বিশ্বকাপ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি আবেগ, স্বপ্ন আর ইতিহাস রচনার মঞ্চ। ফুটবলের এই মঞ্চ যেমন এনে দেয় জাদুকরী সব মুহূর্ত, তেমনি জন্ম দেয় নতুন নায়ক। আবার বিদায় নেন কিংবদন্তিরা।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপও ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণের গল্প। উত্তর আমেরিকার মাটিতে গড়ানো এই আসর হতে পারে লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র ও লুকা মদরিচদের শেষ বিশ্বকাপ।
একইসাথে এটাই হতে পারে কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিন ইয়ামাল, জামাল মুসিয়ালা কিংবা আর্লিং হলান্ডদের বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজা হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। আগামী দিনের অধিপতি হওয়ার সুযোগ।
এই বিশ্বকাপের একই মঞ্চে যেমন লেখা হবে বিদায়ের মহাকাব্য, তেমনি লেখা হবে নতুন অধিপতির আগমনী বার্তা। অর্থাৎ বিদায়ীরা যেমন শেষটা রাঙাতে চাইবেন, নতুনেরা পথ খুঁজবেন মহাতারকা হয়ে ওঠার।
শেষবারের মতো মেসির জাদু
২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জিতে ফুটবলের প্রায় সব স্বপ্নই পূরণ করেছেন লিওনেল মেসি। তবুও নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে আছে অনন্য এক কীর্তির হাতছানি। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ডাকছে তাকে।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বাধিক ২৬ ম্যাচ ও ১৩ গোলের মালিক তিনি। আর ৪টি গোল করলেই মিরোস্লাভ ক্লোসাকে হটিয়ে রেকর্ডটা নিজের করে নেবেন তিনি। সেই সাথে আরো একটা শিরোপা জিতলে মন্দ কী?
অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের মিশনে রোনালদো
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সব মিলিয়ে আছেন প্রথম ফুটবলার হিসেবে হাজার গোলের দোরগোড়ায়। পাঁচবার জিতেছেন ব্যালন ডি ও’র। ব্যক্তিগত অর্জনে সমৃদ্ধ তার ঝুলি।
ক্লাব ইতিহাসের প্রায় সব শিরোপা জিতলেও বিশ্বকাপ ট্রফি এখনো অধরা তার। ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে পারে সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের শেষ সুযোগ। বয়স ৪১ ছুঁলেও তার ক্ষুধা, ফিটনেস আর লড়াই করার মানসিকতা আগের মতোই অটুট।
ব্রাজিলের আশার আলো নেইমার
চোটের ধাক্কা সামলে আবারো আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরেছেন নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা এই তারকা আছেন বিশ্বকাপ দলে। তাকে নিয়েই সেলেসাওরা এসেছে হেক্সা জয়ের মিশনে।
নিজের ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দেয়ার এটিই শেষ বড় সুযোগ হতে পারে নেইমারের। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আক্রমণের মূল অস্ত্র ছিলেন তিনি। এবারের আসরেও একই ভূমিকায় ফিরতে পারে কিনা দেখা যাক।
শেষবার সুর তুলতে প্রস্তুত মদরিচ
লুকা মদরিচের ক্যারিয়ার যেন সংগ্রাম আর সাফল্যের এক অনন্য গল্প। ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তুলে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি, জিতেছিলেন গোল্ডেন বল। সেই সাথে ব্যালন ডি’অর জিতে ভাঙেন মেসি-রোনালদোর দীর্ঘ আধিপত্য।
২০০৬ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর প্রায় দু’দশক ধরে দেশের ফুটবলের পোস্টার বয় হয়ে আছেন তিনি। বয়সের ভার সত্ত্বেও মাঝমাঠে তার নিয়ন্ত্রণ, পাসিং আর নেতৃত্ব এখনো অনন্য। শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নিজের শিল্প ছড়িয়ে দিতে চান এই কিংবদন্তি।
ইয়ামালের বিস্ময় ছড়ানোর পালা
কিশোর বয়সেই ইউরোপীয় ফুটবলে ঝড় তোলা লামিন ইয়ামাল এবারের বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় আশা। ২০২৪ ইউরো জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তরুণের চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে স্পেন।
যদিও সাহসী ড্রিবলিং, গতি ও সৃজনশীলতায় ইতোমধ্যেই নিজেকে প্রমাণ করেছন, তবে ইয়ামালের সামনে সুযোগ আগামী দিনে ফুটবলের পোস্টারবয় হয়ে ওঠার। বিশ্বকাপই হতে পারে তার বিশ্বজয়ের সূচনা।
মহাতারকা হয়ে উঠতে পারেন এমবাপ্পে
২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয়, ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক। কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফরমার। আলমিরাতে আছে গোল্ডেন বুটও।
এবার তার লক্ষ্য দ্বিতীয় শিরোপা জিতে কিংবদন্তিদের কাতারে নিজেকে আরো উঁচুতে নিয়ে যাওয়া। সুযোগ আছে মহাতারকা হয়ে ওঠার।
দেম্বেলের নীরব আক্ষেপ ঘোচানোর সুযোগ
দীর্ঘ সময় ইনজুরি ও অনিয়মিত পারফরম্যান্সের সমালোচনা পেরিয়ে উসমান দেম্বেলে নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করেছেন। গত মৌসুমে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জিতে নেন গর্বের ব্যালন ডি ও’র।
কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে এখনো নিজের ছাপ রাখতে পারেননি। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ মিলে ১১ ম্যাচ খেলেও এখনো গোলের দেখা পাননি। ২০২৬ হতে পারে সেই আক্ষেপ ঘোচানোর আসর।
হলান্ডের কাঁধে নরওয়ের স্বপ্ন
ক্লাব ফুটবলে গোলের মেশিন আর্লিং হলান্ড এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। নরওয়ের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বমঞ্চে নামার অপেক্ষায় থাকা এই স্ট্রাইকারকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া।
জার্মানির নতুন জাদুকর মুসিয়ালা
জামাল মুসিয়ালার পায়ে যেন ফুটবলের শিল্প। ড্রিবলিং, গতি ও গোল করার ক্ষমতায় তিনি ইতোমধ্যেই জার্মানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার বড় দায়িত্ব এবার তার কাঁধে।
ইংল্যান্ডের নির্ভরতার নাম কেইন
ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হ্যারি কেইন গত এক দশক ধরে দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ। ২০১৮ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী এই স্ট্রাইকার গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করতেও সমান দক্ষ।
১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণে এবার ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা অধিনায়ক কেইন।
আফ্রিকার আশা আশরাফ হাকিমি
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোকে ইতিহাস গড়া সাফল্য এনে দেয়ার কারিগর ছিলে আশরাফ হাকিমি। দলকে পৌঁছান স্বপ্নের সেমিফাইনালে। এবারের আসরেও আফ্রিকার দেশটার স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু তিনি।
আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ফুল-ব্যাক এবার আরো বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন। বিশ্বকাপটাই ঘরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নামবেন।
ডাচ রক্ষণদুর্গের অতন্দ্র প্রহরী ফন ডাইক
ভার্জিল ফন ডাইক শুধু একজন ডিফেন্ডার নন, নেদারল্যান্ডসের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তিনবার ফাইনালে উঠেও বিশ্বকাপ জিততে না পারা ডাচদের আক্ষেপ ঘোচানোর মিশনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
৩৪ বছর বয়সে এসে এটিই হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ, তাই দেশের প্রথম শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত এই ডাচ অধিনায়ক।