উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিত্তশালীদের আয়ে বাড়তি কর আরোপের চিন্তা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), যা ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে কার্যকর হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও রাজস্ব ভবনে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় তিনি এ কথা জানান। এদিন সংবাদপত্রশিল্প মালিকদের সংগঠন নোয়াব, টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো, অর্থনীতি সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফ-এর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেন এনবিআর-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
দুপুরে প্রাক-বাজেট আলোচনায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের সর্বোচ্চ করহার ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করে ইআরএফ। এর জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, উন্নত দেশে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের সর্বোচ্চ করহার ৪৫-৫৫ শতাংশ আছে। বাংলাদেশেও এটি একসময় ৬০ শতাংশ ছিল, আশির দশকে। পরে এটি ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বছরে কোটি টাকার বেশি যাদের আয় আছে, তাদের করহার আরও ৫ শতাংশ বাড়ানো যেতে পারে। তবে এটি ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে প্রযোজ্য হবে। কেননা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করহার চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আবদুর রহমান খান আরও বলেন, কোটি টাকার ওপরে যাদের আয় আছে, এটা এক কোটি, দুই কোটি বা চার-পাঁচ কোটিও হতে পারে-তাদের কর বাড়ানো যেতে পারে। এটা উচ্চবিত্তদের জন্য একটি সংকেত যে বেশি আয় করলে বেশি টাকা কর দিতে হবে। বাজেট প্রস্তাবে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কমাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত কর ফেরত এবং যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের ব্যাংক সুদের ওপর কর্তিত কর ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব করেন। এছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণে করহার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রাখা, সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড করমুক্ত রাখা; ব্যক্তি করদাতার সর্বোচ্চ করহার ৩০-৩৫ শতাংশ নির্ধারণ; ভ্যাটের একক হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ এবং বাজার মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পদ কর আদায়ের প্রস্তাব দেন তিনি।
সংবাদপত্রশিল্পে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব : এর আগে সকালে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেয় নোয়াব ও অ্যাটকো। নোয়াব সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী সংগঠনের পক্ষে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, সংবাদ সম্পাদক ও প্রকাশক আলতামাশ কবির এবং বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সংবাদপত্রের প্রধান উপাদান নিউজপ্রিন্টের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ছয় মাস আগেও আমদানিকৃত কাগজের প্রতি টনের দাম ছিল ৫৬০ ডলার, সে দাম বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৬৩০ ডলার। সার্বিকভাবে নিউজপ্রিন্টের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। তার ওপর ডলারের বিনিময় হারও অত্যন্ত বেশি। এ অবস্থায় নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে শুল্ক-ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর, বিজ্ঞাপনের উৎসে আয়কর প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, এক কপি পত্রিকা বের করতে সব মিলিয়ে ২৮ টাকা খরচ হয়। পক্ষান্তরে পাঠক কমছে, বিজ্ঞাপন কমছে, আয় কমছে। অনেক সংবাদপত্রকর্মীদের বেতন দিতে কষ্ট হচ্ছে। তাই সব শিল্প যেমন সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা চায়, আমরাও চাই। তিনি আরও বলেন, ‘তৈরি পোশাকশিল্প ১০-১২ শতাংশ করপোরেট কর দেয়। অথচ অলাভজনক সংবাদপত্রশিল্পকে দিতে হয় সাড়ে ২৭ শতাংশ। এই হার কমানো যৌক্তিক।
এর জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ‘সংবাদপত্রশিল্পের করপোরেট কর বাড়বে না, এটা নিশ্চিত করতে পারি। অন্যান্য শুল্ক-কর নিয়ে আগামী বাজেটে যৌক্তিকভাবে কিছু করা হবে।’
সারা বছর রিটার্ন দেওয়া যাবে : আগামীতে বছরজুড়ে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার আয়কর রিটার্ন জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর হলেও এবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এটি বাড়িয়ে মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে। রিটার্ন জমার বিদ্যমান আইন পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে। যেমন: প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) যারা রিটার্ন দেবেন, তারা প্রণোদনা বা কর রেয়াত পাবেন। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) যারা দেবেন, তারা নিয়মিত হারে আয়কর দেবেন। এর পরের প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) রিটার্ন দিলে জরিমানা হবে। এর পরের প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দিলে জরিমানা আরেকটু বাড়বে। এ সময় তিনি সম্পদ কর এবং সিটি করপোরেশনের ভেতরে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ক্ষেত্রেও কর বসানোর ভাবনার কথা তুলে ধরেন।