একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা কেবল কাগুজে পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে না, এটি মূলত নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা এবং তাদের কর্মতৎপরতার ওপর।

কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারক যখন তার ওপর অর্পিত মৌলিক দায়িত্ব বা ‘কোর ফোকাস’ থেকে বিচ্যুত হয়ে গৌণ ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে মনোনিবেশ করেন, তখন সামগ্রিক অর্জন শুধু বাধাগ্রস্তই হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদী জনদুর্ভোগ ও কাঠামোগত বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্যচ্যুতি বা ‘ফোকাস শিফট’ একটি বড় ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিল তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান এবং সেই অনুযায়ী কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নীতিনির্ধারকরা তাদের মূল দায়িত্ব পালনের চেয়ে বাহ্যিক জৌলুস বা এমন সব প্রকল্পে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েন, যা তাদের কর্মপরিধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। যখন একজন চালক সামনের রাস্তার দিকে না তাকিয়ে পাশের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালান, তখন দুর্ঘটনা যেমন অনিবার্য, তেমনি নীতিনির্ধারকদের এই মনোযোগের বিচ্যুতি পুরো ব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় নিয়ে যায়।

আমাদের চারপাশেই এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে নীতিনির্ধারকরা তাদের প্রকৃত কাজ ভুলে ভিন্ন স্রোতে গা ভাসিয়েছেন।

ধরা যাক, এমন একজন উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারক যার প্রধান দায়িত্ব হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা, দেশের নদ-নদী রক্ষা এবং বনায়ন নিশ্চিত করা। দেশের সুন্দরবন বা উপকূলীয় অঞ্চল যখন লবণাক্ততা ও প্লাবনের ঝুঁকিতে ধুঁকছে, তখন সেই নীতিনির্ধারক যদি তার দপ্তরের মূল কাজ ফেলে রেখে কোনো বিদেশি ভেন্ডরের সাথে ‘উড়োজাহাজ কেনা’ বা উচ্চাভিলাষী ড্রোন প্রযুক্তি আমদানির চুক্তি নিয়ে দিনরাত বৈঠক করেন, তবে সেটি হবে চরম লক্ষ্যচ্যুতি।

অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা যার মূল কাজ, তার ডেস্কে থাকার কথা ছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা কার্বন নিঃসরণ কমানোর ফাইল; কিন্তু সেখানে যদি উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বা এভিয়েশন ডিলের ফাইল স্তূপ হয়ে থাকে, তবে বুঝতে হবে অগ্রাধিকারের তালিকা সম্পূর্ণ উল্টে গেছে।

একইভাবে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন যাদের দায়িত্ব, তারা যদি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি বা কারিকুলাম আধুনিকায়নের চেয়ে নতুন নতুন বিশাল ভবন নির্মাণ, দামী গাড়ি কেনা বা আসবাবপত্র সরবরাহের ঠিকাদারিতে বেশি সময় ব্যয় করেন, তবে সেখানে অবকাঠামো বাড়বে ঠিকই, কিন্তু মেধার বিকাশ ঘটবে না। গত কয়েক দশকে আমরা বাস্তবে দেখেছি, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরির আধুনিকায়ন বা গবেষণার চেয়ে তোরণ নির্মাণ বা ডরমেটরির রঙের প্রলেপ দেওয়া নিয়ে নীতিনির্ধারকরা বেশি ব্যস্ত। ফলাফলস্বরূপ, বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে আমাদের উচ্চশিক্ষার অবস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকছে।

অনুরূপভাবে আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদের মূল কাজ হওয়া উচিত ছিল সাধারণ মানুষের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা। সেটা না হয়ে অর্থাৎ আর্থিক খাতে যথাযথ টেকসই উদ্যোগের চেয়ে যখন বড় বড় খেলাপি ঋণের পুনর্গঠন কিংবা বিদ্যমান নিয়ম-নীতিকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা ভোগের লাইসেন্স দেওয়ার পেছনে বেশি শ্রম দেওয়া হয়, তখনই সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধস নামা শুরু হয়। এভাবে বারবার যখন পলিসি মেকিং বা নীতি প্রণয়ন বাদ দিয়ে ব্যক্তি বিশেষের ‘সার্ভিসিং’ প্রধান হয়ে ওঠে, তখন চলমান ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা চিরতরে নষ্ট হয়।

নীতিনির্ধারকদের এই পথভ্রষ্ট হওয়ার পেছনে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণও বিদ্যমান।

প্রথমত, দৃশ্যমান উন্নয়নের মোহ এখানে কাজ করে। নীতি প্রণয়ন বা মেধাভিত্তিক পরিবর্তনের ফলাফল দীর্ঘমেয়াদী এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। পক্ষান্তরে, কোনো বড় কেনাকাটা বা নির্মাণ কাজ দ্রুত দৃশ্যমান হয় এবং এতে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া সহজ হয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার অপচর্চা। মূল কাজের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বড় প্রকল্পে বিশাল বাজেট থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের আর্থিক লালসা ও ক্ষমতার দাপট দেখানোর সুযোগ করে দেয়।

তৃতীয়ত, জবাবদিহিতার চরম অভাব। যখন কোনো কর্মকর্তার পারফরম্যান্স তার মূল লক্ষ্য বা কেপিআই দিয়ে বিচার না করে রাজনৈতিক আনুগত্য বা লবিং দিয়ে বিচার করা হয়, তখন তিনি তার প্রকৃত কাজ করার অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেন।

এভাবে যখন নীতিনির্ধারকরা তাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্র থেকে সরে আসেন, তখন সমাজ ও রাষ্ট্র তিনটি বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

প্রথমত, সম্পদের চরম অপচয় ঘটে। জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো অর্থের অভাবে ঝুলে থাকে, অথচ অপ্রাসঙ্গিক খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। এতে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় না।

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ঘটে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন লক্ষ্যচ্যুত হন, তখন নিচের স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। সিস্টেমের ভেতরে এক ধরণের অরাজকতার সিস্টেম তৈরি হয় এবং সেবার মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার হরণ করা হয়। পরিবেশ, খাদ‍্য নিরাপত্তা, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল জায়গায় একবার লক্ষ্য বিচ্যুত হলে সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক প্রজন্ম সময় লেগে যায়।

আজকের নীতিনির্ধারকের একটি ভুল বা অবহেলা আগামি দিনের নাগরিকদের জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে জনগণের ঘাম ঝরানো টাকা এবং দেশের ভবিষ্যৎ।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

১।কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
নীতিনির্ধারকদের মূল্যায়ন হতে হবে তাদের অর্পিত মূল দায়িত্বের সফলতার ওপর ভিত্তি করে। একজন পরিবেশ সচিবকে বিচার করতে হবে দেশের নদীর স্বাস্থ্যের ওপর ভিত্তি করে, তিনি কতগুলো উড়োজাহাজ বা ড্রোন কিনলেন তার ওপর নয়।

২। বিশেষায়িত নেতৃত্ব তৈরি করা
যে খাতের নীতিনির্ধারণ হবে, সেখানে সেই খাতের বিশেষজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের স্থান দিতে হবে। অযোগ্য বা অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসালে লক্ষ্যচ্যুতি অবধারিত।

৩। স্বচ্ছ অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়ন
প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বা প্রতিষ্ঠানের একটি ‘কোর ফোকাস’ চার্ট থাকতে হবে, যা জনগণের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে। এর বাইরে কোনো বড় কাজ করতে হলে তার যৌক্তিকতা নিয়ে জনসম্মুখে ব্যাখ্যার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, নীতিনির্ধারণ কোনো শখের বিষয় নয়, এটি একটি পবিত্র আমানত। সামগ্রিক অর্জন ধরে রাখতে হলে নীতিনির্ধারকদের আবার তাদের ডেস্কে ফিরতে হবে—যেখানে তাদের মূল দায়িত্বগুলো দীর্ঘদিন ধরে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। অপ্রাসঙ্গিক বিলাসিতা, ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ বা স্বীকৃতির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়াই এখন একমাত্র পথ।

নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, ইতিহাস তাদের দালানকোঠা বা কেনাকাটার তালিকা মনে রাখবে না; ইতিহাস মনে রাখবে দেশ ও দশের টেকসই উন্নয়নে তারা কতটুকু নীতিগত পরিবর্তন আনতে পেরেছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে কি কি করে গেছেন এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তারা কতটা অবদান রেখেছেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews