ইউরোপের মানচিত্রে শিল্প, সাহিত্য আর বিপ্লবের অনন্য দেশ ফ্রান্স। আটলান্টিক মহাসাগর আর ভূমধ্যসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই দেশটি কেবল তার ভৌগোলিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্যও বিশ্বজুড়ে বরেণ্য। ল্যুভর মিউজিয়ামের মহিমা, আইফেল টাওয়ারের আভিজাত্য আর ফরাসি বিপ্লবের শ্লোগান “স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব” আজও আধুনিক সভ্যতার আলোকবর্তিকা। নিজস্ব অলঙ্কার ও ব্যাকরণে আভিজাত্য বহন করা ফরাসি ভাষার দেশে এবার আরও একটি ভাষা নাগরিক জীবনের দরজায় এসে দাঁড়াল, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা।
ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের পদচারণার ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। কয়েক দশক আগে যে যাত্রা ছিল ছোট ছোট স্বপ্নের সমষ্টি, সময়ের সঙ্গে সেটিই গড়ে তুলেছে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের এক বিস্তৃত কমিউনিটি, যার বড় অংশকে দেখা যায় প্যারিস কেন্দ্রিক এলাকায়। প্যারিসের উত্তর প্রান্তের সেন্ট ডেনিস, লা শাপেল, গার দ্যু নর ও আশপাশের এলাকায় আজ বাংলাদেশিদের কণ্ঠস্বর, শ্রম আর উদ্যোগ শহরের দৈনন্দিন অর্থনীতির সঙ্গে মিশে আছে। এই অঞ্চলকে ঘিরে দক্ষিণ এশীয় ডায়াসপোরার ঘন উপস্থিতির কথাও বিভিন্ন পর্যটন ও নগর পর্যবেক্ষণধর্মী লেখায় উঠে এসেছে।
আজকের ফ্রান্সে বাংলাদেশি অভিবাসীরা প্রমাণ করেছেন, তারা কেবল শ্রমিক পরিচয়ে আটকে থাকেন না; তারা উদ্যোক্তা হন, দোকান গড়েন, কর্মসংস্থান তৈরি করেন। বিশেষ করে খুচরা ব্যবসা বা ‘এপিসারি’ খাতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বিস্তার চোখে পড়ার মতো। কমিউনিটির হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ১০,০০০-এর বেশি বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। পাশাপাশি বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টগুলো ফরাসি গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয়, আর তথ্যপ্রযুক্তি ও চিকিৎসাসেবায় দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকেই মূলধারার পেশাজগতে স্থায়ী অবস্থান গড়ে তুলছেন।
এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি প্যারিস প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি স্মরণীয় দিন হয়ে উঠেছে। প্যারিস সিটি কর্পোরেশন, অর্থাৎ Mairie de Paris জানিয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, নোটিশ এবং নাগরিক সেবার আপডেট ফরাসির পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও পাওয়া যাবে। কমিউনিটির অনেকের কাছে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; এটি ইউরোপের মাটিতে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বাস্তব উপস্থিতির প্রতি এক ধরনের দাপ্তরিক স্বীকৃতি।
এ উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হলে অভিবাসী বাংলাদেশীদের জীবনের কয়েকটি কঠিন দেয়াল সহজে ভাঙবে। প্রথমত, তথ্যের সহজলভ্যতা বাড়বে। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর সংক্রান্ত নিয়মকানুন অনেক সময় ভাষাগত জটিলতায় আটকে যায়। বাংলা ভাষায় নির্দেশনা থাকলে বোঝাপড়া দ্রুত হবে, ভুল কমবে।
দ্বিতীয়ত, জরুরি সতর্কতা ও জননিরাপত্তা সংক্রান্ত বার্তা যদি বাংলায় পৌঁছায়, তবে সংকটকালে সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমে। আবহাওয়া সতর্কতা, পরিবহন বিঘ্ন বা জরুরি নির্দেশনার মতো বার্তা বিশেষ করে লা শাপেল ও গার দ্যু নরের মতো এলাকায় দ্রুত বোঝা গেলে ঝুঁকি কমে, প্রস্তুতি বাড়ে।
তৃতীয়ত, হেল্প ডেস্ক ও দোভাষী সাপোর্টের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। কাগজপত্র, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, আবেদনপদ্ধতি, এসব জায়গায় ভাষা অনেক সময় অদৃশ্য বাধা তৈরি করে। বাংলা সহায়তা থাকলে সেই বাধা দূর হবে।
চতুর্থত, ফ্রান্সের কল্যাণরাষ্ট্র কাঠামোতে সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনমানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সে স্থিতিশীল ও নিয়মিতভাবে বসবাসকারী বা কর্মরত ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় বহনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বড় ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে PUMa নীতির মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যয়ের কাভারেজের অধিকারকে সহজ করা হয়েছে। বাংলা ভাষায় সহায়তা পাওয়া গেলে আবেদন, কাগজপত্র ও প্রক্রিয়াগত বিভ্রান্তির যে অদৃশ্য দেয়ালটি এতদিন অনেককে থামিয়ে দিত, সেটি ভেঙে যাবে, আর সেবাগুলো মানুষের কাছে আরও দ্রুত ও মানবিকভাবে পৌঁছাবে।
পঞ্চমত, আবাসন ভাড়া ও সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে CAF সংশ্লিষ্ট ভাতা অনেক পরিবারের জন্য বড় সহায়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, আবাসন সহায়তা যেমন APL নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করলে ভাড়ার চাপ কমাতে সাহায্য করে। বৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীরাও প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করলে এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেন। বাংলা ভাষায় সহায়তা থাকলে আবেদনপত্র, প্রয়োজনীয় নথি ও শর্তাবলি বুঝতে যে ভাষাগত জটিলতা এতদিন অনেককে পিছিয়ে দিত, সেই বাধা দূর হবে, আর যোগ্য পরিবারগুলো তাদের প্রাপ্য সহায়তা সময়মতো ও নির্বিঘ্নে পেতে পারবে।
ষষ্ঠত, শিক্ষা। ফ্রান্সে শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় স্কুলশিক্ষা বিনামূল্যে বা প্রায় বিনামূল্যে, এবং নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে বিদ্যালয়শিক্ষা বাধ্যতামূলক। ফলে অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য শিশুদের শিক্ষায় আর্থিক চাপ তুলনামূলক কমে, পাশাপাশি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিও দ্রুত হয়। বাংলা সহায়তা থাকলে ভর্তি, নিয়মকানুন ও যোগাযোগের ভাষাগত বাধাও সহজেই দূর হবে।
সপ্তমত, সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি। প্যারিস সিটি কর্পোরেশন এখন থেকে বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার আশ্বাস দিয়েছে। এর ফলে ভাষা দিবস, সাহিত্যসভা কিংবা নানা উৎসব কেবল কমিউনিটির ভেতরের আনন্দে সীমিত থাকবে না; ফরাসি সমাজের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের পথও তৈরি হবে। ভাষা তখন কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎসবের মঞ্চে, শহরের চত্বরে এবং মানুষের সংলাপে বাস্তব হয়ে উঠবে।
প্যারিস সিটি কর্পোরেশনের এই দাপ্তরিক স্বীকৃতি আমাদের আগামীর পথকে আরও মসৃণ করবে এবং বিশ্বদরবারে আমাদের লাল সবুজ পতাকাকে আরও উঁচুতে তুলে ধরবে। এ উদ্যোগ প্রমাণ করে, বাংলাদেশিরা এখন আর কেবল অভিবাসী পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নন; তারা এই ফরাসি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তথ্যসূত্র:
Mairie de Paris (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ঘোষণার ভিত্তিতে)
INSEE (কমিউনিটি প্রেক্ষাপট)
IOM (অভিবাসন প্রেক্ষাপট)
UNESCO (ভাষা ও সংস্কৃতি প্রেক্ষাপট)