ঢাক-ঢোল আর রঙের মহোৎসবে মেতে উঠেছে পুরো পৃথিবী! ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পর্দা উঠল ২০২৬ বিশ্বকাপের। আর এই মহাযজ্ঞের সূচনা যেখানে হলো, তা কেবল একটি স্টেডিয়াম নয়, বরং ফুটবলের এক জীবন্ত উপাসনালয়; মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়াম। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র ভেন্যু হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখার এক অনন্য কীর্তি গড়ল এই ‘ক্যাথেড্রাল’।
আজতেক সভ্যতার সোনালি অতীত যেন জ্যান্ত হয়ে উঠেছিল মাঠের বুকে। সোনালি পোশাকে পারফরমারদের চোখ ধাঁধানো নাচ আর মেক্সিকান সংগীতশিল্পী লিলা ডাউনসের সুরেলা কণ্ঠ যখন গেয়ে উঠল ‘বিশ্ববাসী, মেক্সিকোয় স্বাগত’, তখনই কেঁপে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম।

এর পরপরই মেক্সিকোর কিংবদন্তি রক ব্যান্ড ‘মানা’ মঞ্চে এসে সুর তুলল ‘ওই মি আমোর’। আর তাতেই গ্যালারিতে আছড়ে পড়ল সেই বিখ্যাত ‘মেক্সিকান ওয়েভ’। হাত উঁচিয়ে দর্শকদের তৈরি করা সেই মানব-ঢেউ স্টেডিয়ামের গণ্ডি পেরিয়ে ছুঁয়ে গেছে টিভির পর্দায় চোখ রাখা কোটি কোটি ফুটবল পাগল মানুষের হৃদয়।

ভেনেজুয়েলার ড্যানি ওশান কিংবা কলম্বিয়ান জে বলভিনরা মঞ্চ মাতালেও, গ্যালারির অপেক্ষা ছিল একজনের জন্য। তিনি আর কেউ নন, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অবিসংবাদিত ‘রানি’ শাকিরা! হলুদ, বেগুনি আর সাদা পোশাকের ঝলকানিতে শাকিরা যখন সানগ্লাস চোখে মঞ্চে পা রাখলেন, তখন আজতেকা স্টেডিয়ামের উন্মাদনা রূপ নিল এক মহাসমুদ্রে।

নাইজেরিয়ান গায়ক বার্না বয়কে সাথে নিয়ে শাকিরা যখন ধরলেন ‘দাই দাই’ গানের সুর, তখন প্রবীণ থেকে তরুণ—সবাই যেন ২০১০-এর সেই স্মৃতি জড়ানো ‘ওয়াকা ওয়াকা’র জাদুতে ফিরে গেলেন। শাকিরা ছাড়া কি আর ফুটবল বিশ্বকাপ জমে? দর্শক-হৃদয় কাঁপিয়ে আবারও তা প্রমাণ করলেন এই কলম্বিয়ান পপ সম্রাজ্ঞী।

৮০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যখন সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরলেন, তখন গ্যালারির গর্জন যেন আকাশ ছুঁয়েছিল। তবে এই মহোৎসবের আড়ালে মেক্সিকো সিটির ফ্যান জোনগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা।

ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা ছিল না কোথাও। ফ্যান জোনে ঢুকতে না পেরে ক্ষুব্ধ দর্শকদের সাথে নিরাপত্তারক্ষীদের ধস্তাধস্তি, এমনকি বোতল ছুঁড়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে। অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক ফুটবলপ্রেমী।

তবে সমস্ত বিশৃঙ্খলা আর বিতর্ক ধুয়ে-মুছে গেছে ফুটবল আর সুরের এই মেলবন্ধনে। লাল রঙে রাঙানো আজতেকা স্টেডিয়াম যেন ফিরে গেছে ১৯৮৬ সালের সেই সোনালি অতীতে, যেখানে জন্ম হয়েছিল দর্শকদের এই বিখ্যাত করতালির ঢেউ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে স্বাগতিক মেক্সিকো যখন দক্ষিণ আফ্রিকার ‘বাফানা বাফানা’দের মুখোমুখি হতে মাঠে নামে, ততক্ষণে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়ে গেছে ফুটবলের এক নতুন ইতিহাস। ৪৮টি দেশের এই মহাসংগ্রামের রাজমুকুট কার মাথায় উঠবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে শাকিরার সুরে আর আজতেকার ঐতিহ্যে যে মহাকাব্যিক শুরুটা হলো, তা ফুটবলপ্রেমীদের মনে দাগ কেটে থাকবে অনন্তকাল।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ