বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শিশির মনির জুলাই সনদের বিরোধিতা প্রসঙ্গে বলেছেন, এটি শুধু একটি দলিলের বিরোধিতা নয়। এটি মূলত ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের দর্শনের বিরোধিতা। যারা চান না রাষ্ট্রপতির কিছু স্বাধীন ক্ষমতা থাকুক, যারা চান না নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হোক, যারা চান না বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের বাইরে কাজ করুক- তারা মূলত এই সংস্কার দর্শনের বিরোধিতা করছেন।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে গতকাল এক সাক্ষাৎকারে অ্যাডভোকেট শিশির মনির এ কথা বলেন। তিনি গণভোটের প্রস্তাব কিভাবে এলো, এ নিয়ে কিভাবে সবাই ঐকমত্য কমিশনের সভায় একমত হলেন আর এখন কেন এর বিরোধিতা তা নিয়ে বিস্তারিতভাবে কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-
নয়া দিগন্ত : সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ, রাজনৈতিক দল এবং জনপরিসরে জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। আপনি এই বিতর্ককে কিভাবে দেখছেন?
শিশির মনির : খুব খোলাখুলি বললে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের নিয়ে বিভ্রান্ত। আমি প্রায়ই ভাবি, বিদেশীরা আমাদের দেখে কী ভাবছে? কয়েক মাস আগেও তারা দেখেছে- একটি গণ-অভ্যুত্থান হলো, সরকার পরিবর্তন হলো, রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা শুরু হলো। তারপর তারা আবার দেখছে, যারা একসাথে বসে সংস্কারের কথা বলেছিল, তারাই এখন সংস্কারের বিরোধিতা করছে। আমার কাছে মনে হয়, আমরা যেন একটি জাতীয় আত্মবিরোধিতার মধ্যে বাস করছি। এ কারণেই আমি বলি, সংবিধানের যদি মুখ থাকত, তাহলে সে হয়তো জাতীয় সংসদের দিকে তাকিয়ে বলত- ‘আমাকে নিয়ে আর টানাটানি করবেন না।’
নয়া দিগন্ত : আপনি কেন মনে করেন সংবিধানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
শিশির মনির : কারণ একই রাজনৈতিক শক্তি সুবিধামতো কখনো সংবিধানের ভেতরে যায়, কখনো সংবিধানের বাইরে আসে। আমি একটা সরল প্রশ্ন করি- অন্তর্বর্তী সরকার কি সংবিধানের প্রচলিত কাঠামোর ভেতরে গঠিত হয়েছিল? সংসদ ভেঙে দেয়া, সংস্কার কমিশন গঠন, ঐকমত্য কমিশন প্রতিষ্ঠা- এসব কি সংবিধানের বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী হয়েছিল? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে তখন কোনো সমস্যা ছিল না কেন? আর আজ যখন সংস্কারের কিছু ফলাফল বাস্তবায়নের প্রশ্ন এসেছে, তখন হঠাৎ করে সংবিধানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কেন?
নয়া দিগন্ত : আপনি কি মনে করেন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলেছে?
শিশির মনির : শুধু অবস্থান বদলায়নি, অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের পূর্ববর্তী বক্তব্যও অস্বীকার করছে। আমি নিজে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার সাথে যুক্ত ছিলাম। সেখানে যেসব রাজনৈতিক দল আজ আপত্তি তুলছে, তাদের প্রতিনিধিরাই বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। আজ যদি তারা বলেন, ‘আমরা এসব মানি না,’ তাহলে জনগণ প্রশ্ন করবে- তাহলে তখন কী করছিলেন?
নয়া দিগন্ত : গণভোটের প্রসঙ্গটি কিভাবে সামনে এলো?
শিশির মনির : ঐকমত্য কমিশনে একটা পর্যায়ে গিয়ে আলোচনা অচল হয়ে যায়। বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে একমত হওয়া যাচ্ছিল না। তখন আলোচনার বাইরে বিরতির সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করেন। সেখানেই প্রশ্ন ওঠে- আমরা তো জনগণকে জিজ্ঞাসা করিনি, তাহলে জনগণের কাছে যাওয়া হবে না কেন? সেখান থেকেই গণভোটের ধারণা আসে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই প্রস্তাব কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের ছিল না। এটি ছিল বহু পক্ষের আলোচনার ফল।
নয়া দিগন্ত : তখন কি কেউ আপত্তি তুলেছিল যে সংবিধানে গণভোটের বিধান নেই?
শিশির মনির : হ্যাঁ, সেই প্রশ্ন উঠেছিল। তখন একজন সদস্য বলেছিলেন, ‘সংবিধানে তো গণভোট নেই।’ এর জবাবে আরেকজন প্রশ্ন করেছিলেন- ‘সংবিধানে কি কোথাও লেখা আছে যে গণভোট করা যাবে না?’ সবাই উত্তর দিয়েছিল- ‘না।’ এরপর সবাই একমত হয়েছিল যে জনগণের মতামত নেয়া যেতে পারে। এখন যারা বলছেন গণভোটের কোনো মূল্য নেই, তাদের অনেকেই সেই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।
নয়া দিগন্ত : আপনি ৭০ শতাংশ সমর্থনের কথা বারবার বলছেন। কেন এটিকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
শিশির মনির : কারণ এটি কোনো রাজনৈতিক দলের রায় নয়, জনগণের রায়। আমরা বারবার বলি জনগণই ক্ষমতার উৎস। তাহলে যখন জনগণ সরাসরি মতামত দেয়, তখন সেই মতামতকে কি উপেক্ষা করা যায়? ৭০ শতাংশ মানুষ যদি একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, তাহলে গণতান্ত্রিক নৈতিকতার দিক থেকে সেটি অত্যন্ত শক্তিশালী ম্যান্ডেট। এখন যদি সেই ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করা হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে- জনগণের মতামত আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কি না।
নয়া দিগন্ত : আপনি প্রায়ই ‘অশ্বডিম্ব’ ও ‘ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার’ উপমা ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে কী বোঝাতে চান?
শিশির মনির : এটি মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করেছি। ধরা যাক, কেউ বলল এই গণভোট অবৈধ ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো গণভোট হয়ে গেছে, মানুষ ভোট দিয়েছে, ফলাফল এসেছে। অর্থাৎ ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়ে গেছে। এখন আপনি ডিমের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু বাচ্চার অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারবেন না। গণভোটের ক্ষেত্রেও একই বিষয়।
নয়া দিগন্ত : ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আপনার আপত্তি কোথায়?
শিশির মনির : আপত্তি নয়, বরং উদ্বেগ। কারণ ১৩৩টি অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে সংস্কার কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তার বড় অংশকে বাতিল করার সুপারিশ এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যেসব অধ্যাদেশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে, সেগুলোর বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি আপত্তি দেখা যাচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : উদাহরণ দেবেন?
শিশির মনির : অবশ্যই। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব এসেছে। আমি প্রশ্ন করি- গুম প্রতিরোধের আইন বাতিল করতে চাওয়ার কারণ কী? বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নতুন নয়। আয়নাঘর, গোপন আটক, বিচারবহির্ভূত নিপীড়ন- এসব নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। তাহলে গুম প্রতিরোধ আইন বাতিল করার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে?
নয়া দিগন্ত : মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও আপনি সমালোচনা করেছেন।
শিশির মনির : কারণ নতুন ব্যবস্থায় মানবাধিকার কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। চেয়ারম্যান নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটির ব্যবস্থা ছিল। সরকারের ইচ্ছামতো অপসারণের সুযোগ সীমিত করা হয়েছিল। স্বপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য জড়িত থাকলেও তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছিল। এগুলো তো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ।
নয়া দিগন্ত : বিচার বিভাগীয় সচিবালয় নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?
শিশির মনির : বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন আছে। যদি বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকে, তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবে সীমিত হয়ে যায়। পৃথক সচিবালয় সেই সমস্যা সমাধানের একটি প্রচেষ্টা ছিল।
নয়া দিগন্ত : সংস্কারের মূল দর্শন কী ছিল?
শিশির মনির : মূল দর্শন ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি ক্ষমতা ধীরে ধীরে একজন ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই পরবর্তীতে কর্তৃত্ববাদ সৃষ্টি করেছে। সংস্কারের লক্ষ্য ছিল- প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, নিয়োগে স্বচ্ছতা, ক্ষমতার পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা।
নয়া দিগন্ত : তাহলে জুলাই সনদের বিরোধিতা আসলে কিসের বিরোধিতা?
শিশির মনির : আমার মতে, শুধু একটি দলিলের নয়। এটি মূলত ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের দর্শনের বিরোধিতা। যারা চান না রাষ্ট্রপতির কিছু স্বাধীন ক্ষমতা থাকুক, যারা চান না নির্বাচন কমিশন স্বাধীন হোক, যারা চান না বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের বাইরে কাজ করুক- তারা মূলত এই সংস্কার দর্শনের বিরোধিতা করছেন।
নয়া দিগন্ত : বিএনপির ভূমিকা নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলেছেন কেন?
শিশির মনির : কারণ বাংলাদেশের গণভোটের ইতিহাসে বিএনপির অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমান গণভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা নিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার আমলেও গণভোট হয়েছে। তাই গণভোটের অর্থ তারা বোঝেন না- এটা আমি বিশ্বাস করি না।
নয়া দিগন্ত : তাহলে আপনার চূড়ান্ত মূল্যায়ন কী?
শিশির মনির : আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- জনগণের চেয়ে বড় কে? আমরা যদি বলি জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস, তাহলে জনগণের প্রত্যক্ষ রায়কেও সম্মান করতে হবে। আমি মনে করি, জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছিল। সেই সুযোগ ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তি, নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার। আজ যদি আমরা সেই সুযোগ হারাই, তাহলে হয়তো ইতিহাস একদিন বলবে- বাংলাদেশ আবারো সংস্কারের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে ফিরে এসেছিল।
নয়া দিগন্ত : ধন্যবাদ।