’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে বসেই একের পর এক বক্তব্য-বিবৃতি ও দেশে থাকা তার দোসরদের দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত শুরু করেন। তৎকালীণ অন্তর্বর্তী সরকার, ছাত্র-জনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে সেসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। অন্তর্বর্তী সরকার শক্ত অবস্থান নিয়ে পতিত আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় এবং মানবতাবিরোধী ও গণহত্যার অপরাধে হাসিনাসহ অনেকের বিচার শুরু করে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসিনাসহ বেশ কয়েকজনকে মৃত্যুদ-ের সাজা দেয়া হয়েছে। আরও অনেকের বিচার চলমান রয়েছে, এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগেরও বিচার চলছে। ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) দেশের সব প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে হাসিনার যেকোনো ধরনের বক্তব্য-বিবৃতি প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এমনকি, শেখ হাসিনা যাতে কোনো সংবাদ মাধ্যমের সাথে সাক্ষাৎকার ও বক্তব্য-বিবৃতি না দেন, এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার তাগিদ দেয়।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিএনপি ভূমিধস বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ যেন চাঙা হয়ে উঠেছে। ভারতও অবাধে হাসিনাকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে। সেইসব সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের বিভিন্ন মেইনস্ট্রিম সংবাদ মাধ্যমেও ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে শেখ হাসিনা টেলিফোনে একটি সাক্ষাৎকার দেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি নির্দিষ্ট করে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারে নির্বাসনে থাকা দলের নেতাদেরও তার সঙ্গে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। গত শুক্রবার এই সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো বটেই মেইনস্ট্রিমের অনেক সংবাদপত্র ও অনলাইন মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়। এমনকি, কোনো কোনো পত্রিকা কৌশলে তাৎক্ষণিকভাবে ‘হাসিনার দেশে ফেরা কতটা বাস্তব’ এমন বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন ও মতামত প্রকাশ করে। টেলিভিশন টক শোগুলোতেও ইনিয়ে বিনিয়ে এ নিয়ে কথা বলা হয়। সব মাধ্যমে হাসিনার বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের ক্ষেত্রে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সংবাদমাধ্যমগুলো বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তা প্রচার করেছে। অবশ্য বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কৌশলে কোনো না কোনো উসিলায় হাসিনার সংবাদ প্রকাশ ও আলোচনা করার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে উঠে। বলা বাহুল্য, যেসব পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল হাসিনার নিরন্তর গুণগান গেয়ে তাকে দানবে পরিণত করেছিল, সেসব সংবাদ মাধ্যমে হাসিনার দালালি করা মালিক ও সাংবাদিকরা হাসিনার পতনের পর গা ঢাকা দিয়েছিল। কেউ কেউ নীরব থেকে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সংস্কৃতি অঙ্গণে হাসিনার সমর্থনকারি কালচারাল ফ্যাসিস্টদেরও কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালায়, কেউ আত্মগোপণে থাকে। দেখা যাচ্ছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার চার মাস না পেরুতেই ঘাপটি মেরে থাকা হাসিনার দালাল সাংবাদিক ও কালচারাল ফ্যাসিস্টরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা নানা কৌশলে হাসিনাকে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরছে। তারা হাসিনার শাসনামলকে ইউনুস সরকারের শাসনামলের সাথে তুলনা করে ‘আগেই ভালো ছিলাম’ এমন একটা বয়ান প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে নেমেছে। তারা কৌশলে বিএনপিকেও টার্গেট করছে। অন্যদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন উসিলায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করা শুরু করেছে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কটাক্ষ করে এ মাসের শুরুতেই হাসিনার পদলেহী কালচারাল ফ্যাসিস্টসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় বইয়ে দিয়েছে। তাদের অনেকে এমনও বলেছে, হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ফিরলে ক্যালেন্ডার থেকে ‘জুলাই’ মুছে ফেলা হবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, আওয়ামী লীগের এই নানামুখী সক্রিয়তা যতটা সরব, ক্ষমতাসীন বিএনপি যেন ততটাই নীরব। যে ছাত্র-জনতার আন্দোলন না হলে বিএনপির ক্ষমতায় আসা দূরতম ছিল, সেই জুলাই মাসে হাসিনা ও আওয়ামী লীগ যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিতে দলটি উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। যে গণমাধ্যম হাসিনার পুরো শাসনামলে তার অনুগত হয়েছিল, সেই গণমাধ্যম এখনো নানা কৌশলে হাসিনার বক্তব্য-বিবৃতি ও বয়ান প্রচার করে চলেছে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, গণমাধ্যমগুলো এখনো হাসিনার ল্যাসপেন্সারদের দখলে রয়ে গেছে। নীতিনির্ধারণী জায়গায় আওয়ামী দোসররা বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এই তারাই যে সুযোগ বুঝে বিএনপিকে তুলোধুনো করে ছাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে তার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা কোথায় কী করছে, তা যেমন ফলাও করে প্রচার শুরু করেছে, তেমনি সরকারের ভালো কাজগুলোকে অনুল্লেখ্যভাবে প্রকাশ করছে। মিডিয়া যে বিএনপির অনুকূলে নেই, বিএনপি না বুঝলেও একজন সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারছে।

মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলোতে ডিসেম্বরে হাসিনার ফেরার সাক্ষাৎকার প্রচার করার পর সরকারের যেন সামান্য টনক নড়েছে। মিডিয়াগুলোকে অত্যন্ত বিনীতভাবে অনুরোধ করে বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আদালতের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক অপরাধীর কোনো ধরনের বক্তব্য, সাক্ষাৎকার, অডিও-ভিডিও ভাষণ গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যাপারে আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমতাবস্থায়, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এবং আদালতের নির্দেশনার প্রতি সম্মান জানিয়ে পলাতক শেখ হাসিনার কোনো প্রকার ভাষণ, বিবৃতি বা বক্তব্য সরাসরি কিংবা ধারণকৃত অবস্থায় কোনো গণমাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ না করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে আদালত হাসিনার সবধরনের বক্তব্য-বিবৃতি প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেখানে সরকার অনুরোধ করবে কেন? সরকারের কাজ তো অনুরোধ করা নয়, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। যারা এ নির্দেশ মেনে চলবে না, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা সরকারের কাজ। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা বা দ্বিধা করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। গণমাধ্যমগুলো যে সরকারের এ অনুরোধ উপেক্ষা করেছে, তা একটি প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে সরকারের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের এক ঘন্টা পরেই হাসিনার উক্ত সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। তাহলে সরকারের এই অনুরোধের মূল্য রইল কোথায়! যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে দেখা যাবে, সরকারকে থোড়াই কেয়ার করে মিডিয়াগুলোতে হাসিনার সংবাদ প্রচার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। তখন তা সামাল দেয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারে আছে, রাজনৈতিক সঠিক অবস্থানে নেই। তার রাজনীতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দল এবং সরকার যেন রাজনীতি শূন্য হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও তার রাজনীতির সাথে বিএনপি যে কুলিয়ে উঠতে পারবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, পতিত আওয়ামী লীগ, মৃতুদ-প্রাপ্ত পলাতক শেখ হাসিনা, তার দোসর, মিডিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ঘাপটি মেরে থাকা তার অনুসারিদের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স না থাকলে অচিরেই তা সরকারের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিলে দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীতা বলতে কিছু থাকবে না।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews