স্কুল বা মাদ্রাসার ছাত্ররা যখন শিক্ষাজীবনের প্রথম পরীক্ষা শেষ করে, তখন তারা নেহাত কোমলমতি শিশু। অনেক কিছুই তারা জানে না। বোঝেও না। পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর তারা ফলাফলের জন্য থাকে উদ্গ্রীব। কলেজ-মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার রঙিন স্বপ্নে বুঁদ থাকে। ওই সময়ে তাদের হাতে যদি পরীক্ষার ফলাফলের ত্রুটিপূর্ণ মার্কশিট হাতে আসে, তখন তাদের খুশির ভাবটা নিমেষে উবে যায়। তারা চোখে অন্ধকার দেখে। কী করবে বুঝতে পারে না। পরামর্শের জন্য শুরু হয় এদিকসেদিক দৌড়াদৌড়ি। এতে অনেকের নতুন শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার সময়ও চলে যায়। অথচ এর দায় শিক্ষার্থীর নয়। শিক্ষার্থী সবকিছু ঠিকই লিখেছে। ভুল করেছে হয়তোবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নয়তো স্কুল বা মাদ্রাসা বোর্ড। এই ভুলের দায় কার? অবশ্যই শিক্ষার্থীর নয়। শিক্ষার্থী যদি ভুলও করে থাকে, তা ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব তার প্রতিষ্ঠানের। শিক্ষাজীবনের প্রথম সনদটি যদি ভুলে ভরা থাকে, তখন শিক্ষার্থীর মনের অবস্থা কেমন হয়, তা সহজেই অনুমেয়। অন্যের ভুলের দায় এসে পড়ে তাদের কাঁধে। এর মাশুল দিতে গিয়ে অনেক নিরপরাধ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনেও ইতি ঘটে।
জেএসসি, এসএসসি, জুনিয়র দাখিল বা দাখিল পরীক্ষার কারও প্রবেশপত্র, কারও নম্বরপত্র, কারও সার্টিফিকেটে ভুল থাকে। তারা জানে না, কোথায় যাবে। নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও অনেক সময় সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তখন সাহায্য নিতে হয় যারা এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞ তাদের। এতেও রয়েছে ভোগান্তি। আছে যাতায়াত খরচ। তারপর থানায় গিয়ে জিডি করতে হয়। থানার নাম শুনলে অনেকে আঁতকে ওঠে। জিডি করতে সরকারিভাবে কোনো টাকা না লাগলেও অনেকে না জেনে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা দিয়ে দেয়। তারপর জাতীয় পত্রিকায় দিতে হয় সংশোধনীর বিজ্ঞাপন। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন হিসেবে সংশোধনীটি ছাপাতে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকাও লেগে যায়। অতঃপর অনলাইনে আবেদন করতে হয়। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হয়। এতে অনেকের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকাও খরচ হয়ে যায়।
ভুলের জন্য শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের কোনো অপরাধ নেই। কিন্তু দায়টা এসে পড়ে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের ওপর। এটি বছরের পর বছর চলে আসছে। অপরাধী থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। নির্দোষ ব্যক্তি ভোগ করছে অপরিমেয় শাস্তি। এর প্রতিকারের সময় এখনই। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায়। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন যুগোপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে বদ্ধপরিকর। তিনি জনবান্ধব মানুষ। ছাত্রনেতা থেকে এখন জননেতা। এহছানুল হক মিলনের নামটি এলেই সঙ্গে সঙ্গে যোগ হয়ে যায় ‘সফল’ অভিধাটি।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল সংসদে দুবারের ভিপি, জাতীয় সংসদের তিনবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে এই শিক্ষার্থী-ভোগান্তির ব্যাপারটি তাঁর অগোচরে থাকার কথা নয়। অবশ্যই ব্যাপারটি তিনি জানেন। হয়তোবা প্রতিকারের সুযোগ পাননি। না হয় ব্যাপারটি তাঁর মাথায় আসেনি। তাই এর প্রতিকারের সময় এখনই। যারা এজন্য দায়ী তাদের চিহ্নিত করতে হবে। আনতে হবে শাস্তির আওতায়। তাদের শাস্তি নিশ্চিত হলে ভুলের পরিমাণ কমে যাবে। সহজ করতে হবে সংশোধনীর ব্যাপারটি। থানায় জিডি বা পত্রিকায় সংশোধনী কেন ছাপা হবে? ভুল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে গেলে তারাই নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি ত্রুটিপূর্ণ বা ভুল হওয়া কাগজপত্র এক সপ্তাহে ঠিক করে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা করে দেয়, আর যিনি ভুল করেছেন, জরিমানার আওতায় তাকে আনা হয়, ব্যাংকে যে টাকাটি ভুক্তভোগীকে দিতে হয়, ওই টাকা যিনি ভুল করেছেন তার থেকে আদায় করা হয়, তাহলেই ভুলের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একই ভুল করলে তাদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিলে ভুল হবে না, এটা হলফ করে বলা যায়। আর অযথা হয়রানির শিকার হবে না কোনো শিক্ষার্থী। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে। ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ভুলের কথা শিক্ষার্থীমাত্রই জানে।
পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালে দেখতে পাওয়া যাবে সংশোধনীর ব্যাপারটি। ভুক্তভোগীরা জানেন, এ ঝামেলায় পড়লে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একজনের ভুলের দায় নিতে হয় আরেকজনকে। শিক্ষা বোর্ডের ভুলের দায় কেন শিক্ষার্থী নেবে? শিক্ষা বোর্ডের ভুলের দায় তাদেরই নিতে হবে। দিতে হবে সঠিক সমাধান। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীকে এরকম ভোগান্তি পোহাতে না হয়। সমাধানের এখনই সময়। শিক্ষামন্ত্রী গণমানুষের নেতা। সফল শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন এই জনগুরুত্বপূর্ণ দিকটির প্রতিকারে এগিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি দূর করতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।
লেখক : সাংবাদিক, বাংলাদেশ প্রতিদিন