অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে মাথায় রেখেই বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ সব দেশের সাথে সমভাবে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর এই সব কিছুর মূল চালিকাশক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রথমে রেখেই বর্তমান সরকার বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে। এখন বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে করা চুক্তি, ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি সফল হবে।
গতকাল রোববার নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির এ কথা বলেন। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি ঘোষণা করেছে।
সরকার ‘বাংলাদেশ প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কতটা সফল হতে পরেছে- জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারের অল্প কয়েক মাসের কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যথেষ্ট শক্তিশালী। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরটি খুবই উল্লেখযোগ্য ছিল। মালয়েশিয়া দিয়ে সরকার প্রধানের বিদেশ সফর শুরু করাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর বিএনপি সরকার গঠনের পরই ভারতীয়দের জন্য বাংলাদেশের ভিসা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। এখন ভারতও বাংলাদেশীদের পর্যটন ভিসা আবারো দেয়া শুরু করেছে। এর আগে উভয় পক্ষই ভিসার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছিল। এ ছাড়া আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের স্পিকার আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সেদিক থেকে বলা যায়, আমরা সব দেশের সাথে সমভাবে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ চেষ্টা কতটা সফল হবে তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। এজন্য আরো কিছু সময় লাগবে।
অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে মাথায় রেখেই বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল কেন্দ্রে ছিল আমাদের অর্থনীতি পুনর্গঠন, পুনরুজ্জীবিতকরন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। চীনের সাথে মোংলা সমুদ্র বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের চুক্তি সই হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন সামর্থ্য অনুযায়ী সমর্থন ও সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই সব কিছুর মূল চালিকাশক্তি অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রথমে রেখেই আমরা বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছি। এখন বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে করা চুক্তি বা প্রতিশ্রুতিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি সফল হবে।
চীনের সহযোগিতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিরাপত্তাগত দিক থেকে ভারতের আপত্তি রয়েছে। তবে চীন সফরের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে স্পষ্ট করে বলেছেন, বর্তমান সরকারের জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা অন্যতম এবং যেকোনো মূল্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে ভারতের মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতীয় মনোভাবের কথা আগেই বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। এই বিষয়ে যা কিছু অগ্রগতি, তা সার্বিকভাবে বিবেচনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর যেকোনো ধরনের ঘটনাপ্রবাহ ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং ঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের এসব বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি কি না জানতে চাওয়া হলে হুমায়ুন কবির বলেন, আমি এটাকে হুমকি মনে করছি না। ইস্যুগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা যথা সময়ে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবতা যাচাইয়ের ব্যাপারে চীন একটা ঘোষণা দিয়েছে। সম্ভাবতা যাচাই মানে প্রকল্পের কাজ শুরু করা না। তাই এই পর্যায়ে দেয়া ভারতের প্রতিক্রিয়াকে আমি মডারেট বা মাঝারি হিসেবে বিবেচনা করছি।
তুরষ্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত মাসে ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এই সফরের সময় বাংলাদেশ ও তুরষ্ক দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ২+২ বৈঠকের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিইআই প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা প্রয়োজনের নিরিখেই তুরষ্কের সাথে সম্পর্ক জোরদার করাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান হলো ডিফেনসিভ বা আত্মরক্ষামূলক। বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রকে আক্রমন করবে না। কিন্তু বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে নিজেদের সামর্থ্য নিয়ে যাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, সেই সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের একটা প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল, যেটা তার আগের ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তলানিতে ছিল। বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে কি অবস্থান নিয়েছে- জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ককে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন বিএনপি সরকার সিদ্ধান্ত নেবে পাকিস্তানের সাথে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক কিভাবে গড়ে তোলা যায়। এজন্য নতুন সরকার হয়ত কিছুটা সময় নিচ্ছে এবং দৃশ্যমান ফলাফল পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।