গত শনিবার (৮ আগস্ট) ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করছে। তবে সরকার এই সংকট থেকে দেশ ও মানুষকে বের করে আনার কাজ শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, তখন একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পেয়েছি। দুর্বল অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন, ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে দেশকে সফলভাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে সরকার। তবে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা বসে নেই। বিগত দিনের অপরিকল্পিত প্ল্যান ও প্রজেক্টগুলো জ্বালানি খাতকে বিপদের মুখে ফেলেছে। সরকার এগুলো ঠিক করে দেশকে সংকট থেকে বের করে আনার কাজ করছে। দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট নতুন কিছু নয়। এ থেকে উত্তরণের পথ যেন তৈরি করা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন সংকট গভীর থেকে গভীর হচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপর এই পুরনো সংকটের সাথে ইরানযুদ্ধে বৈশ্বিক সংকট যুক্ত হয়ে তা খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় ঘাপটি মেরে থাকা পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসরদের ষড়যন্ত্র থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে সরাসরি এ কথা বলেছেন। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট রয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই সংকট উত্তরণে সরকারকে অধিক কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ষড়যন্ত্র আছে, তবে সরকারকে শুধু এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’কে দায়ী করলে হবে না। এটা মোকাবেলা করেই সমস্যার সমাধানে পৌঁছতে হবে।
গতকাল দৈনিক নিউ এজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিদ্যুৎ সংকটে গ্রামীণ জনজীবন একেবারে জেরবার হয়ে গেছে। এর মধ্যে রাজশাহীর অবস্থা খুবই করুণ। ২৪ ঘন্টার মধ্যে এই বিভাগের মানুষকে প্রায় ২০ ঘন্টাই লোডশেডিংয়ের শিকার হতে হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র রাজশাহী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষির বড় একটি উৎস এ অঞ্চল। এর সাথে রংপুর বিভাগের জেলাগুলো গভীরভাবে সম্পৃক্ত। রাজশাহী ও রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সহ এতদঞ্চলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রের অন্যতম হাব বলা যায়। এই এলাকায় যখন চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বিশ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি এবং জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা ব্যাখ্যা করে বলার কিছু নেই। গ্যাস-বিদ্যুতের এই সংকট এখন সারাদেশেই চলছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার বা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই চিত্র সারাদেশেই বিরাজমান। এর কারণ কি, তা সরকারের চেয়ে ভালো কেউ জানে না। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ সংকট কেন লেগে আছে, কেন সমাধান করা যাচ্ছে না, কোথায় বাধা রয়েছে, এসব প্রতিবন্ধকতা অ্যাড্রেস করে সরকারকেই তার প্রতিকার করতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ মানুষের জীবনে অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। এছাড়া জনজীবন অচল। শিল্পকারখানার উৎপাদন এর উপরই নির্ভর করে। অর্থনীতি যে শ্লথ হয়ে আছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অপ্রতুলতা। অর্থনীতিকে সচল করতে যে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের স্বতঃস্ফূর্ততা প্রয়োজন, তার অন্তরায় হয়ে আছে এই সংকট। সরকার যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছে, তা তখনই বৃদ্ধি পাবে, যখন দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের পর্যাপ্ততা থাকবে। বিনিয়োগকারিরা যখন জানবে, দেশে গ্যাস-বিদ্যুত পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়, তখন তাদের যতই ডাকা হোক, তাতে তাদের সাড়া পাওয়ার আশা পূরণ হবে না।
আগামী ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূরণ হবে। এই ছয় মাসে সরকার যেমন তার পারফরম্যান্স মূল্যায়ণ করবে, তেমনি দেশের মানুষও তার বিচার করবে। তারা শুরুতেই দেখবে, গ্যাস-বিদ্যুতের যে গভীর সংকট, তা সরকার কতটা সমাধান করতে পেরেছে। এই বিচারে সরকার যে পিছিয়ে থাকবে, তাতে সন্দেহ নেই। যদিও সরকারের মেয়াদ বেশি না হওয়ায় এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ও বৈশ্বিক সংকটে সৃষ্ট এই সংকট বিবেচনা করে জনগণ তাকে ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ বা সহনশীলতা দেখাবে। তারা ধৈর্য্য ধরে আছে এ আশায় সরকার অচিরেই এ সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে পারবে। তবে সরকার যদি দ্রুত সময়ে পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে না পারে, জনগণও দ্রুতই তার উপর থেকে আস্থা ও ভরসা হারাতে থাকবে। সরকার পারছে না, বা ব্যর্থ হচ্ছে, এ মনোভাব তৈরি এবং হতাশ হবে। এ খাত নিয়ে সরকার যে ষড়যন্ত্রের কথা বলছে, তা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ষড়যন্ত্রকারিরা চাইবেই জনগণ কিসে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ হয়, সেই প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে। এই মুহূর্তে তাদের জন্য মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে গভীর করে জনক্ষোভকে উসকে দেয়া এবং দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা। এই সরল তত্ত্ব সরকারের নীতিনির্ধারকদের না বোঝার কারণ নেই। ফলে সরকারকে এই ষড়যন্ত্রকে সমূলে উৎখাত করে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সহনীয় ও স্বস্তিকর পর্যায়ে আনতে হবে। তা নাহলে, শুধু ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ দিয়ে সংকট মোচন করা যাবে না। এই সংকট মোচনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং কর্তৃপক্ষের যদি যথাযথ পরিকল্পনা নেয়া এবং তা বাস্তবায়নে দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব থাকে, সেটারও সমাধান করতে হবে। জনজীবনে স্বস্তি এবং অর্থনীতিকে সচল করতে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সমাধানে সরকারকে যত ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার, তা নিতে হবে।