মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্বরাজনীতিতে এক ভয়ংকর নজির স্থাপন করেছে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাকে আরেকটি রাষ্ট্র এভাবে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে হত্যা করতে পারল, এই নজিরবিহীন ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন এবং বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ঘোষণাটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট; এটি কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো ‘লিমিটেড স্ট্রাইক’ নয়, বরং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সমূলে উপড়ে ফেলে দেশটিতে এক আমূল পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ নিয়ে আসা। ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খামেনির মৃত্যু প্রমাণ করে যে, এটি কেবল কোনো ভীতি প্রদর্শন ছিল না, বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুপরিকল্পিত ছকের নির্মম বাস্তবায়ন।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ‘অপহরণের’ কায়দায় ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন প্রচেষ্টা কিংবা তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে স্বার্থান্বেষী ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে দেশে-দেশে চালানো একের পর এক ষড়যন্ত্রের কথা। কোনো লুটেরা গোষ্ঠী (অলিগার্কি) কেবল ভেতরের পুলিশ, আমলা বা দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের ওপর ভর করে টিকতে পারে না। তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার তাঁবুর একটি বড় রশি বাঁধা থাকে বাইরের কোনো পরাশক্তির হাতে। এই বাইরের পরাশক্তিই হলো ক্ষমতার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। এটি একটি বিপজ্জনক হাতিয়ার। আধুনিক বিশ্বরাজনীতিতে এটি হলো একটি অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোল। যখন পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ থাকে, তখন তারা এই রিমোট চেপে স্বৈরশাসকদের টিকিয়ে রাখে এবং সব অপকর্ম বৈধতা দেয়। আর যখন তাদের নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণœ হয়, তখন তারা এই ষষ্ঠ বাহু ব্যবহার করেই দেশের ভেতরের অর্থনীতি ও রাজনীতির ভারসাম্য নষ্ট করে। ছক কষে তারা একটি দেশের শাসকগোষ্ঠীর মেরুদ- ভেঙে দেয় এবং ক্ষমতাচ্যুত করে।
অন্যদিকে, এই বৃহৎ শক্তির খেলার সামনে জাতিসংঘের ভূমিকা আজ এক চরম প্রহসনে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বা সার্বভৌমত্বের বুলি কেবল ছোট দেশগুলোর জন্যই কার্যকর। কিন্তু যখন মার্কিন জোট বা বৈশ্বিক অলিগার্কি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন জাতিসংঘ হয়ে পড়ে এক নীরব দর্শক। খামেনি হত্যা বা মাদুরোকে অপদস্থ করার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই আন্তর্জাতিক মেরুকরণ আসলে একটি নব্য ঔপনিবেশিক জাল, যেখানে জাতিসংঘ কেবল বৃহৎ শক্তির আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার বা নীরব থাকার একটি কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম মাত্র।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আজ সারা বিশ্বের মানুষের মনে প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক আইন আজ কোথায়? নিবন্ধটির উদ্দেশ্য এই সংঘাতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতি, নব্য ঔপনিবেশিক আগ্রাসন এবং আঞ্চলিক শক্তির পালাবদলের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করা। এই নিবন্ধে আমরা মূলত নি¤œলিখিত চারটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব: প্রথমত, খামেনি হত্যার মতো আগ্রাসী ঘটনা কীভাবে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের কাঠামোগত চরম ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে? দ্বিতীয়ত, আমেরিকার এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নেপথ্যে প্রকৃত অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কী? তৃতীয়ত, ইরানের প্রথম প্রতিক্রিয়া কেন উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটির দিকে ধাবিত হলো?
চতুর্থত, কিউবা বা ভেনেজুয়েলার ‘রাষ্ট্র ও জনতার নিবিড় ঐক্যের’ মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে এই নব্য ঔপনিবেশিক যুগে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর টিকে থাকার কৌশল কী হওয়া উচিত? উপর্যুক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই আমরা অনুধাবন করার চেষ্টা করব, মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রলয় কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ক্ষমতা ও অর্থনীতির এক নতুন বাঁকবদল।
আন্তর্জাতিক আইনের মৃতদেহ ও আমেরিকার প্রকৃত স্বার্থ: জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারা অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখ-তা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ কিংবা বলপ্রয়োগের হুমকি দিতে পারবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো এবং তাকে হত্যা করা হলো আগ্রাসনের চরমতম রূপ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ২০২৬ সালের এই ঘটনা আসলে ইরাক, লিবিয়ায় ঘটে যাওয়া ইতিহাসেরই এক নির্মম পুনরাবৃত্তি। অতীতে আমরা দেখেছি, কীভাবে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাতে ইরাককে ধ্বংস করা হয়েছে, সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে। লিবিয়াকে ধ্বংস করা হয়েছে, মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা করা হয়েছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি জনপদকে নরকে পরিণত করা হয়েছে। এই প্রতিটি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন কেবল একজন নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে মৃতদেহ পাহারা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আমেরিকার এই প্রকাশ্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না, কারণ আমেরিকা এর সদস্য নয়। তদুপরি, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ‘ভেটো’ ক্ষমতা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের অপরাধের বিরুদ্ধে যেকোনো বিচারিক রায় থেকে সুরক্ষা দেয়।
রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণ বলছে, আমেরিকার এই ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নেপথ্যে প্রধান চালিকাশক্তি হলো তেল এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য। এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো চীনের ‘তেলের সার্বভৌমত্ব’ অর্জনের পথ রুদ্ধ করা এবং ইরান-চীন-রাশিয়া ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক জোটকে চূর্ণ করা। চীনের উৎপাদন খাতের অন্যতম প্রাণশক্তি হলো সস্তা ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি। বর্তমানে চীনের সমুদ্রপথে আসা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১৩.৪% আসে ইরান থেকে, যা মূলত রেনমিনবিতে লেনদেন হয়। এটি একদিকে যেমন মার্কিন পেট্রোডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে, অন্যদিকে চীনের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেমকে শক্তিশালী করছে। ২০২৬ সালের শুরুতে ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে ‘অপহরণের’ পর সেখান থেকে চীনের তেল আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ইরানের পতন ঘটাতে পারলে চীনের এই ‘সস্তা তেল’ কৌশল পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র একটি রূঢ় বাস্তবতা খুব ভালো করেই জানে, চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইরানের অংশ খুবই কম। তাই নিজেদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে চীন কখনোই ইরানের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। দুই দশক আগের ইরাক আক্রমণের মতোই এখানেও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ‘সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের’ মুনাফাই পর্দার আড়ালের মূল কারিগর; আন্তর্জাতিক আইন কেবল এক নব্য ঔপনিবেশিক লুণ্ঠনের আইনি আবরণ মাত্র।
জাতিসংঘের ধোঁকা: জাতিসংঘ নামক বিশ্বসংস্থাটি আসলে তৈরিই করা হয়েছে বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য। মাকাউ মুতুয়া (২০০২) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিউম্যান রাইটস: এ পলিটিক্যাল অ্যান্ড কালচারাল ক্রিটিক’-এ ঠিক এই সত্যটিই তুলে ধরেছেন। জাতিসংঘের গঠনতন্ত্রে ‘ভেটো’ ক্ষমতা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, পশ্চিমা শক্তিগুলো চিরকাল তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। মুতুয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানবাধিকার বা আন্তর্জাতিক আইনের ধারণাগুলো আসলে পশ্চিমা আধিপত্য বজায় রাখার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার মাত্র।
আমরা প্রায়ই দেখি জাতিসংঘ পরিবেশ রক্ষা, জেন্ডার সমতা বা টেকসই উন্নয়ন নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আলোচনার আয়োজন করে। অথচ পশ্চিমা দেশগুলোতে নারীদের ওপর সহিংসতার হার অনেক মুসলিম দেশের তুলনায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও, তারা আমাদের শেখায় ‘উন্নত মূল্যবোধ’। এসব আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একটি ‘মিথ্যা নিরাপত্তা বোধ’ দেওয়া। বাস্তবতা হলো, কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যদি তাদের স্বার্থের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান, তবে তারা তাকে যেকোনো সময় সিআইএ-র মাধ্যমে স্যাবোটাজ করে কিংবা সরাসরি হামলা চালিয়ে হত্যা করতে দ্বিধা করবে না। হত্যার পর জাতিসংঘ বড়জোর একটি তীব্র নিন্দা জানাবে। খামেনি হত্যা প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন এক নতুন ঔপনিবেশিক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে ছোট বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রপ্রধানরা আর নিরাপদ নন।
ইরানের প্রতিক্রিয়া এবং উপসাগরীয় স্বার্থের সমীকরণ: মার্কিন হামলার পর ইরান যখন প্রতিশোধ নিতে চাইল, তখন তারা বেছে নিল পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে। এই ঘাঁটিগুলো ইরানের সবচেয়ে কাছে হওয়ায় তারা তাদের পুরোনো ও স্বল্পমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে খুব কম খরচে দ্রুত আঘাত করতে পেরেছে। আমেরিকা আগেভাগেই এই ঘাঁটিগুলো খালি করে ফেলায় বড় ধরনের মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটেনি। এতে ইরান একটি শক্ত বার্তা দিতে পারলেও যুদ্ধের মাত্রা শুরুতেই অল-আউট পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এড়াতে পেরেছে। ইরানের এই হামলা গালফ রাষ্ট্রগুলোকে সরাসরি মার্কিন-ইসরাইল জোটের সাথে মিলে সরাসরি যুদ্ধে ঠেলে দেওয়ার একটি নিখুঁত অজুহাত তৈরি করে দিয়েছে।
ইরানের এই পাল্টা হামলা কেবল সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আঘাত হেনেছে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক হৃদপি- কাতার ও দুবাইয়ের ওপর। কাতার রাস লাফফানে গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্রে হামলার প্রেক্ষিতে তাদের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বুরজ আল আরবের পাশে আগুনের শিখা দেখার পর দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি, অর্থাৎ তার ‘নিরাপত্তা প্রিমিয়াম’ আজ হুমকির মুখে। দশকের পর দশক ধরে দুবাই নিজেকে ‘অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের শান্ত দ্বীপ’ হিসেবে বিপণন করে যে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, সেই ব্র্যান্ড ভ্যালু আজ ধূলিসাৎ। অন্যদিকে, দুবাইয়ের এই সংকট সৌদি আরবের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। সৌদি আরব তার ‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে রিয়াদকে দুবাইয়ের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেও আঘাত হেনেছে ইরান। বিশ্ব বিনিয়োগকারীরা যাতে নির্বিঘেœ রিয়াদের দিকে ধাবিত হতে না পারে এবং সৌদির নিরাপত্তাও যে অভেদ্য নয়, সেই বার্তা দিতেই ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে সৌদি আরবের রাস তানুরায় অবস্থিত আরামকোর তেল শোধনাগারে। দৈনিক সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল তেল শোধন ক্ষমতাসম্পন্ন সৌদির বৃহত্তম এই স্থাপনাটি সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, সৌদি আরব দাবি করছে যে ড্রোনটি সরাসরি আঘাত হানতে পারেনি, বরং আকাশেই সেটিকে ধ্বংস করা হয়েছে। নিজেদের নিরাপদ বিনিয়োগ কেন্দ্র ভাবমূর্তি অটুট রাখা এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থেই রিয়াদ আপাতত এই নমনীয় বা ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে।
নব্য ঔপনিবেশিকতা ও নৈতিক সংকট: খামেনি-পরবর্তী ইরানে সৌদি আরব ও আমিরাত নিজেদের ভূখ-ে হামলাকে ঘৃণ্য ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়া কেবল কঠোর নিন্দা জানিয়েই দায় সেরেছে; সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে তারা নিজেদের স্বার্থ নষ্ট করতে নারাজ। পশ্চিমের মদদ আর জাতিসংঘের অর্থহীন বুলি, এই দুইয়ের যাঁতাকলে ইরান আজ কার্যত একা। এই দৃশ্যমান দ্বিচারিতাই নব্য ঔপনিবেশিক যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। শুধু ইরান নয়, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে ইউক্রেন-মিয়ানমার পর্যন্ত প্রতিটি সংঘাত আজ আমাদের নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কান্দাহার বা ইসলামাবাদের শিশুদের রক্ত ফিলিস্তিনের শিশুদের রক্তের চেয়ে কম লাল নয়।
অন্যদিকে, কিউবা ও ভেনেজুয়েলায় মার্কিন ষড়যন্ত্র কেন বারবার ব্যর্থ হয়েছে? উত্তরটি হলো, রাষ্ট্র ও জনতার অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। হুগো শ্যাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ৪৭ ঘণ্টার মধ্যে ভেনেজুয়েলার জনতাই তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিল। অন্যদিকে, মাদুরোর অপহরণ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র ও জনতার ঐক্য যদি কেবল আবেগ নির্ভর হয় এবং সেখানে যদি সামরিক ও প্রযুক্তিগত নিñিদ্র নিরাপত্তা না থাকে, তবে তা ভেঙে পড়তে বাধ্য। আবার, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সত্তেও কিউবার আদর্শিক ঐক্য মার্কিন ডলারের কাছে হার মানেনি। বিপরীতে, ৫৭টি মুসলিম দেশের সম্মিলিত জিডিপি প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সত্ত্বেও তারা আজ অসহায়। এর মূল কারণ সরকার ও জনতার মাঝখানে থাকা দুস্তর ব্যবধান এবং দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে আস্থার অভাব। তুরস্ক, পাকিস্থান, সৌদি বা ইরানের এই পারস্পরিক অনৈক্যই নব্য ঔপনিবেশিক শক্তির সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের রূঢ় বাস্তবতা, বাংলাদেশের ঝুঁকি এবং মুসলিম বিশ্বের জন্য বার্তা: নিবন্ধটি লেখার সময় প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রের রূঢ় বাস্তবতায় মার্কিন প্রশাসন ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর অবস্থান থেকে সরে এসে কেবল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের কথা বলছে। কুয়েতের আকাশে মার্কিন এফ-১৫ বিধ্বস্ত হওয়া এবং ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে ইরানি হামলার সাফল্য, মিত্রবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও প্রবল প্রতিরোধেরই প্রমাণ। পাশাপাশি, কাতারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি উৎপাদন বন্ধ এবং সৌদির তেল শোধনাগারে হামলার জেরে বিশ্ববাজারে ক্রুড অয়েল ৯% এবং এলএনজির দাম ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্য ও স্পেনের যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি পশ্চিমা জোটেও স্পষ্ট ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট মূলত দুটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে: হয় ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপে আমেরিকা যুদ্ধ বন্ধ করবে, অথবা তারা একজোট হয়ে ইরানকে ধ্বংসের পথে হাঁটবে। দ্বিতীয় দৃশ্যপটটি বাংলাদেশের মতো চরম আমদানিনির্ভর দেশের জন্য অশনিসংকেত। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় চীন হয়তো রাশিয়ার তেলে সামলে নেবে, কিন্তু আমাদের জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি ও জনজীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। এটি কোনো দূরের যুদ্ধ নয়; তাই এখনই একটি জাতীয় সংকট মোকাবিলার রূপরেখা তৈরি করা অপরিহার্য।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী।
Email: [email protected]