ঢাকার এক সাধারণ সকাল। ৭২ বছর বয়সি রহিম সাহেব প্রতিদিনের মতো চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসেছেন। চারপাশে হালকা বাতাস, পাখির ডাক-সবই ঠিক আছে, কিন্তু আজ কিছু যেন আলাদা। চায়ের সেই চেনা, প্রিয় গন্ধটা তিনি অনুভব করতে পারছেন না। প্রথমে বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দিলেন- ‘হয়তো ঠান্ডা লেগেছে।’ কিন্তু কয়েক দিন ধরে যখন একই ঘটনা ঘটতে থাকল, তখনো তিনি ভাবেননি যে এটি কোনো বড় সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। আমাদের সমাজে এমন ঘটনা খুবই সাধারণ।

আমরা অনেকেই ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়াকে তেমন গুরুত্ব দিই না। কিন্তু আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, এই ছোট পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে মস্তিষ্কের গভীরে শুরু হওয়া কোনো গুরুতর প্রক্রিয়ার সূচনা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা, যা Nature Communications (২০২৪)-এ প্রকাশিত হয়েছে, এই ধারণাটিকে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছে। এই গবেষণায় দেখা গেছে, ঘ্রাণশক্তি হ্রাসের সঙ্গে মস্তিষ্কে : ধঁ ঢ়ৎড়ঃবরহ জমার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

এই গবেষণাটি শুধু ধারণার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করা হয়েছে। মোট ৪১৮ জন সুস্থ বয়স্ক মানুষকে নিয়ে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। তাদের মধ্যে ১৫৫ জনের মস্তিষ্ক PET scan-এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয় এবং ৮৯ জনকে প্রায় ২.৫ বছর ধরে অনুসরণ করা হয়। গবেষণার ফলাফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেসব মানুষের গন্ধ শনাক্ত করার ক্ষমতা কম ছিল, তাদের মস্তিষ্কে :  au protein জমার পরিমাণ বেশি দেখা গেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই :  au protein কোথা থেকে শুরু হয় এবং কীভাবে ছড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি প্রথমে মস্তিষ্কের medical temporal lobe নামের অংশে জমা হতে শুরু করে, যা আমাদের স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এরপর ধীরে ধীরে এটি olfactory system বা ঘ্রাণ ব্যবস্থার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ গন্ধ কমে যাওয়া অনেক সময় মস্তিষ্কের ভিতরে আগে থেকেই চলতে থাকা পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান লক্ষণ।

আমাদের ঘ্রাণশক্তি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য একটু গভীরে যেতে হবে। অন্যান্য ইন্দ্রিয় যেমন চোখ বা কান, সেগুলো প্রথমে মস্তিষ্কের একটি মধ্যবর্তী অংশ থ্যালামাস দিয়ে তথ্য পাঠায়। কিন্তু ঘ্রাণশক্তি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি সরাসরি মস্তিষ্কের সেই অংশে পৌঁছে যায়, যেগুলো স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িত। যেমন amygdala Ges hippocampus। এ কারণেই কোনো গন্ধ হঠাৎ আমাদের বহু পুরোনো স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এই সরাসরি সংযোগই আবার সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন

au protein জমা হতে শুরু করে, তখন এটি প্রথমেই এই অঞ্চলগুলোকে আঘাত করে। ফলে একজন মানুষ প্রথমে গন্ধ চিনতে অসুবিধা বোধ করে। তারপর ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ Alzheimers disease রোগীর ক্ষেত্রেই ঘ্রাণশক্তি হ্রাস প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনটি অনেক সময় স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার ১০-১৫ বছর আগেই শুরু হতে পারে। গবেষণাটি আরও একটি আকর্ষণীয় তথ্য দিয়েছে। সব গন্ধ সমানভাবে প্রভাবিত হয় না। কিছু নির্দিষ্ট গন্ধ-যেমন  cherry, cinnamon, leather-চিনতে না পারা : au protein জমার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। অর্থাৎ ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে, কিছু নির্দিষ্ট গন্ধ দিয়ে পরীক্ষা করেই একজন মানুষের মস্তিষ্কে রোগের ঝুঁকি নির্ণয় করা সম্ভব হবে। এখন যদি আমরা বাস্তব জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ধরুন, গ্রামের বৃদ্ধ  হালিমা খাতুন। তিনি প্রতিদিন নিজের হাতে রান্না করেন। একদিন রান্না করতে গিয়ে তিনি বুঝতেই পারলেন না যে ভাত পুড়ে গেছে। পরিবার ভেবেছিল, এটি বয়সজনিত সমস্যা। কিন্তু কয়েক মাস পরে তিনি পরিবারের সদস্যদের নাম ভুলতে শুরু করলেন। তখন বিষয়টি আর ছোট থাকল না। এ ধরনের ঘটনা আমাদের চারপাশে খুবই সাধারণ। কিন্তু আমরা অনেক সময় এটিকে গুরুত্ব দিই না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে বায়ুদূষণ একটি বড় সমস্যা, সেখানে অনেকেই মনে করেন ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়ার কারণ শুধু পরিবেশগত। আবার সর্দি-কাশি, সাইনোসাইটিস বা ভাইরাল সংক্রমণের কারণেও ঘ্রাণশক্তি কমে যেতে পারে। ফলে মানুষ প্রকৃত কারণটি বুঝতে পারে না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। উন্নত প্রযুক্তি যেমন PET scan ev advanced গজও সব জায়গায় সহজলভ্য নয় এবং এগুলোর খরচও অনেক বেশি। গ্রামীণ অঞ্চলে তো এই সুবিধাগুলো নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধানের দিক নির্দেশ করে smell identification test।

এই পরীক্ষাটি খুবই সহজ। রোগীকে কিছু নির্দিষ্ট গন্ধ শুকিয়ে তা শনাক্ত করতে বলা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোঝা যায়, তার ঘ্রাণশক্তি কতটা ঠিক আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সহজ পরীক্ষার ফলাফল ভবিষ্যতে cognitive decline বা স্মৃতিশক্তি হ্রাসের পূর্বাভাস দিতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এটি সাধারণ স্মৃতিশক্তি পরীক্ষার চেয়েও বেশি কার্যকর।

সবশেষে একটি বিষয় বুঝতে হবে ঘ্রাণশক্তি হারানো মানেই যে আলঝেইমার হবে, তা নয়। কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হতে পারে। শরীর অনেক সময় আগেই সংকেত দেয়, কিন্তু আমরা তা উপেক্ষা করি। রহিম সাহেবের গল্পটি আমাদের সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়। আজকের দিনে, যখন বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে নানা ধরনের অসংক্রামক রোগও বাড়ছে তখন এই ধরনের সহজ লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি আমরা ঘ্রাণশক্তির পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা করতে পারি, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে রোগের বিস্তার ধীর করা সম্ভব হবে এবং রোগীর জীবনমান তুলনামূলক উন্নত করা যাবে।

তাই এখন সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর।  গন্ধ না পাওয়া আর শুধু ‘সাধারণ সমস্যা’ নয়-এটি হতে পারে মস্তিষ্কের গভীরে চলতে থাকা এক নীরব পরিবর্তনের প্রথম সংকেত। হয়তো আপনারও কখনো মনে হয়েছে-আগের মতো গন্ধ পাচ্ছেন না। সেই মুহূর্তটিকে হালকাভাবে না নিয়ে একটু থেমে ভাবুন।  কারণ কখনো কখনো একটি ছোট পরিবর্তনই হতে পারে একটি বড় গল্পের শুরু এমন একটি গল্প, যা শুরু হয় গন্ধ হারানো দিয়ে, আর শেষ হয় স্মৃতি হারানোর মাধ্যমে।

♦ লেখক :  প্রাবন্ধিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews