আগামী ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্কারবরো সাউথওয়েস্টের বহুল আলোচিত প্রাদেশিক উপনির্বাচন। বৃহত্তর টরন্টো নগরীর এই নির্বাচনী এলাকার পাড়ায় পাড়ায় এখন নির্বাচনী আমেজ। বাড়ির আঙিনায় সারি সারি প্রার্থীর সাইন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় রং। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে ডোর নকিং। প্রার্থীরা ভোটারদের দরজায় কড়া নাড়ছেন, হাত মেলাচ্ছেন, ছবি তুলছেন, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। তাঁদের সঙ্গে থাকছেন দলীয় নেতাকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, এমনকি দলীয় প্রধানও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেও দেখা যাচ্ছে একই দৃশ্য। কোথাও প্রার্থী মসজিদে, কোথাও মন্দিরে। কেউ হিজাব পরে, কেউ পাঞ্জাবি পরে মুসল্লিদের সামনে দাঁড়াচ্ছেন। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সঙ্গে বৈঠক করছেন, বক্তব্য দিচ্ছেন। আবার মন্দিরে গিয়ে পুরোহিত ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন, দর্শনার্থীদের কাছে ভোট চাইছেন।

সবই ঠিক আছে। কানাডার বহুজাতিক সমাজে মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যাওয়া রাজনৈতিক প্রচারণারই অংশ। কিন্তু পুরো প্রচারণার ছবিটি দেখলে কোথাও যেন একটি বড় শূন্যতা চোখে পড়ে। মনে হয়, প্রার্থীরা পরিচিত একটি বৃত্তের মধ্যেই ঘুরছেন। মসজিদ আর কয়েকটি মন্দিরে তাঁদের উপস্থিতি যতটা দৃশ্যমান, এলাকার চার্চ, গুরুদোয়ারা, প্যাগোডা এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ততটা দেখা যাচ্ছে না। অন্তত তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই উপস্থিতির কোনো পোস্ট আমার চোখে পড়েনি।

অথচ স্কারবরো সাউথওয়েস্টের ধর্মীয় জনবিন্যাস বলছে অন্য কথা। ২০২১ সালের জনগণনায় এই নির্বাচনী এলাকার ১ লাখ ১০ হাজার ৯৫ বাসিন্দার ধর্মীয় পরিচয়ের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে ৫১ হাজার ১৮৫ জন খ্রিষ্টান, যা মোট জনসংখ্যার ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ খ্রিষ্টানরাই এই এলাকার সবচেয়ে বড় ধর্মীয় জনগোষ্ঠী।

এরপর বৌদ্ধ, শিখ, ইহুদি, আদিবাসী ও অন্যান্য মতবাদের অনুসারী মিলিয়ে রয়েছেন ২৯ হাজার ৭০৫ জন। তাঁরা স্কারবরো সাউথওয়েস্টের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। সম্মিলিতভাবে খ্রিষ্টানদের পর তাঁরাই এলাকার দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। এরপর রয়েছেন মুসলিম ১৯ হাজার ৯৬০ জন বা ১৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং হিন্দু ৯ হাজার ২৫৫ জন বা ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। বিগত পাঁচ বছরে এলাকার জনবিন্যাসে আরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে।

এলাকার ধর্মীয় বৈচিত্র্য শুধু জনগণনার ছকেই সীমাবদ্ধ নয়। স্কারবরো সাউথওয়েস্টের বিভিন্ন এলাকায় চার্চ ও অন্যান্য উপাসনালয় মিলিয়ে অন্তত ৪৪টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত রয়েছে। ফলে নির্বাচনী এলাকায় চার্চের উপস্থিতি যে মসজিদ বা মন্দিরের তুলনায় অনেক বেশি, সেটি সহজেই বোঝা যায়।

এগুলো কেবল প্রার্থনাস্থল নয়। অনেক চার্চে খাদ্যসহায়তা, প্রবীণদের কর্মসূচি, শিশু ও তরুণদের কার্যক্রম, কাউন্সেলিং, কমিউনিটি সভা এবং সামাজিক অনুষ্ঠান হয়। কোনো প্রার্থী যখন এসব প্রতিষ্ঠানে যান, তিনি শুধু ধর্মীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন না; একই সঙ্গে এলাকার প্রবীণ, দীর্ঘদিনের বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পান।

একই কথা প্রযোজ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের ভেতরের বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও। সব হিন্দু ভোটার একই ভাষা, একই অঞ্চল বা একই সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষ নন। বাঙালি হিন্দু ছাড়াও এ এলাকায় তামিল ও পাঞ্জাবি হিন্দুরা রয়েছেন। তাঁদের নিজস্ব মন্দিরের পাশাপাশি রয়েছে আঞ্চলিক ও ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। একইভাবে শিখদের গুরুদোয়ারা এবং বৌদ্ধদের প্যাগোডাও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু উপাসনার স্থান নয়; এগুলো সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সামাজিক বন্ধনের কেন্দ্র।

কোনো বড় জনগোষ্ঠীর সবার কাছে শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাঁদের কাছে যেতে হবে কমিউনিটি সেন্টার, আবাসিক ভবন, পার্ক, শপিং সেন্টার, স্কুলসংলগ্ন এলাকা, শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সমিতি, ক্রীড়া সংগঠন এবং ঘরে ঘরে প্রচারণার মাধ্যমে। মসজিদ, মন্দির বা চার্চে উপস্থিত ভোটারদের সঙ্গে কথা বলা সহজ; কিন্তু যাঁরা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যান না, তাঁদের খুঁজে বের করাই একজন প্রার্থীর প্রচারণার আসল পরীক্ষা।

এ আসনে আলোচনায় থাকা প্রার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন কি না, সেটি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। গিয়ে থাকলে ভালো। কিন্তু তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মসজিদ ও মন্দির সফরের যে ধারাবাহিক প্রচার দেখা যাচ্ছে, চার্চ, গুরুদোয়ারা, প্যাগোডা কিংবা অন্য সম্প্রদায়ের কেন্দ্রে যাওয়ার তেমন কোনো ছবি বা তথ্য নজরে পড়েনি। না গিয়ে থাকলে প্রশ্ন উঠবে, কেন যাননি? আর গিয়ে থাকলে সেই যোগাযোগের কথাও ভোটারদের জানানো উচিত। তাতে অন্তত বোঝা যাবে, প্রচারণাটি নির্দিষ্ট কয়েকটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আটকে নেই।

কানাডার মূলধারার রাজনীতি করতে হলে শুধু নিজের পরিচিত সম্প্রদায়ের ভাষা বুঝলেই হয় না, পুরো নির্বাচনী এলাকার ভাষা বুঝতে হয়। নির্বাচনের আগে হিজাব, টুপি বা পাঞ্জাবি পরে কোনো উপাসনালয়ে উপস্থিত হওয়া সহজ। কঠিন কাজটি হলো ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভাষা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কাছেও সমান আন্তরিকতায় পৌঁছানো। তাঁদের সমস্যা শোনা এবং তাঁদেরও নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা।

স্কারবরো সাউথওয়েস্টের নির্বাচনী হিসাব খুব পরিষ্কার। মুসলিম ও হিন্দু মিলিয়ে জনসংখ্যা ২৯ হাজার ২১৫। অন্যদিকে শুধু খ্রিষ্টানই ৫১ হাজার ১৮৫ জন। মুসলিম ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর বাইরে রয়েছেন প্রায় ৮১ হাজার বাসিন্দা। কাজেই শুধু মসজিদ ও পরিচিত কয়েকটি মন্দির ঘুরে এ আসনের পুরো সমাজকে ছোঁয়া সম্ভব নয়। যে প্রার্থী এই পরিচিত বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে পুরো স্কারবরো সাউথওয়েস্টকে দেখতে পারবেন, তিনিই সত্যিকার অর্থে কানাডার মূলধারার রাজনীতি করার দাবি করতে পারবেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews