সমালোচকদের নেতিবাচক রিভিউ আর নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ সত্ত্বেও ‘মাইকেল’ সিনেমা বক্স অফিসে রীতিমতো ঝড় তুলেছে। মাইকেল জ্যাকসনের বিশাল ভক্তগোষ্ঠীর সমর্থনে ছবিটি মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই রেকর্ড গড়েছে।
কমস্কোরের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৯৭ মিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাপী ২১৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে এই বায়োপিক।
মাইকেল জ্যাকসনের ভাগ্নে জাফার জ্যাকসন অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি বায়োপিক—সংগীতভিত্তিক হোক বা অন্য যেকোনো—সব ধরনের ছবির মধ্যে সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয় করার রেকর্ড গড়েছে। জ্যাকসন ফাইভ থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশকে তার সুপারস্টার হয়ে ওঠার যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। ফলে একদিকে যেমন দর্শকরা মুগ্ধ, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে একের পর এক বিতর্ক।
শিশু নির্যাতনের অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়া
ছবির সবচেয়ে বড় সমালোচনা—মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে ১৯৯৩ সাল থেকে ওঠা শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগের কোনো উল্লেখ নেই এতে। যদিও জ্যাকসন ও তার এস্টেট বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
প্রথমদিকে ছবিতে নেভারল্যান্ড র্যাঞ্চে তদন্তকারীদের অভিযান দেখানোর দৃশ্য ছিল বলে জানা যায়। তবে আইনি জটিলতার কারণে সেই অংশগুলো চূড়ান্ত সংস্করণ থেকে বাদ দেওয়া হয়। নির্মাতাদের দাবি, ছবিটি মূলত ৬০-এর দশক থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে, তাই পরবর্তী বিতর্ক এতে আসেনি। তাদের ভাষায়, এটি ‘মাইকেল’ হয়ে ওঠার গল্প—একটি ব্যক্তিগত প্রতিচ্ছবি।
নতুন মামলায় চার ভাইবোনের গুরুতর অভিযোগ
ছবির মুক্তির মাঝেই নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে কাসিও পরিবারের চার সদস্যের করা মামলা। তারা অভিযোগ করেছেন, শিশু অবস্থায় মাইকেল জ্যাকসন তাদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন।
এই চারজন—এডওয়ার্ড, ডমিনিক, মেরি-নিকোল ও অ্যালডো কাসিও—দাবি করেছেন, সাত-আট বছর বয়স থেকে শুরু করে এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন স্থানে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। তাদের ভাষ্য, ২০১৯ সালের ‘লিভিং নেভারল্যান্ড’ ডকুমেন্টারি দেখার পর তারা বুঝতে পারেন, তাদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা ভুল ছিল।
অন্যদিকে, জ্যাকসনের এস্টেট এই অভিযোগকে ‘অর্থ আদায়ের মরিয়া চেষ্টা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা জানায়, অতীতে পাঁচ বছর ধরে প্রত্যেককে ২.৮ মিলিয়ন ডলার করে দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল জ্যাকসনের পরিবার ও তার উত্তরাধিকারের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
জ্যানেট জ্যাকসনসহ কয়েকজন ভাইবোনের অনুপস্থিতি

ছবিতে জ্যাকসনের শৈশব ও পরিবার দেখানো হলেও তার অনেক ভাইবোনকেই দেখা যায়নি। বিশেষ করে সংগীত জগতের আরেক আইকন জ্যানেট জ্যাকসনের অনুপস্থিতি নজরে পড়েছে সবার।
জানা গেছে, জ্যানেটকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি এতে অংশ নিতে রাজি হননি। ফলে তাকে ছবিতে রাখা হয়নি। একইভাবে রেবি ও র্যান্ডি জ্যাকসনও অনুপস্থিত।
ডায়ানা রসের দৃশ্য কেটে ফেলা
ছবিতে কিংবদন্তি শিল্পী ডায়ানা রসের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ক্যাট গ্রাহাম। কিন্তু আইনি কারণে তার সব দৃশ্যই শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও বাস্তবে মাইকেল জ্যাকসন ও ডায়ানা রসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তারা একাধিক মঞ্চে একসঙ্গে পারফর্ম করেছেন।
মাইকেলের মেয়ের সমালোচনা

ছবিটির সমালোচকদের তালিকায় আছেন মাইকেল জ্যাকসনের মেয়ে প্যারিস জ্যাকসনও। তিনি দাবি করেছেন, ছবিতে অনেক ভুল তথ্য রয়েছে এবং এটি বাস্তবতাকে বিকৃত করে তুলে ধরেছে।
তার ভাষায়, “আমি বিক্রি বা অর্থের চেয়ে সত্যকে বেশি গুরুত্ব দিই।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাকে ছবির কাজে জড়িত বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
আসতে পারে সিক্যুয়েল
ছবির শেষে ‘His Story Continues’ বার্তাটি ভবিষ্যতে সিক্যুয়েলের ইঙ্গিত দেয়। নির্মাতারা সরাসরি ঘোষণা না দিলেও জানিয়েছেন, দর্শকের আগ্রহ থাকলে গল্পের পরবর্তী অংশ নিয়েও কাজ করা হতে পারে—যেখানে হয়তো বিতর্কিত অধ্যায়গুলোও উঠে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, ‘মাইকেল’ একদিকে যেমন বক্স অফিসে ইতিহাস গড়ছে, অন্যদিকে তেমনি জাগিয়ে তুলছে পুরোনো বিতর্ক ও নতুন প্রশ্ন—একজন কিংবদন্তির জীবনের কোন অংশ দেখানো হবে, আর কোনটা আড়ালেই থেকে যাবে?