বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় দুই কোটি শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেয়া হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটি ৮০ লাখ। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে টিকাদান কর্মসূচি। তারপরও চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম রোগে ভুগে এক হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় টিকাদান কর্মসূচির পরও কেন এই প্রাণহানি?
ঢাকা থেকে আল জাজিরা সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এক হাজার নয়জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হওয়া রোগী ১০০ জন এবং সন্দেহভাজন হাম রোগী ৯০৯ জন। অথচ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে।
এক বছরের সাইফ হাসানের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার একটি উদাহরণ। গত ২৭ আগস্ট ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যায় শরীয়তপুরের এই শিশু।
প্রথম হাম-রুবেলা টিকা নেয়ার কয়েক দিন পর সাইফের জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তার পরিবার ভেবেছিল, টিকার কারণেই হয়তো সে অসুস্থ হয়েছে। তবে হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট শ্রেবাশ পাল বলেন, আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের একটি রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিল সাইফ। টিকা কার্যকর হওয়ার আগেই সম্ভবত সে হামে আক্রান্ত হয়েছিল। এরপর সংক্রমণটি তার আগের অসুস্থতাকে আরো গুরুতর করে তোলে।
লক্ষ্যামাত্রাই কি ছিল ভুল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বেশি সংখ্যক শিশুকে টিকা দেয়ার পরও সংক্রমণ চলতে থাকার একটি বড় কারণ হলো শুরুতেই টিকা পাওয়ার যোগ্য শিশুর সংখ্যা কম ধরে হিসাব করা হয়েছিল। আবার জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের উচ্চ হার দেখালেও অনেক এলাকায় এখনো বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ শিশু রয়ে গেছে।
প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরেই হাম নির্মূলের পথে এগোচ্ছিল। কিন্তু টিকাদানের হার কমতে থাকায় ক্রমে বিপুলসংখ্যক শিশু সুরক্ষার বাইরে চলে যায়।
টিকার লাইনে সন্তান নিয়ে মায়েরা- আল জাজিরা
২০২৩ সালের কভারেজ মূল্যায়ন জরিপে দেখা যায়, হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজের আওতা ২০১৯ সালের ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। দ্বিতীয় ডোজের হার একই সময়ে ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও ব্যাহত হয়। ইউনিসেফের মতে, ভুল তথ্য এবং টিকা নিতে অনীহাও অনেক শিশুর টিকা না পাওয়ার কারণ ছিল।
এ ছাড়া ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির পর এ বছর পর্যন্ত দেশে হাম-রুবেলার কোনো জাতীয় সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি হয়নি। অথচ হাম সংক্রমণ বন্ধ করতে প্রায় ৯৫ শতাংশ টিকাদান প্রয়োজন। এর নিচে থাকায় বছরের পর বছর ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সরকার পরিবর্তনের কারণে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব হয় বলে জানান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন। এর ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকার সংকট দেখা দেয়।
জাতীয় গড়ের আড়ালে ফাঁক
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে হাম রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে এবং মার্চে তা দ্রুত বেড়ে যায়। ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দেশব্যাপী প্রাদুর্ভাবের কথা জানায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় রোগী শনাক্ত হয়।
৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান শুরু হয়। ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী কর্মসূচি চালু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু মাত্র দুই মাস পর, ২৮ জুন একই বয়সী প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকার। অর্থাৎ দুই কর্মসূচির লক্ষ্যভুক্ত শিশুর সংখ্যায় প্রায় ৬০ লাখের পার্থক্য ছিল। এই ফারাকই ব্যাখ্যা করে, কীভাবে সরকার প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেয়ার পরও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর সন্ধান পাচ্ছে।
মুশতাক হোসেন বলেন, টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত জনসংখ্যার হিসাব টিকা পাওয়ার যোগ্য শিশুর প্রকৃত সংখ্যা কম ধরে নিয়েছিল। তিনি বলেন, শুধু জাতীয় গড় দেখলে হবে না। দুর্গম এলাকা ও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচলকারী মানুষসহ সব জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে হবে।
হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। ফলে টিকা না পাওয়া মানুষের ছোট একটি গোষ্ঠীও ভাইরাসের সংক্রমণ টিকিয়ে রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের উচ্চ হার স্থানীয় পর্যায়ের এই সুরক্ষা ঘাটতি আড়াল করে ফেলতে পারে।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি হওয়া হাম রোগীদের অধিকাংশই টিকা নেয়নি বলে জানান শ্রেবাশ পাল। অসুস্থ থাকার কারণে কিছু শিশু টিকাদান কর্মসূচির সময় টিকা নিতে পারেনি। তবে হাসপাতালের ভর্তি রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কমেছে, যা টিকাদান কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। তবু নতুন রোগী আসা বন্ধ হয়নি।
নিয়মিত টিকার আগেই মৃত্যু
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য আরো উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে তিন হাজার ১৬৭ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী, ৫৩৭ জন পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী এবং নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন মিলিয়ে ৫৭টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়।
মৃতদের বেশির ভাগই খুব ছোট শিশু। ৫৭ জনের মধ্যে ৪৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ মাসের কম। এর মধ্যে ৩১ জনের বয়স ছিল নয় মাসেরও কম। বাংলাদেশে সাধারণত নয় মাস বয়সে শিশুকে প্রথম হাম-রুবেলা টিকা দেয়া হয়।
হাসপাতালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মারা যাওয়া ৫৭ জনের মধ্যে ৪৭ জন, অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ কোনো হাম টিকা পায়নি। নথিভুক্ত ৫০টি মৃত্যুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ছিল প্রধান জটিলতা।
চিকিৎসকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, যেসব শিশু নিয়মিত টিকা নেয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। নয় মাসের আগে আক্রান্ত শিশু এবং তাদের মায়েদের নিয়ে বিষয়টি আরো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে এই হাসপাতালের তথ্যকে জাতীয় পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ এটি একটি বিশেষায়িত রেফারেল হাসপাতাল, যেখানে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গুরুতর রোগী আসে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হালিমুর রশিদ জানান, কর্তৃপক্ষ আরো এক দফা টিকাদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তা শুরু হওয়ার কথা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার শুধু জাতীয় পর্যায়ে বড় একটি টিকাদানের সংখ্যা দেখালেই চলবে না। কোন এলাকায় কোন শিশুর টিকা হয়নি, তা খুঁজে বের করে পাড়ায় পাড়ায় পরিকল্পনা করতে হবে। নজরদারিতে যেখানে বড় ধরনের সুরক্ষা ঘাটতি পাওয়া যাবে, সেখানে বড় বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার কথা বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন মুশতাক হোসেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মহামারিবিদ বলেন, আক্রান্ত এলাকায় ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকা দেয়া প্রয়োজন হতে পারে।
তবে অনেক পরিবারের জন্য ইতোমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেই ফাঁকেই হারিয়ে গেছে পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের কিশোরগঞ্জ জেলার নয় মাস বয়সী মোস্তাকিম। হাম রোগের কোনো টিকা পায়নি সে। গত ৩০ আগস্ট ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেই তার মৃত্যু হয়।