২০২৭ সালে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে চীন। এর আগেই ব্রিকস জোটকে ঘিরে ৫ দফা নতুন কর্মপরিকল্পনার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বাণিজ্য সহজীকরণ, ওপেন-সোর্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং সমন্বিত বাজার ব্যবস্থার মতো প্রস্তাব সংবলিত চীনের এই নতুন কৌশল নিয়ে ভারতের নীতি-নির্ধারণী মহলে তীব্র অস্বস্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই ৫ দফা প্রস্তাবের কথা ঘোষণা করেন। তিনি ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি "সমন্বিত ও উন্মুক্ত বাজার" গড়ে তোলা, পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) টেকসই রাখা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) পার্টনারশিপ এবং যৌথভাবে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) ভিত্তিক এআই প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তবে ভারতীয় কূটনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে তা ভারতের জন্য এক ধরনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে:
১. চীনা পণ্যের আধিপত্য ও বাজার দখলের ঝুঁকি: ব্রিকসকে কোনো সময়ই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে দেখা হয়নি। এখন চীন যদি শুল্ক ছাড় ও সমন্বিত বাজারের নামে দরকষাকষি শুরু করে, তবে ভারতীয় বাজারে চীনা পণ্যের বন্যা বয়ে যেতে পারে। অতীতে এই একই আশঙ্কায় ভারত 'আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব' (RCEP) চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছিল।
২. প্রযুক্তি ও এআই নিরাপত্তা: শি জিনপিং ব্রিকসের জন্য একটি ওপেন-সোর্স এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরির কথা বলেছেন। যেখানে ভারত দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষার স্বার্থে বেশ কিছু চীনা অ্যাপ ও প্রযুক্তির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে, সেখানে চীনের তৈরি এআই মডেলে যুক্ত হওয়া ভারতের প্রযুক্তি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৩. পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে একচ্ছত্র প্রভাব: প্রযুক্তি ও বিরল খনিজ উপাদানের (Rare-earth minerals) ক্ষেত্রে চীন এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনের মঞ্চে প্রযুক্তি ও খনিজ সম্পদের "অস্ত্রায়ন" (Weaponisation) না করার ওপর জোর দিলেও, চীন মূলত শিল্প খাতগুলোতে নিজের প্রভাব ধরে রাখার পক্ষেই বার্তা দিয়েছে।
৪. এসইজেড এবং অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ: চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) নিয়ে ভারতের বহুদিনের আপত্তি রয়েছে। এবার ব্রিকসের মাধ্যমে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) নেটওয়ার্ক তৈরির যে প্রস্তাব চীন এনেছে, তাকে বিআরআই-এরই নতুন সংস্করণ বলে মনে করছেন ভারতীয় নীতি-নির্ধারকরা।
ভারতের কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৭ সালে ব্রিকসের নেতৃত্ব চীনের হাতে যাওয়ার আগেই জিনপিং যেভাবে জোটের নীতিগত দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন, তা স্পষ্টতই গ্লোবাল সাউথে বেইজিংয়ের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের কৌশল। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রেখে এই যৌথ প্রস্তাবগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন নয়াদিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।