মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক জাকারবার্গকে তিন দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে ভারত সরকার। গত ২৩ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পোস্ট করা একটি ভিডিও ফেসবুক থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেয়ার ঘটনায় ক্ষমা চাইতে জাকারবার্গকে এই আল্টিমেটাম দিয়েছে দেশটির সংসদের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক স্থায়ী কমিটি। খবর এনডিটিভির।
বিজেপি সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবের নেতৃত্বাধীন কমিটির দাবি, ১৪০ কোটিরও বেশি ভারতীয়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভিডিও সরিয়ে দেয়া “গণতন্ত্রের ওপর আঘাত”।
এদিন কমিটি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেটা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এবং মার্ক জাকারবার্গ ক্ষমা না চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জন্য বিদ্যমান ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হবে। প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরও করা হতে পারে।
কমিটির মতে, ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা প্রত্যাহার করা হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি এফআইআর দায়েরের পথ উন্মুক্ত হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। নিশিকান্ত দুবে অভিযোগ করেন, মেটা ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষার সুবিধার অপব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, “আমরা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখেছি যে, প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও সরিয়ে দেয়া কোনো মধ্যস্থতাকারীর কাজ নয়, বরং এটি প্রকাশকের ভূমিকা। তাই মার্ক জাকারবার্গকে তিন দিনের মধ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর জন্য বিদ্যমান ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা প্রত্যাহার করা হবে, যা তারা দীর্ঘদিন ধরে অপব্যবহার করছে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক ব্যক্তি যদি মেটার প্রধানের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেন, তাহলে সারা দেশে অসংখ্য মামলা হতে পারে এবং দায়ীদের আইনি পরিণতি ভোগ করতে হবে।
কী ছিল ভিডিওতে
নরেন্দ্র মোদির ওই ভিডিওটি প্রথমে ইনস্টাগ্রামে এবং পরে ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়। এটি ছিল তার প্রথম সরাসরি সেলফি ভিডিও, যেখানে তিনি ‘জেন জেড’-এর উদ্দেশে বার্তা দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সে সময় ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি)’ নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। পরে মেটা ফেসবুকে ভিডিওটি সাময়িকভাবে সীমিত করে।
তবে পরবর্তী সময়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ার পর মেটা দ্রুত ভিডিওটি পুনরায় চালু করে। এনিয়ে ভারতের সংসদীয় কমিটির সঙ্গে বৈঠকে মেটার কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে কঠোর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।
মেটা জানায়, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই ভিডিওটি সাময়িকভাবে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল এবং এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি দুঃখ প্রকাশ করে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মেটার এই ব্যাখ্যাকে “যৌক্তিক নয়” বলে মন্তব্য করে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, যদি এটি সত্যিই প্রযুক্তিগত ত্রুটি হয়ে থাকে, তবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেটার উচিত দ্রুত নিজেদের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার উন্নয়ন করা।
শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্ট নিয়েও কড়া অবস্থান
ইনস্টাগ্রামে অর্থের বিনিময়ে প্রচারিত শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্ট নিয়ে মেটা ইতোমধ্যেই ভারত সরকারের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। গত মাসে এ বিষয়ে মেটাকে নোটিশও দেয় ভারত সরকার।
সংসদীয় কমিটি জানিয়েছে, শুধু মেটা নয়, গুগল, ইউটিউব, এক্স, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং স্ন্যাপচ্যাটসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে (সিএসএএম) সংক্রান্ত নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শিশুদের বিরুদ্ধে নিবন্ধিত ১,২৩৮টি সাইবার অপরাধের মধ্যে এক হাজার ৯৯টি ছিল শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত স্পষ্ট কনটেন্ট প্রকাশ বা প্রচারের অভিযোগ।
এর আগে মঙ্গলবার নিশিকান্ত দুবে বলেন, শিশু যৌন নির্যাতন একটি জঘন্য অপরাধ। ভারতে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট গ্রহণযোগ্য নয়। শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নারীদের ভুয়া ভিডিও কিংবা নারীদের অশালীনভাবে উপস্থাপন- সবই গুরুতর অপরাধ। এটি রাজনৈতিক দল, ধর্ম বা জাতপাতের ঊর্ধ্বে একটি বিষয়, কারণ শিশু ও নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত অত্যন্ত সংবেদনশীল।