বঙ্গোপসাগর থেকে গোপনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রাকৃতিক গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে। এই চুরির অভিযোগ ভারতের দিকে। বিগত ১৭ বছর ধরে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের প্রকাশ্যে এবং গোপন প্রশ্রয়ে ভারত আধুনিক প্রযুক্তির পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস তার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত কীভাবে এই চুরি প্রক্রিয়া অবলম্বন করছে, তা ফাঁস করেছে চীন। সম্প্রতি বেইজিং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং সাফ সারফেস ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের নিচ থেকে কীভাবে এই চুরি হচ্ছে, তার ¯পষ্ট প্রমাণ বাংলাদেশের হাতে তুলে দিয়েছে। চীন শুধু চুরির প্রমাণই দেয়নি, এর সমাধান কীভাবে করা যায়, সেই প্রস্তাবও সরকারের কাছে দিয়েছে। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারত তার সীমানায় বিশেষ কৌশলে মাটি না খুঁড়ে বিশেষ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সীমানার অভ্যন্তরের গ্যাস ভা-ারে পাইপ ঢুকিয়ে এই কাজ করেছে। হাসিনা তার শাসনামলে এ নিয়ে কোনো টুঁ শব্দ করেনি। অথচ ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রসীমা পাওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, ব্লু ইকোনোমির অবারিত দ্বার খুলে গেছে। সমুদ্রের অফুরন্ত প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য সম্পদ দিয়ে দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে। তখন বঙ্গোপসাগরে বেশ কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেলেও কোনো যাচাই-বাছাই এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই তুলে দেয়া হয় ভারতের দুটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি এবং ওয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের হাতে। প্রতিষ্ঠান দুটি উৎপাদন শুরু না করে বছরের পর বছর ফাইল আটকে রেখে সময়ক্ষেপণ করেছে এবং পুরো প্রক্রিয়াকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের ব্লকগুলোকে পুরোপুরি অচল রাখা, যাতে বাংলাদেশ কোনোভাবেই সেখান থেকে গ্যাস তুলতে না পারে। এই অচলাবস্থার মধ্যে ভারত তার এলাকা কৃষ্ণ গোদাবরি থেকে শতশত ঘনফুট গ্যাস দিন-রাত উত্তোলন করে গেছে। শুধু ভারত নয়, মিয়ানমারও গ্যাস টেনে নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের রিজার্ভ গ্যাস ধীরে ধীরে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের দিকে চলে যাচ্ছে। হাসিনা সরকার নিজের ক্ষমতা এবং দিল্লির একচেটিয়া সমর্থন ধরে রাখতে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি।

একদেশের সীমানার প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল গোপনে টেনে নেয়া বা চুরি করার দৃষ্টান্ত বিশে^ রয়েছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছে। ১৯৯০ সালে যখন ইরাক কুয়েত আক্রমণ করেছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল তেল চুরির ঘটনা। ইরাকের অভিযোগ ছিল, কুয়েত আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করে মাটির নিচ দিয়ে বাঁকা পাইপ ঢুকিয়ে ইরাকের বিখ্যাত রুমায়না অয়েল ফিল্ড থেকে তেল চুরি করছে। এই তেল চুরিকে কেন্দ্র করে ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই একই পথ অবলম্বন করে ভারত বাংলাদেশের গ্যাস টেনে নিচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটে নীরবে এবং লোকচক্ষুর আড়ালে। ভারতও ঠিক একই কৌশলে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানা থেকে গ্যাস টেনে নিচ্ছে। এ ঘটনা নিশ্চিতভাবেই দেশের জন্য উদ্বেগের। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট তথ্য দেশের জনগণকে জানানো উচিৎ। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে তীব্র জ¦ালানি সংকটের মধ্যে রয়েছে। এতে উৎপাদন খাত স্থবির হয়ে পড়ছে। গ্যাস সংকটের কারণে চাহিদা অনুপাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, আমদানিকৃত জ¦ালানি তেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই ব্যয় মিটাতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে এবং এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া অর্থনীতিতে পড়ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। আবার পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক শিল্প কারখানা বন্ধের পথে রয়েছে। দেশে এই জ¦ালানি সংকটের প্রধানতম কারণ হিসেবে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিগত ১৭ বছরে দেশে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ তেমন একটা করা হয়নি। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাপেক্সকে পতিত হাসিনা সরকার অকার্যকর করে রেখেছিল। এ কাজ করেছিল, দেশকে জ¦ালানি তেল ও গ্যাসকে আমদানিনির্ভর করার জন্য। যার ফলে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস পাওয়া যায়নি। দেশে যেসব পুরনো গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে, সেগুলো থেকেই উত্তোলন করা হয়েছে। এখন এমন পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর গ্যাসের মুজুতও ফুরিয়ে আসছে। গতকাল দৈনিক বণিকবার্তার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে উৎপাদনে থাকা গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা ২০টি। এতে মজুত রয়েছে, প্রায় ৬ হাজার ৩২১ বিলিয়ন কিউবিক ফুট বা ৬ টিসিএফ। এই মুজুত দিয়ে চলবে আর মাত্র ৮ বছর। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতিবছর গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তাতে স্থানীয় গ্যাসের মজুত বাড়ানো না গেলে বিদ্যুৎ খাত থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা ও নতুন বিনিয়োগ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। গ্যাসক্ষেত্রগুলোর এই দুর্দশা দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। এজন্য দায়ি, রাষ্ট্রায়াত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা এবং জ¦ালানি আমদানির ভুল সিদ্ধান্ত।

উন্নত দেশগুলোতে স্থলভাগের গ্যাস ও জ¦ালানি উত্তোলন করে মজুত প্রায় শেষ করে ফেলেছে। তারা এখন স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের অফুরন্ত জ¦ালানি সম্পদের দিকে ঝুঁকেছে এবং সেখান থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উত্তোলন করে চাহিদা মেটাচ্ছে। আমাদের দেশের স্থলভাগে কি পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। তবে এ কথা সবারই জানা, যেসব গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে, সেগুলোর গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এজন্য জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরেই জরুরিভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরের বিপুল গ্যাসভা-ার অনুসন্ধান এবং উত্তোলনের পদক্ষেপ নেয়ার তাকিদ দিয়ে আসছে। তাতে বিগত সরকার কর্ণপাত করেনি। এর ফলে যা হচ্ছে, তা হলো, প্রতিবেশি ভারত এবং মিয়ানমার যে গ্যাস উত্তোলন করছে, তাতে বাংলাদেশের পানিসীমায় থাকা গ্যাস চলে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে, একসময় বাংলাদেশের সীমানায় থাকা বঙ্গোপসাগরের গ্যাসও ফুরিয়ে যাবে। ভারত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের সীমানার গ্যাস চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে চীন যে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে, তা সরকারের আমলে নেয়া উচিত। চীন যেহেতু জানে কীভাবে এ চুরি ঠেকানো যাবে, তাই সরকারের উচিত হবে, চীনের সহযোগিতা নিয়ে তা ঠেকানো এবং গ্যাস উত্তোলনের পদক্ষেপ নেয়া। চীনের আধুনিক প্রযুক্তি এবং গ্যাস উত্তোলনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা মনে করি, অবিলম্বে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস অনুসন্ধান এবং মজুতের পরিমাণ জরিপ করে তা জনগণকে জানিয়ে উত্তোলনের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সুনীল অর্থনীতিকে কার্যকর করতে এর বিকল্প নেই।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews