ভালোবাসার শুরুর দিনগুলোতে নিজের প্রতি যত্নটা যেন একা একাই বেড়ে যায়। দেখা করার আগে কী পোশাক পরবেন, চুল কেমন থাকবে, শরীরটা একটু ফিট রাখা দরকার কি না-এসব নিয়ে কত না ভাবনা থাকে! জিমে যাওয়ার উৎসাহও তখন থাকে আকাশচুম্বী।
কিন্তু সম্পর্ক যখন ধীরে ধীরে গভীর ও পুরোনো হয়, তখন সেখানে মূল জায়গা করে নেয় জীবনের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
সকালের অফিস, দীর্ঘ যাতায়াত, বাজার করা, রান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তান সামলানো আর মাসের বিল-সব মিলিয়ে দিনের শেষে দুজনেরই মনে হয়, আজ আর কিছু করার শক্তি নেই! ফলে যে মানুষটি একসময় নিজের চেহারা ও ফিটনেস নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন, তিনিও ধীরে ধীরে নিজের যত্ন নেওয়াকে তালিকার একেবারে শেষের দিকে ঠেলে দেন। এখানেই তৈরি হয় একটি অদৃশ্য সমস্যা।
নিরাপদ সম্পর্ক আর অলসতা এক নয়
দীর্ঘ সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো-সঙ্গীর সামনে নিজেকে প্রমাণ করার বাড়তি চাপ থাকে না। আপনি অসুস্থ হলে সে পাশে থাকে, ক্লান্ত হলে বোঝে, এমনকি এলোমেলো চুলে দেখলেও ভালোবেসে পাশে টেনে নেয়।
কিন্তু এই মানসিক নিরাপত্তাবোধ যেন নিজের প্রতি চরম অবহেলায় পরিণত না হয়। সে তো আমাকে এমনিই ভালোবাসে-এই চিন্তাটি নিঃসন্দেহে সুন্দর। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, নিজের শরীর, স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার যত্ন নেওয়ার আর প্রয়োজন নেই।
বরং সম্পর্কের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের যত্ন নেওয়ার কারণটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখন আপনার ফিট থাকার উদ্দেশ্য শুধু সঙ্গীর চোখে আকর্ষণীয় হওয়া নয়, দুজন মিলে একটি দীর্ঘ, রোগমুক্ত ও সুস্থ জীবন পার করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
সমাধান হতে পারে একসঙ্গে ওয়ার্কআউট
এই জায়গাতেই দম্পতিদের জন্য একটি দারুণ সমাধান হতে পারে-একসঙ্গে ব্যায়াম করা। একজন জিমে যাচ্ছেন আর অন্যজন সোফায় বসে টিভি দেখছেন-এমন দৃশ্যের বদলে দুজন মিলে একসঙ্গে হাঁটতে বের হতে পারেন, সাইক্লিং করতে পারেন কিংবা ঘরেই হালকা কিছু ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে পারেন। এতে কেবল শরীরচর্চাই হয় না, সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝে চমৎকার কিছু সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি হয়। আধুনিক দাম্পত্য জীবনে এটিই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
একই ছাদের নিচে থেকেও কেন দূরত্ব তৈরি হয়?
অনেক দম্পতি একই বাড়িতে থাকেন, কিন্তু একসঙ্গে কিছুটা মানসম্মত সময় বা 'কোয়ালিটি টাইম' কাটানোর সুযোগ পান খুব কম। একজন হয়তো অফিসের কাজে ব্যস্ত, অন্যজন ঘরের কাজে। কেউ মোবাইলের স্ক্রিনে মগ্ন, তো কেউ ল্যাপটপে। রাতে দুজন পাশাপাশি বসে থাকলেও তাদের কথোপকথন সীমাবদ্ধ থাকে কেবলই হিসাব-নিকাশে:
কাল বাজার থেকে কী আনব?
বিদ্যুৎ বিলটা দিয়েছ?
বাচ্চার স্কুলে কাল যেতে হবে।
অর্থাৎ, সম্পর্কের মিষ্টি ভালোবাসার রোমান্টিক আলাপগুলো ধীরে ধীরে গৃহস্থালি সামলানোর প্রাতিষ্ঠানিক মিটিংয়ে পরিণত হয়!
একসঙ্গে হাঁটা বা ব্যায়াম করার অভ্যাস এই একঘেয়ে চক্রটি ভেঙে দিতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার সময় অফিসের জটিল আলোচনা বাদ দিয়ে সারাদিনের গল্প করা যায়, পুরোনো সুন্দর স্মৃতিগুলো রোমন্থন করা যায়, হাসাহাসি করা যায়-কিংবা কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই শুধু পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া যায়।
ব্যায়াম যখন যৌথ সম্পর্কের অক্সিজেন
দম্পতিরা যখন নিয়মিত একসঙ্গে ব্যায়াম করেন, তখন শরীরচর্চার পাশাপাশি প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট সময় নিজেদের জন্য বরাদ্দ হয়ে যায়।
ধরুন, আপনারা প্রতিদিন সন্ধ্যায় ৩০ মিনিট হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম কয়েকদিন হয়তো নিছক শারীরিক অভ্যাসের অংশ হিসেবেই হাঁটবেন। কিন্তু কিছুদিন পরই দেখা যাবে, হাঁটার সময় সারাদিনের নানা জমানো ঘটনা নিয়ে গল্প হচ্ছে, মনের ভেতরে জমে থাকা কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা হালকা মেজাজে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। কখনো দুজন মিলে হাসছেন, আবার কখনো ভবিষ্যতের কোনো সুন্দর পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। অর্থাৎ, শরীরচর্চার পাশাপাশি আপনার সম্পর্কটিও একটু একটু করে চর্চা বা 'এক্সারসাইজ' পাচ্ছে।
একে অপরের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুন
ব্যায়াম শুরু করার চেয়েও কঠিন কাজ হলো তা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া। প্রথম সপ্তাহে নতুন জুতা, নতুন পোশাক আর উপচে পড়া উৎসাহ থাকে। দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়ে। আর তৃতীয় সপ্তাহে গিয়ে মনে হয়-থাক, আগামী সোমবার থেকে আবার নতুন করে শুরু করব!
ঠিক এই অলসতার মুহূর্তটিতে আপনার সঙ্গী হতে পারেন সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। একজন যখন বলবেন, চল, আজ অন্তত ৩০ মিনিট হেঁটে আসি, অন্যজন অলসতা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াবেন। কোনোদিন একজনের মন খারাপ থাকলে অন্যজন তাকে উৎসাহিত করতে পারেন। আবার কোনোদিন সঙ্গী সত্যি খুব ক্লান্ত থাকলে তাকে বিশ্রাম নিতে দিয়ে পাশে থাকাটাও হতে পারে ভালোবাসার এক অনন্য প্রকাশ। এখানে উদ্দেশ্য কাউকে জোর করা নয়, বরং পাশে থাকা।
শরীরের পাশাপাশি মনের প্রশান্তি
ব্যায়ামের সুফল কেবল শরীরের ওজন কমানো বা ফিট থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম মানসিক চাপ কমাতে, মেজাজ ফুরফুরে রাখতে এবং দৈনন্দিন জীবনে কর্মক্ষমতা বাড়াতে দারুণ সাহায্য করে।
আর দুজন যখন একসঙ্গে এই সুন্দর অভ্যাসটি গড়ে তোলেন, তখন শরীরচর্চাটি একটি আনন্দের যৌথ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়:
অফিসে খুব খারাপ একটা দিন কেটেছে? দুজনে মিলে একটু হেঁটে আসুন।
সারাদিন ঘরের কাজে ক্লান্ত লাগছে? হালকা একটু হাঁটাহাঁটি করুন।
মন ভালো নেই? পার্কের সবুজ ছায়ায় গল্প করতে করতে হাঁটুন।
সব সমস্যার সমাধান হয়তো নিছক হাঁটাহাঁটিতে হবে না, তবে কঠিন সময়েও হাত ধরে পাশাপাশি থাকার যে অনুভূতি-তা সম্পর্কের টান বাড়াতে জাদুকরী ভূমিকা রাখে।
তুমি মোটা হয়ে গেছ নয়, বলুন চল দুজন ফিট হই
সঙ্গীর শরীরের ওজন বা গঠন নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। তোমাকে আগের মতো সুন্দর দেখাচ্ছে না কিংবা তুমি অনেক মোটা হয়ে গেছ-এ জাতীয় কথা মানুষের আত্মবিশ্বাসে গভীর আঘাত হানে এবং সম্পর্কে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্বস্তি তৈরি করে।
তার পরিবর্তে সহজভাবে বলুন-চল, আমরা দুজন মিলে একটি হেলদি লাইফস্টাইল শুরু করি।
এই একটিমাত্র বাক্যের ইতিবাচক পরিবর্তন অনেক বড় ভূমিকা রাখে। প্রথম বাক্যে ছিল বিচার ও সমালোচনা, আর দ্বিতীয়টিতে আছে সমান অংশীদারিত্ব। দাম্পত্য জীবনে সঙ্গীকে শুধরে দেওয়ার চেষ্টার চেয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ানো অনেক বেশি কার্যকর।
ভালোবাসা শুধু 'ডিনার ডেট' নয়
ভালোবাসা মানেই সবসময় দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়া, ছুটির দিনে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া কিংবা বিশেষ কোনো দিনে দামি উপহার দেওয়া নয়।
কখনো কখনো ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে খুব সাধারণ কিছু অনুভূতির মাঝে:
সকালে ঘুম থেকে তুলে মিষ্টি হেসে বলা-চল, আজ সকালে একটু হেঁটে আসি।
ব্যায়াম শেষে সঙ্গীর দিকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দেওয়া।
কিংবা সঙ্গী খুব ক্লান্ত থাকলে মাথায় হাত রেখে বলা-আজ ব্যায়াম করতে হবে না, তুমি বিশ্রাম নাও।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করা-জীবন যতই ব্যস্ত বা কঠিন হোক না কেন, দিনশেষে আমরা দুজন এখনো একই দলে আছি!
প্রথম পর্বের মূল কথা:
সম্পর্ক যত পুরোনো হয়, নিজের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন কমে না-বরং আরও বাড়ে। আর একসঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম করা হতে পারে নিজের শরীর ও প্রিয় সম্পর্ক-দুটিরই যত্ন নেওয়ার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়।
(চলবে… দ্বিতীয় পর্বে থাকবে: দম্পতিরা কীভাবে নিজেদের উপযোগী একটি সহজ Couple Fitness Routine তৈরি করবেন, কোন কোন ব্যায়াম একসঙ্গে সহজে করা যায়, কীভাবে শরীরচর্চাকে উপভোগ্য রাখা যায় এবং কোন ভুলগুলো একদমই এড়িয়ে চলা উচিত।)