লেবাননে ইসরায়েলের হামলা জোরদার, বহু মানুষ নিহত

ছবির ক্যাপশান,

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া লেবাননের মাশগারার বাড়িগুলোর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালাচ্ছেন।

    • Author,

      সামান্থা গ্র্যানভিল, লেবানন

    • Reporting from,

      বেকা ভ্যালি, লেবানন

      এবং

    • Author,

      জন সাডওর্থ

    • Reporting from,

      বেকা ভ্যালি, লেবানন

  • Published

    এক ঘন্টা আগে
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

লেবানের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক ইসরায়েলি হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। এর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

লেবানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা হেজবুল্লাহর শতাধিক অবকাঠামো ও যোদ্ধাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটিকে সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর আগে সোমবার নেতানিয়াহু বলেছিলেন, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে হামলা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান,

লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল (ফাইল ছবি)

মঙ্গলবার নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল "লেবাননে তাদের অভিযান আরও বিস্তৃত করছে।"

তিনি বলেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বড় আকারে স্থল অভিযান চালাচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। একই সঙ্গে, উত্তর ইসরায়েলের জনগণকে হেজবুল্লাহর হামলা থেকে রক্ষা করতে তারা "নিরাপত্তা অঞ্চল" আরও শক্তিশালী করছে।

এখানে "নিরাপত্তা অঞ্চল" বলতে সীমান্ত সংলগ্ন কিছু এলাকাকে বোঝানো হচ্ছে, যেটিকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি দুই পক্ষই বারবার লঙ্ঘন করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনাও হুমকির মুখে পড়েছে।

ইসরায়েল প্রতিদিনই দক্ষিণ লেবাননে বিমান ও কামান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, হেজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় রকেট ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।

একই সঙ্গে, দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকায় ইসরায়েলি সেনার উপস্থিতিও রয়েছে।

স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিমান হামলার লক্ষ্য ছিল লেবাননের বেকা উপত্যকার মাশগারা গ্রাম এবং দক্ষিণ লেবাননের বুর্জ আল-শামালি এলাকা।

দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিউফোর্ট দুর্গের কাছেও কয়েকটি হামলা হয়েছে। প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো এই দুর্গটিকে জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেসকো এ অঞ্চলের সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত মধ্যযুগীয় দুর্গগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার স্থান থেকে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী বের হচ্ছে (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার স্থান থেকে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী বের হচ্ছে (ফাইল ছবি)

সোমবার এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর হামলার জবাবে ইসরায়েল তাদের হামলার সংখ্যা ও তীব্রতা আরও বাড়াবে।

তিনি বিশেষভাবে ফাইবার-অপটিক ড্রোনের কথা উল্লেখ করেন, যেগুলো ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, সেগুলোকে সহজে শনাক্ত করা যায় না।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানব।"

এই ঘোষণার পর হেজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর অনেক বাসিন্দাকে এলাকা ছেড়ে পালাতে দেখা যায়। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পরিবারগুলো রাস্তায় বের হয়ে পড়লে সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু না করা হলেও সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান।

বিবিসি প্রায় ৫০টি স্থানে কয়েক ডজন হামলার তথ্য পেয়েছে।

লেবানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় দক্ষিণের শহর আরব সালিমের একটি বাড়িতে হামলায় এক ব্যক্তি ও তার স্ত্রী নিহত হন। এছাড়া কাওতারিয়েত এল রেজ গ্রামেও ইসরায়েলি হামলায় আরও দু'জন নিহত হয়েছেন।

রাতভর হামলায় মাশগারা এলাকার কয়েকটি বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়।

লেবানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন নারী ও দু'টি শিশুও রয়েছে। এছাড়া আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন।

আহতদের মধ্যে ছিল মোহাম্মদ নামের এক শিশুও। ভিডিওতে দেখা যায়, গভীর রাতে উদ্ধারকর্মীরা মরিয়া হয়ে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের ফাঁক দিয়ে শিশুটির ছোট দু'টি হাত বাইরে বেরিয়ে ছিল। পরে ধুলা-মাটিতে ঢাকা সাত বছরের শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

২০২৬ সালের ২৫শে মে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরের ভবনগুলোর ওপর দিয়ে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়।

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান,

সোমবার দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ইসরায়েলি হামলা হয়

"ঘুম থেকে উঠে আমার মনে হচ্ছিল আমি নড়াচড়া করতে পারছি না। পাশে শুধু অন্ধকার ছিল," হাসপাতালের বেডে শুয়ে পরিবারের সদস্যদের পাশে নিয়ে বিবিসিকে বলছিল মোহাম্মদ।

"যারা আমাকে উদ্ধার করছিল, তাদের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমাকে বের করতে তাদের অনেক সময় লেগেছে।"

তার মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। হাত ও পায়েও কাটা ও আঁচড়ের দাগ দেখা যাচ্ছিল।

যখন ক্ষেপণাস্ত্রটি তাদের বাড়িতে আঘাত হানে, মোহাম্মদ তখন নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল। ওই হামলায় তার বাবা ও দুই বোন নিহত হন।

মাশগারা এখন একেবারে জনশূন্য শহরের মতো মনে হচ্ছে। রাস্তায় খুব কম গাড়ি চলাচল করছে। মাঝে মাঝে কয়েকটি গাড়ি আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা কারা, তা দেখে নিচ্ছে। চারপাশে যেন জীবনের কোনো চিহ্ন নেই।

যেসব স্থানে রাতভর হামলা হয়েছিলো, পৌরসভার সদস্য আহমাদ আমাদের সেইসব স্থানে নিয়ে যান। ভেঙে পড়া বাড়ি ও দোকানপাট দেখে জায়গাটিকে যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি জনপদ মনে হচ্ছিল।

আহমাদ বলেন, "আমি হেজবুল্লাহর সদস্য নই। কিন্তু গ্রামের সবাই প্রতিরোধের পক্ষে। আর শত্রুপক্ষ (ইসরায়েল) কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না।"

এরপরই যুদ্ধবিমানের শব্দে আহমাদের কথা থেমে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আমাদেরকে দ্রুত সরে যেতে হয়।

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, আমরা যেখানে ছিলাম, তার খুব কাছাকাছি একটি সড়কেই বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পরে মাশগারা এলাকার আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশ করে।

তারা দাবি করে, সেখানে "হেজবুল্লাহর অবকাঠামো" লক্ষ্য করে কয়েকটি হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে "সন্ত্রাসী তৎপরতা" শনাক্ত করা হয়েছিল। ওই হামলায় "সন্ত্রাসীরা" নিহত হয়েছেন।

লেবানন সীমান্তে টহলরত ইসরায়েলি সেনা সদস্যরা (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

লেবানন সীমান্তে টহলরত ইসরায়েলি সেনা সদস্যরা (ফাইল ছবি)

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, রাতভর দক্ষিণ লেবাননে হেজবুল্লাহর ব্যবহৃত ৯০টির বেশি অস্ত্র গুদাম, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, নজরদারির জায়গা ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করে। তারা হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ১৭ এপ্রিল কার্যকর হওয়া ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তোলে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র কর্নেল আভিচাই আদরাই বলেন, হেজবুল্লাহ বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় এই ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া ইসরায়েলি বাহিনীর সামনে আর কোনো উপায় ছিল না।

অন্যদিকে, হেজবুল্লাহ জানিয়েছে যে ইসরায়েলের "যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের" জবাবে তারা উত্তর ইসরায়েলের তিনটি ব্যারাক ও একটি সামরিক পোস্টে হামলা চালিয়েছে।

মূলত, গত রোববার দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধে একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর হামলা আরও জোরদারের নির্দেশ দেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

এর ফলে গত দোসরা মার্চ সংঘাত শুরুর পর থেকে হেজবুল্লাহর হামলায় দক্ষিণ লেবাননে নিহত ইসরায়েলি সেনার সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া, একজন বেসামরিক ঠিকাদারও নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে লেবানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একই সময়ে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে অন্তত তিন হাজার ১৮৫ জন নিহত হয়েছেন।

এই প্রতিবেদন করতে আরও সহযোগিতা করেছেন রবার্ট গ্রিনাল।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews