বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে নানা মহলে আলোচনা-উদ্বেগ থাকলেও সরকার তা অযৌক্তিক বলেই মনে করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি কখনো একতরফা হয় না, বরং উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই ‘উইন-উইন’ কাঠামোতে তা গড়ে ওঠে। কাজেই এই চুক্তি নিয়ে অযথা উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন কিছু নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য বা চলমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তিকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে শ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত প্রক্রিয়া, শ্রমমান, ডাম্পিং অভিযোগ এবং বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্নের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা এই বাণিজ্য চুক্তির বেশকিছু ধারা নিয়ে বিতর্ক থাকায় চুক্তিটি বাতিল চেয়ে একজন সংসদ-সদস্য সম্প্রতি সংসদে বক্তব্য রাখেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টে চুক্তি বাতিল চেয়েও রিট করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যেই মঙ্গলবার সকালে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

বাণিজ্যমন্ত্রী বৈঠক শেষে স্পষ্ট জানিয়ে দেন-বর্তমান সরকার এই চুক্তির সূচনা করেনি, বরং এটি একটি চলমান রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার অংশ। রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত কোনো চুক্তি ব্যক্তিগত চুক্তির মতো নয়, যা ইচ্ছামতো বাতিল করা যায়। এটি একটি ধারাবাহিকতা এবং আমরা সেটিকে দেশের স্বার্থে কাজে লাগাতে চাই। সরকার চুক্তিকে শুধু একটি কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসাবে নয়, বরং অর্থনৈতিক সুযোগ হিসাবেও দেখছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

খন্দকার মুক্তাদির বলেন, এই সরকার দেশের মানুষের নির্বাচিত সরকার। দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করি আমরা। সব চুক্তির মতো এই চুক্তিতেও ‘সেলফ কেয়ারিং এলিমেন্ট’ আছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে যদি কোনো সময় মনে হয় যে এই চুক্তির কোনো একটি ধারা বা একাধিক ধারা বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে নয়, তা সংশোধনের সুযোগ এই চুক্তির মধ্যে আছে। সুতরাং এটি নিয়ে আপনাদের চিন্তিত না হওয়ার জন্য আমি অনুরোধ করব।

যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত ও বাংলাদেশের অবস্থান : সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শ্রমমান ইস্যুতে একটি তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হওয়াকে কেন্দ্র করে আলোচনার নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ব্যাখ্যা চেয়েছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, বিদ্যমান চুক্তির প্রেক্ষাপটে এ ধরনের তদন্ত না হলে আরও ইতিবাচক বার্তা যেত। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং ডাম্পিংয়ের অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের দেশে কোনো ক্ষেত্রেই ওভার ক্যাপাসিটি নেই। বরং আমরা অধিকাংশ পণ্য আমদানিনির্ভর। রপ্তানিমুখী খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই খাত কঠোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হয়। শ্রম আইন লঙ্ঘন বা শিশুশ্রমের কোনো সুযোগ নেই। তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র তার অন্যতম বৃহৎ বাজার। ফলে এই খাত নিয়ে যে কোনো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শ্রম ও পরিবেশ মান পূরণ করা সব খাতের জন্য সহজ নয়। সম্ভাব্য শুল্ক বা অশুল্ক বাধা নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে বাজার হারানোর ঝুঁকি থাকতে পারে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের সম্ভাবনা : বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও উঠে আসে। এতে দেশের রপ্তানি বাজারের সম্প্রসারণ, উচ্চমানের বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি ভালোভাবে পাঠ করতে হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, যে কোনো চুক্তি নিয়ে মুক্ত আলোচনা হওয়া উচিত। মার্কিন চুক্তি নিয়ে আলোচনা হওয়া খুব ভালো। আমরা একা এই চুক্তি করিনি, বিশ্বের অন্যান্য দেশও করেছে। ইন্দোনেশিয়া এরকম ২৩১টি শর্তে রাজি হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের চুক্তিটি যখন পাঠ করবেন তখন ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ অন্য যারা চুক্তি করেছে তাদেরটা পাশে নিয়ে পাঠ করলে জিনিসটা ভালো বুঝা যাবে। মঙ্গলবার দুপুরে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা তুলনা করে দেখেন আমরা কী পেয়েছি, কী পাইনি। এই আলোচনাটা ওভাবে হওয়া উচিত।

কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সব দেশকে বলেছে যে তোমাদের রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ যেমন আমাদের ৩৯ বা ৩৭ শতাংশ দিয়েছিল, অন্য সব দেশ দিয়েছে, নেগোশিয়েট করেছে, কেউ ২০ পেয়েছে। আর আমরা ১৯ পেয়েছি। সবার এই এগ্রিমেন্টগুলো পাবলিক স্পেসে এখন পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, আপনারা বাংলাদেশের এগ্রিমেন্ট ও অন্যান্য দেশের এগ্রিমেন্ট তুলনা করে পড়েন। তাহলে বুঝবেন যে আমরা কী রেট পেয়েছি। পলিসিতে আমরা কী কী বিষয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছি। অন্যরাও কী চুক্তি করেছে। অন্যদের পারচেস কমিটমেন্ট কত? আমাদের কত, সব মিলিয়ে দেখেন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে কি না এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, সেখানে এখনও সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তারা কী ভাবছেন কী করবেন সেটা তারা যদি না জানান তাদের মাইন্ড রিড করার কাজ আমার না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদলে পুশইনের ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews