যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের ভাবমূর্তি এখন পুরোপুরি বিষাক্ত। মার্কিন ভোটারদের জনমত তো বটেই, এমনকি নির্বাচনী প্রচারণাতেও এখন ইসরাইলের নাম নেয়া সচেতনভাবে এড়িয়ে চলছেন রাজনীতিবিদরা। গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা, লেবাননে আগ্রাসন আর মার্কিন নীতিতে তাদের মাত্রাতিরিক্ত খবরদারি বন্ধের পক্ষে এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ। কিন্তু জনমতের এই প্রবল চাপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মার্কিন নীতিনির্ধারণী কাঠামোর গভীরে স্থায়ীভাবে গেঁথে যাওয়ার এক ভয়ঙ্কর গোপন কৌশল নিয়েছে তেল আবিব।
মিডলইস্ট আই জানিয়েছে, ইসরাইলি লবি এখন মার্কিন আইনসভাকে ব্যবহার করে এমন সব আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন সরকার চাইলেও ইসরাইলের স্বার্থের বাইরে যেতে না পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও লেখক মিচেল প্লিটনিক সম্প্রতি এক নিবন্ধে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। প্লিটনিক বর্তমানে ‘রিথিংকিং ফরেন পলিসি’র প্রেসিডেন্ট এবং সাবস্ট্যাকে ‘কাটিং থ্রু’ নামের একটি জনপ্রিয় নিউজলেটার ও ভিডিও চ্যানেল চালান। এর আগে তিনি ‘ফাউন্ডেশন ফর মিডলইস্ট পিস’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার সংস্থা ‘বি’সেলেম’-এর মার্কিন দফতরের পরিচালক এবং ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস’-এর সহ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মার্ক ল্যামন্ট হিলের সাথে যৌথভাবে লেখা ‘এক্সেপ্ট ফর প্যালেস্টাইন: দ্য লিমিটস অব প্রোগ্রেসিভ পলিটিক্স’ বইয়ের লেখক প্লিটনিক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরাইলের অবস্থান এখন স্থায়ীভাবে নড়বড়ে হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসরাইলপন্থী লবি ‘আইপ্যাক’ এখন ডেমোক্র্যাটদের কাছে এক আতঙ্কের নাম, এমনকি রিপাবলিকানদের অনেকেও একে সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে প্রথামাফিক লবিংয়ের চেয়ে আইনি মারপ্যাঁচে মার্কিন প্রশাসনকে বেঁধে ফেলার নতুন কৌশল নিয়েছে তারা। এর আগে মার্কিন আইন করা হয়েছিল যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাধ্য থাকবেন। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো জোটের চেয়ে ইসরাইল যেন সামরিক প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকে, তা নিশ্চিত করা মার্কিন আইনি দায়িত্ব।
এবার এই সহযোগিতাকে আরো গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা বাজেট সংক্রান্ত দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিল ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট’ এবং ‘ইন্টেলিজেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট’-এর ভেতরে গোপনে দুটি ধারা ঢোকানোর চেষ্টা চলছে। এই বিলগুলো পাস হওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা এগুলো বাতিল করতে পারবেন না।
প্রথম ধারাটির লক্ষ্য হলো, মার্কিন সরকারের প্রতিটি দফতরে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আইনিভাবে জড়িয়ে ফেলা। এর মাধ্যমে মার্কিন সামরিক কেনাকাটায় ইসরাইলি প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হবে। এটি করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের এমন এক অবিচ্ছেদ্য গাঁটছড়া তৈরি হবে যা ভাঙা অসম্ভব। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি ইরানের সাথে কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তি করতে চান, তবে এই আইনের কারণে তিনি ইসরাইলকে আলোচনার টেবিল থেকে বাদ দিতে পারবেন না।
দ্বিতীয় ধারাটির উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক গোয়েন্দা তথ্য সরাসরি ইসরাইল ও তার মিত্র আরব দেশগুলোর হাতে তুলে দেয়া। যেসব মুসলিম বা আরব দেশ ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ মেনে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে, তাদের পুরস্কার হিসেবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য দেয়া হবে। কোনো প্রেসিডেন্ট যদি এই তথ্য দেয়া বন্ধ করতে চান, তবে তাকে সুনির্দিষ্ট জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কংগ্রেসের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আরব দেশগুলোর ক্ষেত্রে মার্কিন শত্রুদের সাথে সম্পর্ক না রাখার শর্ত থাকলেও, ইসরাইলের জন্য এমন কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
ইসরাইলের এই নতুন কৌশলের তৃতীয় চালটি আরো সুদূরপ্রসারী। মার্কিন জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রতি বছর ইসরাইলকে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দেয়া হয়, তার বিরুদ্ধে এখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি জোরাল হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি টের পেয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন সহায়তা নেয়ার চেয়ে যৌথ অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছেন।
নতুন ফন্দি অনুযায়ী, মার্কিন সরকারি তহবিল সরাসরি ইসরাইলকে না দিয়ে আমেরিকার নিজস্ব বেসরকারি অস্ত্র ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে দেয়া হবে। কোম্পানিগুলো ইসরাইলের সাথে যৌথভাবে অস্ত্র তৈরি করবে। একে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কর্মসংস্থান তৈরির ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখোনো হবে, যাতে মার্কিন ব্যবসায়িক খাতের বড় বড় করপোরেশনগুলো এর পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। একবার এই করপোরেট চক্র সচল হলে, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের আর কোনো মূল্য থাকবে না।
জনগণের ইচ্ছাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, তাদেরই করের টাকায় ইসরাইলের যুদ্ধবাজ নীতি টিকিয়ে রাখার এই আইনি ফাঁদ যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত গণতন্ত্রের আসল রূপটিই উন্মোচন করে দেয়। দশকের পর দশক ধরে তৈরি হওয়া এই ধ্বংসাত্মক মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্ককে উপড়ে ফেলা এমনিতেই কঠিন ছিল, নতুন এই পদক্ষেপগুলো একে চিরস্থায়ী করার চক্রান্ত মাত্র।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই