অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধের বিকল্প হতে পারে। সরাসরি সঙ্ঘাতে না গিয়েও কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে চাপ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার এটি। যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে এটিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সবসময় আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে পারে না। ইরানের ক্ষেত্রে বাস্তবতা এটাই।

যে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের বড় অংশ ডলারের ওপর নির্ভরশীল, তার ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বহুগুণে বাড়তে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো এ বাস্তবতার ভিত্তি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আন্তঃদেশীয় ব্যাংকিংয়ে ডলারের আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার শক্তিশালী সক্ষমতা দিয়েছে। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার সাথে বৈশ্বিক ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গভীর সংযোগের কারণে এর প্রভাব তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও পড়ে। ফলে নিষেধাজ্ঞা শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি দেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তেও পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রথমদিকে জিম্মি সঙ্কট ও রাজনৈতিক বিরোধ এর প্রধান কারণ হলেও পরবর্তীতে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তা আরো বিস্তৃত হয়। ব্যাংকিং, তেল, গ্যাস, নৌপরিবহন, বীমা, প্রযুক্তি আমদানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ- প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।

২০১৫ সালের যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা ছিল নিষেধাজ্ঞা ও কূটনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা। এ সময় ইরান পারমাণবিক কর্মকাণ্ডে কিছু সীমাবদ্ধতা মেনে নেয়। বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গিয়ে আবারো ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করে। ফলে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ দ্রুত বাড়ে; ইউরোপীয় শক্তিগুলো চুক্তি ধরে রাখার চেষ্টা করলেও ইরানের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় আঘাত আসে তেল খাতে, কেননা তেল ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তেল বিক্রিতে বাধা, ব্যাংকিং বিচ্ছিন্নতা, পরিবহন ও বীমাসঙ্কট এবং বিদেশী বিনিয়োগের ঘাটতি অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন চাপে রেখেছে। ধারণা ছিল, এত দীর্ঘস্থায়ী চাপের ফলে ইরানের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বড় অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে ইরান সেই চাপ মোকাবেলার সক্ষমতা তৈরি করেছে।

ফলে অর্থনীতি গভীর সঙ্কটে পড়লেও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি।

নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি, কিন্তু আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কে কঠিন শিক্ষা নিয়েছে। ফলে বিদেশী পণ্যের বিকল্প দেশীয়ভাবে উৎপাদনের চেষ্টা করেছে। সব ক্ষেত্রে সফলতা আসেনি; প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও ওষুধ, পেট্রোরসায়ন, কৃষি, ধাতু, প্রকৌশল ও কিছু প্রযুক্তি খাতে দেশীয় সক্ষমতা বেড়েছে, যার ফলে অর্থনীতি সম্পূর্ণ অচল হয়নি। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন হলো বিকল্প বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। ডলারভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ সীমিত হওয়ায় দেশটি প্রতিবেশী ও এশীয় দেশগুলোর সাথে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, মধ্যস্থতাকারী এবং বিকল্প আর্থিক ও বাণিজ্যিক চ্যানেল ব্যবহার করেছে। এগুলো ডলারকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পূর্ণ বিকল্প নয়; তবে নিষেধাজ্ঞার চাপ কমাতে কার্যকর। একই সাথে ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে স্থল ও সামুদ্রিক বাণিজ্য বাড়িয়েছে।

চীনের সাথে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা। ২০২১ সালের পর ইরানের বিপুল অংশের পেট্রোলিয়াম রফতানি চীনে গেছে। ছোট চীনা শোধনাগার, মধ্যস্থতাকারী ও বিকল্প নৌপরিবহন ব্যবস্থা তেল রফতানি অব্যাহত রাখতে সহায়তা করেছে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক ইরানকে শুধু তেলের বাজার নয়, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও ভূরাজনৈতিক অংশীদারত্বেরও ভিত্তি দিয়েছে।

২০২৬ সালের বাস্তবতায় এই তেল বাণিজ্যই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে। স্ট্যানফোর্ডের ইরান ২০৪০ প্রকল্পের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর ইরান তেল ও তেলবহির্ভূত রফতানি পুনরুদ্ধার করে এবং ২০২৪ সালের মধ্যে তা আগের সমান বা তার চেয়েও বেশি হয়। তবে একই গবেষণা অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, সম্পদের অপব্যবহার ও দুর্নীতির কথাও উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ রফতানি টিকে থাকা মানেই অর্থনীতি সুস্থ হয়ে যাওয়া নয়।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র আবার ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি জোরদার করে। এর লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রফতানি, বিশেষ করে চীনে রফতানি, কমিয়ে আনা এবং পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা। ফলে নিষেধাজ্ঞা ইরানের পাশাপাশি তেল পরিবহন, নৌপরিবহন ও সংশ্লিষ্ট তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও বিস্তৃত হয়েছে।

ডি-ডলারাইজেশন এখন আর শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয় বরং চীন, রাশিয়া, ব্রিকসের কয়েকটি সদস্যসহ বিভিন্ন দেশ স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিকল্প অর্থপ্রদান ব্যবস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করছে; চীনের আন্তঃসীমান্ত আন্তঃব্যাংক অর্থপ্রদান ব্যবস্থা ও রাশিয়ার আর্থিক বার্তা স্থানান্তর ব্যবস্থা এর উদাহরণ। তবে ডলারের বিকল্প হিসেবে এগুলো এখনো অনেক দূরে। কারণ ডলারের শক্তি শুধু মার্কিন অর্থনীতির আকারে নয়, বরং গভীর আর্থিক বাজার, তারল্য, আস্থা ও দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ব্যবহারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই সম্পূর্ণ ডলারমুক্ত বিশ্বের চেয়ে বহুমুখী আর্থিক ব্যবস্থার বিকাশের সম্ভাবনাই বেশি।

ইরানের অভিযোজন শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিরক্ষা খাতেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে। অস্ত্র আমদানির সুযোগ সীমিত হওয়ায় ইরান নিজস্ব সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেশটিকে বুঝিয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য বিদেশী অস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকি। ফলে নিষেধাজ্ঞা যত দীর্ঘ হয়েছে, দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের গুরুত্বও তত বেড়েছে।

কম খরচে উচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত অস্ত্রের সংখ্যাগত প্রতিযোগিতার বদলে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন বিমান, নৌপ্রতিরক্ষা ও অসম যুদ্ধ সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে সরাসরি পরাজিত করা নয়; বরং সম্ভাব্য আক্রমণের ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়া।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান কর্মসূচি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০২৫ সালে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দেশেই উৎপাদনের সাথে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। একইভাবে সামরিক চালকবিহীন বিমান কর্মসূচির প্রযুক্তি সংগ্রহ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞাই পরোক্ষভাবে ইরানের দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্ব তুলে ধরছে।

প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা শুধু অস্ত্র উৎপাদনের বিষয় নয় বরং এর সাথে প্রকৌশল দক্ষতা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উপাদান উৎপাদন, ইলেকট্রনিক্স, শিল্প অবকাঠামো ও মানবসম্পদও যুক্ত। ইরানের সামরিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পেছনে এই শিল্প ও মানবসম্পদ কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এর সুফল সাধারণ অর্থনীতিতে কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

রাষ্ট্র টিকে থাকা আর জনগণের সমৃদ্ধি এক বিষয় নয়- ইরানের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বিনিয়োগ সঙ্কট ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে গভীর চাপ সৃষ্টি করলেও কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক ফল অর্জন করতে পারেনি। ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির মধ্যেও ইরানের পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক কৌশলগত সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

২০২৬ সালের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ইরানের স্থিতিস্থাপকতার পরীক্ষা আরও কঠিন করে তুলেছে। চলমান সঙ্ঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। ফলে ইরানকে দুর্বল করার প্রচেষ্টার প্রভাব শুধু দেশটির অর্থনীতিতে নয়; বৈশ্বিক তেলবাজার, এশীয় অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর। বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করলে চাপ বাড়ে; কিন্তু চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদাররা বিকল্প পথে সীমিত বাণিজ্য অব্যাহত রাখলে এর কার্যকারিতা কমে যায়। ইরানের ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ফলে বর্তমান বিশ্বে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশের অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তার অংশীদারদের আচরণের ওপরও নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই ইরানের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। কোনো একটি দেশ, বাজার, পণ্য বা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশের রফতানি এখনো তৈরী পোশাকনির্ভর এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রেও কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। তাই বৈশ্বিক বাণিজ্য সঙ্ঘাত, নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহ সঙ্কট বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার অভিঘাত মোকাবেলায় অর্থনীতিকে আরো বহুমুখী করতে হবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা মানে বিচ্ছিন্নতা নয় সুতরাং বাংলাদেশের জন্য ইরানের মডেল অনুসরণ করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সাথে সংযুক্ত থেকেই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, প্রযুক্তি, গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এমন অর্থনীতি তৈরি করতে হবে যা বৈশ্বিক সংযোগ থেকে সুবিধা নেবে, কিন্তু কোনো একক উৎসের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।

বাংলাদেশের জন্য প্রথম শিক্ষা হলো রফতানি বহুমুখীকরণ। তৈরী পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষি ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক্স, জাহাজ নির্মাণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্যের সেবা খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। দ্বিতীয় শিক্ষা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়; গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি।

তৃতীয় শিক্ষা জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। নিজস্ব গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ ও জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চতুর্থ শিক্ষা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতাÑ রফতানি, প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগের উৎস যত বহুমুখী হবে, বৈশ্বিক সঙ্কটের অভিঘাত তত কমবে।

পঞ্চম শিক্ষা কৌশলগত কূটনীতি। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক জরুরি। ইরানের মতো বাংলাদেশকেও ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ইরানের ইতিহাস নিষেধাজ্ঞার জয় বা পরাজয়ের সরল গল্প নয় বরং এটি চাপ ও অভিযোজন, অবরোধ ও উদ্ভাবন, সঙ্কট ও সক্ষমতা তৈরির দীর্ঘ ইতিহাস। ইরান নিষেধাজ্ঞাকে পুরোপুরি পরাজিত করেনি, আবার নিষেধাজ্ঞাও ইরানকে পরাজিত করতে পারেনি।

একবিংশ শতাব্দীর রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রকৃত ভিত্তি শুধু সামরিক ক্ষমতা নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, মানবসম্পদ, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার সমন্বয়ই একটি রাষ্ট্রকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার শক্তি দেয়। ইরানের অভিজ্ঞতা তাই শুধু ইরানের গল্প নয়; এটি পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতি, নিষেধাজ্ঞা-নির্ভর ভূরাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। হ

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews