মানুষ জন্মের সময় সব শিখে আসে না। সময়ের সাথে সাথে নানা রকম ঘটনা প্রবাহ, পরিশ্রম, ভুল-ভ্রান্তি ইত্যাদির মধ্য দিয়েই মানুষ জ্ঞান অর্জন করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মেশিনের পক্ষেও একইভাবে শেখা সম্ভব। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে মানুষের সমান বুদ্ধিমত্তা অর্জন করা সম্ভব। আমরা অনেক কষ্ট করে পড়ে শিখি এবং সেটা বিভিন্ন কাজে লাগাই। এমনকি মেশিনকে দিয়ে কাজ করাই। তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মেশিনও নিজে নিজে শেখে এবং সে অনুযায়ী নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা কাজে লাগিয়ে নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্য মেশিন বিশাল তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে। এটাই ‘বিগ ডেটা’। বিগ ডেটা যে কত বড় তা কল্পনা করাও কঠিন।

আমাদের জানতে হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে কি? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বলতে বস্তুতপক্ষে যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তাকে বোঝায়। প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে কম্পিউটার বা মেশিনকে কিছু ইন্সট্রাকশন দেয়া হয়। কম্পিউটার বা মেশিনগুলো সেই অনুযায়ী কাজ করে। আর যখন মেশিন সেই প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ বিশ্লেষণ করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় এবং কোনো একটি কাজ সফলভাবে করে তখন সেটাকে আমরা বলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এক কথায় মেশিনকে মানুষের সমান বুদ্ধিমত্তা দেয়ার সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিংকে বলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ১৯৫০ সালের দিকে এলান টিউরিং একটি মেশিন বুদ্ধিমান কিনা, তা পরীক্ষা করার জন্য একটি টেস্টের কথা বলেছিলেন, যা টিউরিং টেস্ট নামে পরিচিত। ঐ সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অনেক রিসার্চ হলেও পরে কম্পিউটেশনাল পাওয়ারের ঘাটতির কারণে অনেক দিন বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে কম্পিউটারের প্রসেসিং পাওয়ার বাড়ার সাথে সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আবার রিসার্চ শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হলো Artificial Narrow Intelligence (ANI), Artificial General Intelligence (AGI) এবং Artificial Super Intelligence (ASI). আমরা এখন আছি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সির প্রথম ধাপে অর্থৎ Artificial Narrow Intelligence (ANI) ধাপে। ANI সিস্টেম ১৯৯৭ সালে মানুষকে হারিয়ে তার দাপট শুরু করে। ‘ডিপ ব্লু’ নামের একটি কম্পিউটার বিশ্বখ্যাত দাবার তৎকালীন গ্রান্ডমাস্টার চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকে হারিয়ে দিয়ে হইচই ফেলে দেয়। তারপরের বছরেই আলফা গো মানুষকে হারায় ANI ব্যবহার করে। আলফা গো নামক কম্পিউটার প্রোগ্রামটি তৈরি করে গুগলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডিপমাইন্ড। আমাদের হাতের স্মার্টফোনটিতে অনেকগুলো ANI প্রোগ্রাম রয়েছে। ফোনের সবচেয়ে সফল ANI প্রোগ্রাম হচ্ছে সিরি বা কর্টনা।

২০৪০ থেকে ২০৬০ সালকে দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ Artificial General Intelligence (AGI) বলে বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছে। একে Strong AI ev Human Level AI বলা হচ্ছে। AGI ধাপে যন্ত্র মানুষের মতো চিন্তা করতে পারবে, পরিকল্পনা করতে পারবে, সমস্যা সমাধান করতে পারবে অর্থাৎ নতুন ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করবে। এরপর আসবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের তৃতীয় ও সর্বাধুনিক পর্যায়। এটি হবে Artificial Super Intelligence (ASI). ২০৬০ পরবর্তী বিশ বছরকে ASI মানুষ থেকে আরও দক্ষভাবে চিন্তা করতে পারবে। এটি হবে আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স। কম্পিউটারের সুবিধা হলো সেসব সময় প্রাপ্ত তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতে সেই সব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অনেকগুলো সাব সেট রয়েছে, অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনেকগুলো জটিল বিষয়ের সমষ্টি। তার মধ্যে মেশিন লার্নিং অন্যতম। মেশিন লার্নিংয়ের আরেক সাব সেট হচ্ছে ডিপ লার্নিং। এর মাধ্যমে সিস্টেমকে অনেক তথ্য একবারে দেয়া হয়, যাতে করে মেশিন সেখান থেকে শিখতে পারে এবং পরবর্তীতে একই রকম পরিস্থিতিতে নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আমরা চাই বা না চাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাদ দিয়ে আমরা চলতে পারবো না। নানারকম প্রযুক্তিনির্ভর সেবার উপর এখন আমরা নির্ভরশীল। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে এখন মানবকল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে করে মানুষের জীবন এখন অনেক সহজ স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে উঠছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অনেক আগেই শুরু হয়েছে এবং দিনদিন এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোভিড-১৯ মোকাবেলায়ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়ছিলো। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিবিষয়ক পলিসি মেকিং, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সির বিশ্লেষণের দক্ষতা কাজে লাগানো হচ্ছে। হেলথ ট্র্যাকার ডিভাইসগুলো এখন অনেক জনপ্রিয়। এটাকে অনেকেই স্মার্টওয়াচ হিসেবেও ব্যবহার করে থাকেন। আকর্ষণীয় এই ছোট ডিভাইসগুলোতে খুব ছোট পরিসরে এআই ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নানা রকম তথ্য এখানে থাকে। এছাড়াও দিতে পারে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং রাখতে পারে রেকর্ড। এআই পরিচালিত চিকিৎসক রোবটগুলোর সাহায্যে জটিল সব অপারেশন করা হচ্ছে, যা মানুষের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব ছিলো।

বাংলাদেশে দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিতে মোবাইল ফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্মার্ট সমাজ গঠনে এটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। টেলিনর এশিয়া ডিজিটাল লাইভস ডিকোডেড ২০২৫: বিল্ডিং ট্রাস্ট ইন বাংলাদেশ’স এআই ফিউচার’ শীর্ষক এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে বর্তমানে বাংলাদেশে শতকরা ৯৬ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিয়মিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে আর্থিক সেবা গ্রহণ, দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন ও তথ্যপ্রাপ্তিÑ সবক্ষেত্রে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মোবাইল ফোন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে দৈনন্দিন এসব সুবিধা, যার প্রভাবে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে মানুষের জীবন, কর্মসংস্থান ও পারস্পারিক যোগাযোগের ধারায়।

বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষায় শতকরা ৬২ ভাগ, দূরবর্তী কাজে শতকরা ৫৪ ভাগ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শতকরা ৫০ ভাগের মতো ক্ষেত্রে স্মার্ট জীবনধারাকে এগিয়ে নিচ্ছে মোবাইল প্রযুক্তি। প্রজন্মভেদেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে পার্থক্য রয়েছে। স্মার্ট হোম ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত ফিচারের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করছে মিলেনিয়াররা। মোবাইল ব্যবহারের বিস্তৃতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও গভীরভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতি ১০ জনের মধ্যে কম-বেশি ৬ জন এখন প্রতিদিন কোনো না কোনো ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে। অনেকেই স্কুল, অফিস বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কনটেন্ট তৈরি এবং স্বাস্থ্য, আর্থিক সেবা বা ভ্রমণ পরিকল্পনার মতো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরামর্শ পেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছে। কর্মক্ষেত্র, দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং অনলাইনে কেনাকাটায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি শিক্ষামূলক কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটের ওপর মানুষের আস্থা বেশি। কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের হার ২০২৫ সালে শতকরা ৪৪ ভাগ থেকে বেড়ে ৬২ ভাগে পৌঁছেছে। কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত কনটেন্ট লেখা ও তৈরির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আরো বহু কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বহুদিন আগেই সতর্ক করেছিলেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) মানুষের জন্য যেমন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, তেমনি হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর হুমকি। সে কথাই আবার নতুন করে শোনালেন প্রযুক্তিবিদ এরিক স্মিড। গুগলের সাবেক চেয়ারম্যান এরিক স্মিড মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের স্বর্ণযুগ এখন। এখনকার কৃত্রিম বুদ্ধিমান যন্ত্র রোগ নিরাময়ে সাহায্য করার পাশাপাশি মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে। তবে মানুষের ধ্বংস ডেকে আনার হাতিয়ারও হতে পারে এটা। তাই, প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে সবার জন্য সংযোগ ও নিরাপদ ডিজিটাল দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। নিরাপদভাবে ডিজিটাল দুনিয়া পরিচালনা করতে না পারলে মানুষ ডিজিটাল ইকোসিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রদত্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। আমাদের সকলের দায়িত্ব হলো আগামীর নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য ডিজিটাল বৈষম্য কমানো।

লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews