মতিউর রহমান চৌধুরী জাঁদরেল সম্পাদক। সাংবাদিকতার নানা আঙ্গিকে কাজ করেছেন। কখনো বিশ্বকাপ ফুটবল কাভার করেছেন। কখনো ক্রিকেট বিশ্বকাপে ছুটে গেছেন। কখনো বিনোদন সাংবাদিকতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। বহুমাত্রিক সাংবাদিকতার পরিচয় তার রয়েছে। এসব নিয়েই আলাপ করছিলাম মতিউর রহমান চৌধুরী আমাদের মতি ভাইয়ের সঙ্গে। আমরা মতি ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে থাকি। প্রতিদিন চ্যানেল আইয়ের পর্দায় তিনি উপস্থাপনা করেন। প্রতিদিন যে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় সেই সব পত্রিকা নিয়ে এই অনুষ্ঠান। মতি ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল আনন্দ আলো পত্রিকার একুশ বছর পূর্তিতে। ওয়েস্টিনের বিশাল বলরুমে বেশ কিছু অতিথি উপস্থিত ছিলেন সেখানে। দেখলাম রামেন্দু মজুমদার, হাশেম খান, হাবিবুর রহমান খান, ইমদাদুল হক মিলন, শাইখ সিরাজ সহ অতিথিরা গোল টেবিলে বসে আছেন। মাঝে মাঝে আনন্দ আলো সম্পাদক কিংবা খায়রুল বাশার তাদেরকে মঞ্চে ডাকছেন এবং তারা বক্তৃতা দিচ্ছেন। একটা অন্যরকম মিলনমেলা। আমার তখন মনে পড়ল এক সময় আমিও বিনোদন সাংবাদিকতা করেছি। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। তখন সিনেমা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। চিত্রালির মতো বড় পত্রিকা। কাভারে কোনো এক নায়িকার একটা ছবি ছাপা হতো। আর ভেতরে নানারকম মুখরোচক খবর। সেই পত্রিকায় আমি নিয়মিত টেলিভিশন নিয়ে লেখা লিখতাম। দু একদিন পরপর যেতাম বাংলাদেশ অবজারভার ভবনে। সেখানেই ছিল সিনেমা পত্রিকার অফিস। আমি ছিলাম অভিনয় কুমার দাসের ছায়াসঙ্গী। প্রতি সপ্তাহে লেখা নিয়ে যেতাম। তিনি আমার সাথে খোশগল্প করতেন। গল্পের নানা বিষয় ছিল। লেখা ভালো হলে ছেপে দিতেন। আর যদি খারাপ হতো লেখা তাহলে কথা শোনাতেন। বলা যেতে পারে তার হাত ধরেই আমার বিনোদন সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। পরবর্তী সময়ে ছায়াছন্দে চলতি বিষয় নিয়ে একটি কলাম দীর্ঘদিন ধরে লিখেছি। চিত্রবাংলায় কলাম লিখেছি অনেকদিন। ললনা নামের একটি পত্রিকায় টেলিভিশনের সমালোচনা লিখেছি। পরবর্তীকালে আমরা যখন চ্যানেল আই প্রতিষ্ঠা করলাম তখন এই ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ে একটি বিনোদন পত্রিকার। রেজানুর রহমানকে সম্পাদক করে প্রকাশ করা হয় বিনোদন পত্রিকা আনন্দ আলো। দামি কাগজে সুদৃশ্য চার রঙে ছাপা। সুন্দর গেটাপ মেকাপ। পত্রিকাটি দেখলেই মন ভরে যায়। এই পত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি হিসেবে। প্রতি পনের দিনে এটি প্রকাশিত হয়। গত একুশ বছরে একটি বারের জন্যও পত্রিকাটি প্রকাশনায় ব্যর্থ হয়নি।
এক সময় আনন্দ আলো ছোটদের জন্য শিশু আনন্দ আলো নামে প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। প্রতি বছর বইমেলায় আনন্দ আলো বইমেলা প্রতিদিন নামে প্রকাশিত হয়। পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছে দেয়া হয় এটি। আনন্দ আলো নিয়ে আরও বৈচিত্র্যপুর্ণ স্বপ্ন আছে আমাদের। নিউইয়র্ক থেকে বের হবে। ক্যানবেরা থেকে বের হবে। লন্ডন থেকে বের হবে। অনুষ্ঠানটি যখন চলছে তখন এই একুশ বছরের সাফল্য তুলে ধরা হচ্ছে। তখন রেজানুরের মতো আমারও চোখ ভিজে উঠল। ভেতর থেকে যেন কান্না বেরিয়ে আসছে। কত কষ্ট, কত শ্রম আমাদের গেছে সেটা ভাবতেই চোখের সামনে সেই দিনগুলো ভেসে ওঠে। মতিউর রহমান চৌধুরী তার বক্তৃতায় বললেন, পত্রিকা বের করা এখন অনেক কঠিন। রেজানুর রহমানের ভাগ্য অনেক ভালো যে তার সঙ্গে আছে জাঁদরেল সব শিল্পপতি তারা নিরন্তর সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন আনন্দ আলোকে। আর আনন্দ আলো একের পর এক চমক দেখিয়ে যাচ্ছে। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন বললেন, রেজানুর একা নন আমরা সবাই আছি তার সঙ্গে। চলচ্চিত্র প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান বললেন, স্বপ্ন মরে গেলে সব ধ্বংস হয়ে যায় আশা আনন্দ আলোর আশা কোনোদিন মরবে না।
কথাগুলো শুনছিলাম। আসলে প্রতিটি সৃষ্টির পথেই থাকে রক্তক্ষরণ। আনন্দ আলোর জন্যও আছে অনেক অনেক রক্তপাত। যদি কেউ লেখেন তাহলে প্রকাশিত হবে যে টাকা থাকলেই এরকম একটি পত্রিকা প্রকাশ করা যায় না। এই আনন্দ আলোর কাভার স্টোরি থেকে আমরা অনেক বিখ্যাত মানুষকে পেয়েছি সিনেমা এবং নাটকে। আমরা পেয়েছি- সেরা কন্ঠ, ক্ষুদে গানরাজ। গানের শিল্পী, নাটকের শিল্পী কত কিছু নিয়ে আনন্দ আলো কাজ করেছে। ওয়েস্টিনের লবিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেসব ভাবছিলাম। সেদিন ছিল পহেলা বৈশাখ যার কারণে অনেকেই অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি। তাতে আমার মন খারাপ হলো না। আরেকদিন বড় করে একটি অনুষ্ঠান হবে সেখানে আমরা সবাই মিলে আনন্দ করবো। বিনোদনে বন্ধু আমার আনন্দ আলো জেগে থাকবে চিরদিন। আনন্দ আলো পরম্পরায় বিশ্বাসী। এই যে আমার বাবা ফজলুল হক প্রথম চলচ্চিত্র বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘সিনেমা’বের করেছিলেন। তখন ঢাকা শহরে কোনো সিনেমা তৈরিও হয়নি। বোম্বে এবং কলকাতার সিনেমার খবরা খবর নিয়ে পত্রিকাটি প্রকাশ হতো। পত্রিকার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, কাইয়ুম চৌধুরী, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ। হয়তো এর পেছনে পরম্পরাটাই আমাদের সাংবাদিকতার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। পরবর্তীকালে দেখেছি ফজল শাহাবউদ্দিন, আহমদ জামান চৌধুরী, খন্দকার শাহাদাত হোসেন, শাহদাৎ চৌধুরী সব জাঁদরেল বিনোদন সাংবাদিক। তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ও ছিল। তাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি কাজও করেছি। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকও কিছুদিন চিত্রালীতে কাজ করেছেন। আমাদের বন্ধুরাও চলচ্চিত্র সাংবাদিকতায় সাফল্য লাভ করেছেন। প্রথমেই মনে পড়ে আবদুর রহমান-এর কথা। সেই চিত্রালীতে সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রিয়জন সম্পাদকও হয়েছেন। রহমান এখন আমাদের সঙ্গে আছেন। ফিল্ম এবং নাটকের হেন বিষয় নেই তিনি জানেন না। বিনোদন সাংবাদিকতায় অনেক রকম আইডিয়া নিয়ে একটা জীবন কাজ করে গেলাম। নিজের ঢোল নিজে পেটাতে নেই কিন্তু স্মৃতির ধূসর অ্যালবামে অনেক কথা অনেক স্মৃতি বারবার ঘুরে ফিরে আসে। আনন্দ আলোর একুশ বছরে রামেন্দু মজুমদার এক অসাধারণ বক্তব্য দিলেন, তিনি বললেন, একুশ নয় আরও অনেক বছর চলতে পারে আনন্দ আলো, থেমে গেলে চলবে না। হাশেম খানও একই কথা উচ্চারণ করলেন। সবার কথা শুনছি আর ভাবছি রেজানুর ইত্তেফাকের মতো একটি বড় পত্রিকা ছেড়ে আনন্দ আলোতে এসে কাজ করলেন। বিনোদন সাংবাদিকতা নিয়ে এতটি বছর কাটিয়ে দিলেন। সামনের দিনগুলোও তার বিনোদন সাংবাদিকতায় কেটে যাক। পত্রিকার আবেদন ফুরিয়ে যায় না, এখনো যায়নি। পত্রিকার মৃত্যু নেই পত্রিকা বেঁচে থাকবে চিরকাল। থাকবে পত্রিকার পাঠক। আর পাঠক মানেই মানুষ। মানুষ দেশের জন্য কাজ করে। সবার মন মননে প্রথিত থাকে সবার আগে দেশ।