অ্যালেক্স হ্যালির ‘রুটস’ উপন্যাসের কুন্তা কিন্তের কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। আফ্রিকা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া সেই মানুষটির দাসজীবনের কাহিনি কেবল একজন মানুষের নয়, একটি গোটা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো নিষ্ঠুরতার ইতিহাস। কিন্তু কুন্তা কিন্তে কি কখনো জানতে পেরেছিলেন, তার দাসত্বের পেছনে ছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রেরও ভূমিকা? নতুন এক ঐতিহাসিক গবেষণা বলছে, আফ্রিকানদের দাস বানিয়ে পাচারের সঙ্গে কয়েক শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ রাজপরিবার গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। এমনকি রাজমুকুটের প্রতীক দিয়ে দাসত্বে নিযুক্ত আফ্রিকানদের শরীরে গরম লোহার ছাপ দেয়া হতো।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, ব্রিটিশ দাস ব্যবসায়ীদের নতুন ঐতিহাসিক নিবন্ধে দেশটির দাস ব্যবসায় বিনিয়োগকারী হাজারো ব্যক্তির তথ্য উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রাজা ও রানীরাও ছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, রানী প্রথম এলিজাবেথের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৫৬০-এর দশকে শুরু হওয়া দাস পাচারের প্রথম দিকের সমুদ্রযাত্রা থেকে শুরু করে দাস পাচারকারী বিভিন্ন কোম্পানিতে রাজপরিবারের বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই রাজতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ড. নিকোলাস র্যাডবার্ন সাউথ সি কোম্পানির আর্কাইভে আফ্রিকানদের শরীরে গরম লোহার ছাপ দেয়ার প্রমাণ পেয়েছেন। ব্রিটিশ রাজমুকুটের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই কোম্পানি ১৭০০-এর দশকে হাজারো আফ্রিকানকে দাস বানিয়ে বিভিন্ন বাগানে নিয়ে যেত।
র্যাডবার্ন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের পাঠানো একটি চিঠি খুঁজে পান। বুয়েনস আইরেসে কোম্পানির এজেন্টদের পাঠানো ওই চিঠিতে দাসদের শরীরে গরম লোহার ছাপ দেয়ার নির্দেশ ছিল। ছাপটিতে ছিল রাজমুকুটের প্রতীক। একজন চিকিৎসক এ ধরনের দাগ দেয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু পর্ষদ তার পরামর্শ উপেক্ষা করে নির্দেশ কার্যকর করতে বলে। ওই পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে এমপি ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের পরিচালকসহ ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী অভিজাতরা ছিলেন।
চিঠিতে বলা হয়, অন্যদের থেকে নিজেদের দাসদের আলাদা করে চেনার জন্য এই ছাপ দেয়া ‘সবচেয়ে কার্যকর’ পদ্ধতি। পরিচালকেরা একটি রুপার ছাপও পাঠিয়েছিলেন। নির্দেশ ছিল, সেটি আগুনে লাল করে দাসদের বাম কাঁধে বসাতে হবে।
র্যাডবার্ন বলেন, লন্ডনের অভিজাত শ্রেণির এসব মানুষ বোর্ডরুমে বসে আটলান্টিকের ওপারে দাসদের ওপর কীভাবে সহিংসতা চালানো হবে, তা নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা করতেন। ওই নির্দেশের ফলেই মানুষের শরীর গরম লোহার ছাপে পুড়েছে।
‘ব্রিটিশ দাস ব্যবসায়ীদের নিবন্ধ’-এ বলা হয়েছে, প্রায় ২৫০ বছর ধরে ৩০ লাখের বেশি আফ্রিকানকে দাস বানিয়ে পাচার করা হয়েছিল। এটি ছিল রাজাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ব্রিটেনের একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। নিবন্ধটির প্রধান ইতিহাসবিদ অধ্যাপক উইলিয়াম পেটিগ্রু বলেন, ১৭ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজ দাস ব্যবসায়ী ছিলেন রাজা দ্বিতীয় জেমস। তার ভাষায়, আফ্রিকান কোম্পানিগুলো রাজতন্ত্রকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ ছিল।
১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর দাস ব্যবসা আরো বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয় জেমস হওয়ার আগে ইয়র্কের ডিউক জেমস ছিলেন ১৬৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানির গভর্নর ও বড় শেয়ারহোল্ডার। এই কোম্পানি দাস ব্যবসায়ের ইতিহাসে অন্য যেকোনো একক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি আফ্রিকান নারী, পুরুষ ও শিশুকে পাচার করেছিল। কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জেমসের ভাই রাজা দ্বিতীয় চার্লস। রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও অর্থায়নকারীরাও এতে যুক্ত ছিলেন। দাস পাচার নিয়ে কোম্পানির বৈঠক হতো হোয়াইটহল প্রাসাদে জেমসের ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্টে।
অধ্যাপক ব্রুক নিউম্যান তার ‘দ্য ক্রাউন’স সাইলেন্স’ বইয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের এই দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তার গবেষণা অনুযায়ী, রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানি দাসদের শরীরেও নিজেদের চিহ্ন দিত। ডিউক অব ইয়র্কের জন্য ‘ডিওয়াই’ এবং রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানি অব ইংল্যান্ডের জন্য ‘রেস’ চিহ্ন ব্যবহার করা হতো। সিয়েরা লিওনের উপকূলের কাছে শেরব্রো দ্বীপে কোম্পানির এক এজেন্টকে দাসদের ডান বুকে ‘রেস’ চিহ্ন দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। শিশুদের তিন বছর বয়সে সেই চিহ্ন দেয়ার কথাও বলা হয়।
১৭১৩ সালের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে রানী অ্যান স্পেনের রাজা পঞ্চম ফিলিপের কাছ থেকে বছরে ৪ হাজার ৮০০ আফ্রিকান দাস স্পেনের আমেরিকান উপনিবেশে সরবরাহের অধিকার পান। অ্যান এই চুক্তি সাউথ সি কোম্পানিকে দেন। কোম্পানিটি তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানিকে। অ্যানের উত্তরসূরি প্রথম জর্জ ও দ্বিতীয় জর্জও সাউথ সি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছিলেন।
‘স্লেভ ভয়েজেস’ তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১৭১৪ থেকে ১৭৪০ সালের মধ্যে সাউথ সি কোম্পানি পশ্চিম আফ্রিকা ও মাদাগাস্কার থেকে ৪৩ হাজার ২২০ জন আফ্রিকান বন্দিকে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও স্পেনের আমেরিকান উপনিবেশে পাচার করে। পরে তাদের আবার পাচার করা হয়। কেউ কেউ শত শত মাইল স্থলপথে হাঁটতে বাধ্য হন। আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও ৫০ হাজারের বেশি দাসকে স্থানান্তর করা হয়। লন্ডন থেকে যাত্রা করা এসব দাসবাহী জাহাজে প্রায় ৭ হাজার মানুষ মারা যায়।
র্যাডবার্নের ভাষায়, ‘এটি ছিল নির্মম, রাজতন্ত্রের সমর্থনপুষ্ট একটি কোম্পানি। আর দাসদের পাচারই ছিল এর মূল কর্মকাণ্ড।’
রাজা তৃতীয় চার্লস দাসত্বকে ‘ভয়াবহ নৃশংসতা’ এবং ‘আমাদের অতীতের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকগুলোর’ একটি বলে বর্ণনা করেছেন। ২০২৩ সালে তিনি প্রথমবার ব্রিটিশ রাজপরিবারের আটলান্টিকপাড়ি দাস ব্যবসার ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দেন। তবে ব্রিটেনের দাস ব্যবসা বা এতে রাজপরিবারের ভূমিকার জন্য তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাননি।
আগামী নভেম্বরে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠকের আগে আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে চার্লসের ওপর এ ইতিহাস স্বীকার করার চাপ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। জ্যামাইকার একটি সরকারি প্রতিনিধিদল গত সপ্তাহে চার্লসের কাছে আবেদন দিয়েছে। তারা জানতে চেয়েছে, আফ্রিকানদের জোর করে জ্যামাইকায় নিয়ে যাওয়া আইনসম্মত ছিল কি না, তা মানবতাবিরোধী অপরাধ ছিল কি না এবং দাসত্বের জন্য ব্রিটেনকে জ্যামাইকাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কি না।
বারবাডোসের রাষ্ট্রদূত ডেভিড কমিশং বলেন, চার্লস সাংবিধানিকভাবে সরকারের নীতির বাইরে যেতে পারেন না। তবে ব্রিটেনের অন্যান্য প্রভাবশালী পরিবার যখন দাস ব্যবসায় নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেছে এবং ক্ষতিপূরণের আগ্রহ দেখিয়েছে, তখন ব্রিটিশ রাজপরিবারেরও একইভাবে কাজ করা উচিত।
কুন্তা কিন্তের শরীরে যে দাসত্বের অদৃশ্য ইতিহাসের ভার চাপানো হয়েছিল, তার পেছনের গল্প তাই শুধু দাস ব্যবসায়ীদের নয়। সেই গল্পের পাতায় ব্রিটিশ রাজমুকুটের ছাপও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।