ভিসা থাকার পরও কাতার যেতে পারছেন না দিনাজপুরের আকতারুল ইসলাম
আমার পাসপোর্ট আছে, কোম্পানির মালিকের পাঠানো ভিসা আছে। বিমানের টিকিটও আছে। সব নিয়ম মেনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বহির্গমন ছাড়পত্র পেতে অনলাইনে আবেদনও করেছি আট দিন আগে। আজ (মঙ্গলবার) রাতেই আমার বিমানের টিকিটের মেয়াদও শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে বহির্গমন ছাড়পত্র না পেলে তখন নতুন করে বিমানের টিকিট কাটতে হবে। তখন আমার নিজের পকেট থেকে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। যা আমার কাছে নেই। বাড়িতে আমার পরিবারে দু’টি সন্তান আছে। দুইজনই প্রতিবন্দ্বী। এখন যদি বিএমইটি স্মার্ট কার্ড না পাওয়ার কারণে আমার বিদেশ যাত্রা থমকে যায় তাহলে আমার এবং আমার পরিবারের কী অবস্থা হবে?
গতকাল মঙ্গলবার কাকরাইলের রাজমনি ঈশা খাঁ হোটেলের দ্বিতীয় তলায় থাকা মের্সাস ধানসিঁড়ি ইন্টারন্যাশনাল নামক প্রতিষ্ঠানে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কষ্টের কথা বলেন দিনাজপুর থেকে আগত বিদেশগামী আকতারুল ইসলাম। তিনি তার পাসপোর্ট ও কোম্পানির পাঠানো ভিসা এবং বিমানের টিকিট দেখিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি কাতারে দীর্ঘদিন ছিলাম। এরপর দেশে চলে আসি। দেশে অর্থ সঙ্কট দেখা দিলে আমি আবার কাতারে যেতে আমার কোম্পানির মালিকের সাথে যোগাযোগ করি। বিশেষ করে পরিবারে থাকা দু’টি প্রতিবন্দ্বী সন্তানের বিষয়টি মালিককে জানালে মালিক আমার নামে ভিসা এবং বিমানের টিকিট পাঠায়। ওই ভিসা এবং বিমান টিকিট নিয়ে আমি ঢাকায় চলে আসি। ঈদের পরপরই সরকারি অফিস খুললে ধানসিঁড়ি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে অনলাইনে ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র পেতে আবেদন করা হয়। একদিন, দুই দিন করতে করতে আট দিন চলে যায়। কিন্তু আজো (মঙ্গলবার) বিএমইটির স্যাররা ক্লিয়ারেন্স না দিয়ে আমার ফাইল আটকে রাখেন। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কিছু খাইনি। আকতারুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, এখন ভিসা, বিমান টিকিট থাকার পরও বিদেশে না যেতে পারলে আমার কি হবে? ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স না হওয়ার আগেই কেনো বিমানের টিকিট কাটলেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে আকতারুল ইসলাম বলেন, টিকিট তো আর আমি কিনি নাই। টিকিট আমার কাতারের কোম্পানির মালিকই ভিসার সাথে পাঠিয়েছে।
শুধু কাতারগামী আকতারুল ইসলাম নন, তার মতো শত শত বিদেশগামীর বহির্গমন ছাড়পত্র পেতে এই মুহূর্তে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক এবং তাদের প্রতিনিধিরা অনলাইনে আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে বেশির ভাগ বিদেশগামী কর্মীর আবেদন বিএমইটির পরিচালকের দফতরে চাপা পড়ে থাকছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন। কেনো চাপা পড়ছে এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাচ্ছেন না বিদেশগামী ও সংশ্লিষ্ট এজেন্সি মালিকরা।
এই প্রসঙ্গে কাতারের ভিসা প্রসেসিংকারী প্রতিষ্ঠান ধানসিঁড়ি ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো: মাহবুবুর রহমান গতকাল সন্ধ্যার আগে এ প্রতিবেদককে বলেন, কাতারগামী যাত্রীর বহির্গমন ছাড়পত্র কী কারণে হচ্ছে না সে ব্যাপারে বিএমইটির ডিজি, এডিজি এবং পরিচালক স্যারদের রুমে দেখা ও কথা বলতে গেলেও তারা কেউই যাত্রীর সাথে কথা বলছেন না। এমনকি যাত্রীকে তাদের রুমে প্রবেশ করাারও অনুমতি তারা দিচ্ছেন না। তাহলে আমরা কিভাবে ব্যবসা করব ?
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা একটা কাতারের ভিসা প্রসেসিং করতে সার্ভিস চার্জ পাই সর্বোচ্চ ২০০-৩০০ টাকা। কিন্তু এই যাত্রী বিদেশ যদি আজ যেতে না পারেন তাহলে তার অনেক ক্ষতি হবে। টিকিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তখন এই টিকিটই আবার কিনতে তার টাকা লাগবে। এছাড়া গ্রাম থেকে তিনি ঢাকায় এসেছেন। থাকা খাওয়া গাড়ি ভাড়া আছে। এরপর আট দিন ধরে ঘুরছেন। এসব শুধু শুধু হয়রানি করা হচ্ছে। এ সময় পাশে বসা একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএমইটির স্মার্ট কার্ড না পাওয়ার কারণে জনশক্তি ব্যবসা কিন্তু এখন অনেকটা ধ্বংসের পথে রয়েছে! আজ থেকে বিএমইটি কর্তৃপক্ষ ইউরোপের ভিসায় ছাড়পত্র দেয়ার আগে চাহিদাপত্র সাথে দিতে বলছেন। এখন ইউরোপের দেশগুলো থেকে যারা ভিসা সংগ্রহ করে পাঠান তারা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে পাঠান। তারা কোত্থেকে চাহিদাপত্র দেবে বলে প্রশ্ন করেন? এমনিতেই তো মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের শ্রমবাজার বন্ধ। মালয়েশিয়ার অনেক দিন ধরে বন্ধ। রাশিয়ার বাজারে কিছু লোক যাচ্ছিল। ৩০ কর্মীর সমস্যার কারণে দুই দিন আগে বিএমইটি কর্তৃপক্ষ স্মার্ট কার্ড ইস্যু বন্ধ করে দিয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, আগে প্রতিদিন চার হাজার বিদেশগামী কর্মীর নামে বিএমইটির বহির্গমন শাখায় বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়া হতো। এখন সেটি কমতে কমতে হাজারের নীচে নেমে এসেছে। তাহলে আমরা কিভাবে ব্যবসা করব। এমন শত শত কর্মী যখন ভিসা, বিমান টিকিট থাকার পরও বৈধভাবে বিদেশ যেতে বাধাগ্রস্ত হন তখন তারা উপায় না পেয়ে এয়ারপোর্ট বডি কন্ট্রাক্ট করে চলে যান। কারণ বিকল্প পথে না গেলে তখন ওই যাত্রীর ভিসা টিকিটের টাকা পুরোটাই হুমকির মুখে থাকে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক (বহির্গমন) উপসচিব মো: তাজিম উর রহমান এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোন রিসিভ করেননি। অভিযোগ রয়েছে, শুধু কাতার নয়, লাউস, ইউরোপের দেশ ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, সার্বিয়া ছাড়াও পাশের দেশ রোমানিয়াগামীদের ক্লিয়ারেন্স দিতে বিএমইটির কর্মকর্তারা এজেন্সির মালিকদের নানাভাবে হয়রানি করছেন। এজেন্সির মালিকরা বলছেন, যেভাবে দিন দিন জনশক্তি রফতানি তলানির দিকে যাচ্ছে তাতে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসা এক সময় মারাত্মক হুমকিতে পড়বে এটি নিশ্চিত। তাই এখনই সরকারকে এসব ব্যাপারে বাস্তত সম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে সচেতন মহল মনে করছেন। সূত্র জানিয়েছে, এসব কর্মীর বিষয়ে ওই দেশের দূতাবাসের সত্যায়ন না থাকার কারণ দেখিয়ে ফাইল আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তবে কিছু এজেন্সির সাথে কর্মকর্তাদের আঁতাত থাকায় তাদের ফাইল অনলাইনেই মধ্যরাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী এজেন্সির মালিকদের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে।