ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি সমকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক ঘটনা। চার বছর পরপর আয়োজিত এই মহাযজ্ঞে প্রতি খেলায় মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ২২ জন খেলোয়াড়, কিন্তু এর প্রভাব বিস্তৃত হয় কোটি কোটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশের জনজীবনে যে উৎসবমুখর আবহ গড়ে উঠছে, তা আবারও প্রমাণ করছে ফুটবল এ দেশের মানুষের কাছে নিছক খেলা নয়; এটি আবেগ, পরিচয় এবং বৈশ্বিক সংযোগের এক শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশের শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে শুরু হয়েছে ফুটবল উৎসবের উদ্মাদনা। বাজারে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দেশের জার্সি, পতাকা, ব্যানার, স্টিকার ও সমর্থক সামগ্রী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে পরিসংখ্যানের লড়াই, যুক্তিতর্ক, ট্রল ও মিমের বন্যা। বাংলাদেশের জনপরিসরে বিশ্বকাপ যেন ধীরে ধীরে একটি জাতীয় সামাজিক উৎসবে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। পেলের ব্রাজিল, ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা কিংবা পরবর্তী সময়ে রোনালদো, রোনালদিনহো, নেইমার ও লিওনেল মেসির মতো তারকারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলাদেশি সমর্থক তৈরি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই সমর্থন পারিবারিক উত্তরাধিকারেও পরিণত হয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ এলেই দেশের অলিগলি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সবখানেই ফুটবল হয়ে ওঠে আলোচনার প্রধান বিষয়।

তবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উন্মাদনাকে শুধু আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, ‘সফট পাওয়ার’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাই দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়; সংস্কৃতি, ক্রীড়া, শিক্ষা এবং মূল্যবোধের মাধ্যমেও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ফুটবল আজ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের জন্য এমনই এক শক্তিশালী সফট পাওয়ারের উৎস।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ হয়তো এসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে বিশদ জানে না, কিন্তু ফুটবলের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে একটি আবেগগত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ব্রাজিল বললে যেমন সাম্বা ও সৃজনশীল ফুটবলের কথা মনে পড়ে, তেমনি আর্জেন্টিনা মানেই ম্যারাডোনা ও মেসির স্মৃতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটি সাংস্কৃতিক কূটনীতির এক সফল উদাহরণ, যেখানে খেলাধুলা রাষ্ট্রীয় সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

বিশ্বকাপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও একটি মৌসুমি গতি সঞ্চার করে। জার্সি, পতাকা, ব্যানার, ক্যাপ, বাঁশি এবং অন্যান্য সামগ্রীর বাজারে সৃষ্টি হয় উল্লেখযোগ্য চাহিদা। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে বড় ব্যবসায়ী, অনেকের জন্যই বিশ্বকাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশ্বকাপ ঘিরে বিশেষ বিপণন কৌশল গ্রহণ করে, যা বিজ্ঞাপন শিল্পে নতুন গতি নিয়ে আসে।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিশ্বকাপকেন্দ্রিক বিশেষ অনুষ্ঠান, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রচার করছে।

ডিজিটাল যুগে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের মতো

প্ল্যাটফর্ম ফুটবল আলোচনাকে আরও গণমুখী করেছে। ফলে ফুটবল আজ কেবল মাঠের খেলা নয়; এটি একটি ডিজিটাল  সামাজিক বাস্তবতা।

অবশ্য উন্মাদনার কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। কখনো কখনো সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত, বেপরোয়া শোভাযাত্রা কিংবা সামাজিক বিভাজনের ঘটনাও দেখা যায়। ফুটবলের প্রকৃত চেতনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে উৎসাহিত করে, বিদ্বেষকে নয়। তাই উৎসবের আবেগকে দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের মধ্যেই  সীমাবদ্ধ রাখা জরুরি। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে এর আয়োজক কাঠামোতেও। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে এই আসরের আয়োজন করছে।

♦ লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews