তেরো বছর আগে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি বাসে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়। সেই ঘটনার নির্মমতার স্মৃতি আবারও ফিরে এসেছে উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারে এক নারীর ওপর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনায়। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ঘটনাটি শুধু পাশবিক সহিংসতার নয়; বরং যৌন নির্যাতনের শিকার নারীরা, বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে, পুলিশ ও চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের যে উদাসীনতার মুখোমুখি হন, তারও এক করুণ উদাহরণ। ভারতের আইন অনুযায়ী যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। তাই বিবিসি তার নামের পরিবর্তে ‘সোমা’ (ছদ্মনাম) ব্যবহার করেছে।

চার সন্তানের ২৮ বছর বয়সী এই নারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, নিজ বাড়িতেই একদল ব্যক্তি তাকে আক্রমণ করে গণধর্ষণ করে। তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তার স্পর্শকাতর অঙ্গে বিভিন্ন বস্তু প্রবেশ করায়। গত ১১ই জুন রাতে বিহারের বেগুসরাই জেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাবে বেগুসরাই ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর একটি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার শরীর থেকে বস্তু অপসারণ করে। এর ফলেই ঘটনাটি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। সোমা একটি ব্যবহৃত গুলির খোসাও হাসপাতালে নিয়ে আসেন, যা তার দাবি অনুযায়ী হামলাকারীরা ব্যবহার করেছে।

নির্মম ওই হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে সোমা বলেন, রাতে নিজের এককক্ষের ঘরের বাইরে অবস্থিত শৌচাগারে ছিলেন তিনি। শৌচাগারটিতে দরজা নেই; গোপনীয়তার জন্য শুধু একটি পর্দা ঝোলানো ছিল। তিনি বলেন, তারা আমাকে বিবস্ত্র হতে বাধ্য করে, মুখ বেঁধে দেয় এবং হাত বেঁধে ফেলে। আমি প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে ব্লেড দিয়ে আমার বুক কেটে দেয় এবং ধর্ষণ করে।

তার স্বামী প্রথমে স্ত্রীর গোঙানির শব্দকে পথভোলা বিড়ালের শব্দ ভেবে গুরুত্ব দেননি। পরে সন্দেহ হলে ঘরের দিকে যান। সোমা বলেন, কিন্তু বাইরে থেকে ঘরে তালা দেয়া ছিল। তিনি এক প্রতিবেশীকে ডাকেন। প্রতিবেশী এসে তালা খুলে দিলে সবাই আমার অবস্থা দেখে কান্না শুরু করে। বেগুসরাইয়ের পুলিশ সুপার মনীশ বলেন, সোমার মেডিকেল রিপোর্ট যৌন নির্যাতনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, এই মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও দুইজন অজ্ঞাত আসামি রয়েছে। আমরা দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছি। মামলার তদন্তে গঠিত বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগেও অপরাধের অভিযোগ ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ সংক্রান্ত ধারায় মামলা করা হয়েছে।

সোমা অভিযোগ করেন, ঘটনার রাতে পুলিশ ও চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি খুব সামান্য সহায়তা পেয়েছেন। তার স্বামী পেশায় ই-রিকশাচালক। তিনি অচেতন অবস্থায় স্ত্রীকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের একটি থানায় নিয়ে যান। তার অভিযোগ, পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে বলে। পরে বেগুসরাই পুলিশ জানায়, দায়িত্বে অবহেলা, উদাসীনতা ও সংবেদনশীলতার অভাবের অভিযোগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজীব কুমারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। স্থানীয় থানায় ১৩ জুন এ ঘটনায় এফআইআর দায়ের করা হয়।

হামলার পরও যথাযথ চিকিৎসা পেতে সংগ্রাম করতে হয়েছে সোমাকে। ঘটনার রাতে কাছের একটি বেসরকারি ক্লিনিক তাকে ফিরিয়ে দেয়। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ জানায়, সেখানে জরুরি চিকিৎসা দেয়া হয় না এবং দায়িত্বে কোনো চিকিৎসকও ছিলেন না। পরে তাকে একটি সরকারি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। সোমা বলেন, হাসপাতালে প্রথমদিকে যে চিকিৎসা পেয়েছিলেন, তা মোটেও সন্তোষজনক ছিল না। ১২ জুন চেতনা ফেরার পর তিনি তার স্বামী ও চিকিৎসককে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের কথা জানান। তার ভাষায়, চিকিৎসক ইনজেকশন দেয়ার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেন- ‘তোমাকে কি ধর্ষণও করা হয়েছে?’ আমি বারবার বলছিলাম, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম, আমাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।’

তবে বেগুসরাইয়ের সিভিল সার্জন অশোক কুমার বলেন, নারীটিকে পেটব্যথার অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে আনা হয়। ১৩ জুন ধর্ষণের বিষয়টি জানার পর চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে তার মেডিকেল পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার পর সোমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু পরদিন তিনি আবার অচেতন হয়ে পড়লে হাসপাতালে ফিরতে হয়। একদিন পর আবারও তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। সোমার স্বামী বলেন, তিনি বারবার অচেতন হয়ে যাচ্ছিলেন এবং তীব্র পেটব্যথার অভিযোগ করছিলেন। গ্রামের এক ধাত্রী পরীক্ষা করে বলেন, তার শরীরের ভেতরে কিছু রয়েছে। ১৮ জুন সকালে সোমার যৌনাঙ্গ থেকে একটি গুলির খোসা বেরিয়ে আসে।

এরপর তাকে আবার হাসপাতালে নেয়া হয়। সিভিল সার্জন অশোক কুমার বলেন, ওটি ছিল একটি খালি কার্তুজের খোসা। আমরা পুনরায় পরীক্ষা করি এবং চিকিৎসকরা তার শরীর থেকে আরও কিছু বস্তু অপসারণ করেন। বর্তমানে তিনি স্থিতিশীল অবস্থায় আছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন।

সোমার ঘটনা ভারতে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং ২০১২ সালের দিল্লির ভয়াবহ সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সে সময় ২৩ বছর বয়সী এক ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীও যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শরীরে বস্তু প্রবেশ করিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। ওই ঘটনা বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। ভারতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। ধর্ষণবিরোধী আইন কঠোর করা হয়। গুরুতর ধর্ষণের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধানও যুক্ত করা হয়। দোষী সাব্যস্ত চার ব্যক্তিকে ২০২০ সালে ফাঁসি দেয়া হয়। একজন কারাগারে মারা যায় এবং কিশোর অপরাধী নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সংশোধনাগার থেকে মুক্তি পায়। তবে আইন কঠোর হওয়ার পরও ভারতে প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়।

ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের কর্মী যোগিতা ভায়ানা বলেন, আমরা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিনি। সমাজ চরম নৃশংসতার প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছে বলেই অধিকাংশ ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায় বা গুরুত্ব পায় না। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। কারণ ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ পর্যন্ত এই বার্তা পৌঁছায়নি যে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। সমাজে প্রয়োজনীয় ভীতি তৈরি করা যায়নি। ভায়ানা আরও বলেন, সোমার ঘটনা এতটা আলোচিত হয়েছে মূলত তার শরীরে গুলির খোসা প্রবেশ করানোর অভিযোগের কারণে। অন্তত তিনি বেঁচে আছেন, এটিকে আমি ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখি।
এদিকে বেগুসরাইয়ের হাসপাতালে শয্যাশায়ী সোমা এখনও সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সমাজকর্মীদের আনাগোনায় বারবার বিরক্ত হচ্ছেন। তিনি এখনও তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা অনুভব করছেন, তবে দ্রুত সুস্থ হয়ে সন্তানদের কাছে ফিরতে চান। তিনি বলেন, আমার সন্তানদের নিয়ে খুব চিন্তিত। তারা খুব ছোট। এখান থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের গ্রামে আত্মীয়দের কাছে রয়েছে। আমি যত দ্রুত সম্ভব তাদের কাছে ফিরতে চাই।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews