বিল এবং আগের মাসের বিলের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তুলে ধরছে। দেখা যাচ্ছে, আগের মাসের বিলের চেয়ে চলতি মাসের বিল কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণ। অসংখ্য মানুষ এই বাড়তি বিল নিয়ে রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এর কারণ হচ্ছে, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করলেও তাদের ধারণা রয়েছে, কোন মাসে কমবেশি কত বিল আসতে পারে। বিল যখন দ্বিগুণ হয়ে যায়, তখন সঙ্গতকারণেই তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাড়তি বিল নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না। এটি এক-দুজনের ঘটনা নয়। প্রায় সকল বিদ্যুৎ গ্রাহক এই ভুতুড়ে বিলের শিকার হচ্ছেন। যারা এসি ব্যবহার করেন, তারা জানেন, বিদ্যুৎ বিল কত আসতে পারে। ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিংয়ে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকার পরও মাস শেষে যদি দেখে বিল দ্বিগুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনগুণ, তখন তাদের ক্ষুব্ধ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময়েও বিদ্যুতের এমন ভুতুড়ে বিল নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষুব্ধতা ছিল। এমনকি সাধারণ মানুষের ব্যাংকের আমানত থেকেও টাকা কেটে নেয়া হতো। কেন ও কি কারণে মানুষের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ বের করে নেয়া হতো, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যেত না। মানুষকে কষ্টে রেখে উল্টো তাদের কাছ থেকে টাকা বের করে নেয়া কোনো সরকারের জন্যই শুভফল বয়ে আনে না।
বর্তমান সরকার বিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। রাতারাতি অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হয়ে যাবে, তা মনে করার কারণ নেই। সরকার অর্থনীতি সবল করতে কাজ করছে। এর ফল পেতে দেরি হবে। তবে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিৎ, যেভাবেই হোক, কষ্টে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনকে স্বস্তিকর অবস্থায় আনা। বাস্তবতা হচ্ছে, তারা স্বস্তিতে নেই। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, নিত্যপাণ্যের ঊর্ধ্বগতি, আয় কমে যাওয়া, সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া অবস্থা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সরকার সাধারণ মানুষের এই কষ্টের জীবন কতটা উপলব্ধি করছে, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের তরফ থেকে এ নিয়ে পষ্ট কোনো বক্তব্যও নেই। কষ্টে থাকা মানুষকে গ্যাস না পাওয়া সত্ত্বেও বিল কেন দিতে হচ্ছে, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল কেন হচ্ছে, এর ব্যাখ্যা বা জবাব সরকারের দেয়া উচিত। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যই, তা জানাতে হবে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ ও স্বস্তিদায়ক করার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো চক্র বিদ্যুৎ বিল নিয়ে জনগণকে ক্ষুব্ধ করে সরকারের ভাবমর্যাদা নষ্টের ষড়যন্ত্র করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।