১. মেট্রোরেল : ব্যয়ের ভিতরের সত্য আর আমাদের ভুল তুলনা

ঢাকা শহরকে যদি কেউ একদিন ইতিহাসের নিরপেক্ষ চোখে দেখে, সে দেখবে এই শহর তার সময়ের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেছে। যানজটের বিরুদ্ধে, পরিকল্পনার অভাবের বিরুদ্ধে, আর আমাদের নিজেদের অদূরদর্শিতার বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ের মাঝখানে মেট্রোরেল এসেছে একধরনের আশার প্রতীক হয়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমরা এখন সেই আশাকেই সন্দেহের চোখে দেখছি-‘এত খরচ কেন?’

সমস্যাটা আসলে খরচে নয়, খরচের ব্যাখ্যায়। আমরা এলিভেটেড মেট্রোর সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোর তুলনা করছি, যেন দুটি একই জিনিস। অথচ প্রকৌশল বাস্তবতায় এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উড়াল মেট্রো বানানো মানে ওপরে কাঠামো বসানো; কিন্তু পাতাল মেট্রো মানে শহরের নিচে আরেকটি শহর তৈরি করা। ঢাকার মতো নরম মাটি, উচ্চ পানির স্তর, আর অতিরিক্ত ঘনবসতির ভিতর দিয়ে টানেল খনন করা শুধু প্রকল্প নয়-এটা একধরনের প্রযুক্তিগত যুদ্ধ।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, পাতাল মেট্রোর খরচ স্বাভাবিকভাবেই উড়াল প্রকল্পের তুলনায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি। কিন্তু আমরা সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে শুধু সংখ্যার তুলনা করছি। যেন উন্নয়নকে আমরা ‘সস্তা’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামিয়ে এনেছি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা, সিদ্ধান্তহীনতা। ‘রিভিউ’ আর ‘পুনর্বিবেচনা’র নামে প্রকল্প বিলম্বিত করা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা খুবই নির্মম-সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খরচ বাড়ে, ঝুঁকি বাড়ে, আর জনগণের ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। উন্নয়ন কখনো অপেক্ষা করে না; তাকে আটকে রাখতে গেলে সে আরও ব্যয়বহুল হয়ে ফিরে আসে।

আমরা কি সত্যিই ব্যয় কমাতে চাই, নাকি আমরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছি?

নাকি আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়েছি, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সিদ্ধান্ত ঠেকানো বেশি লাভজনক?

২. বই পড়া, সামাজিক মাধ্যম, আর মননের সংকট

একটা সময় ছিল, বই ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্ক্রলিং। আমরা পড়ছি, কিন্তু গভীরভাবে নয়; জানছি, কিন্তু বুঝছি না। বাংলাদেশে বই পড়ার আগ্রহ কমছে, এটা শুধু একটি সাংস্কৃতিক সমস্যা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক সমস্যাও। কারণ যে সমাজ পড়ে না, সে সমাজ প্রশ্ন করে না। আর যে সমাজ প্রশ্ন করে না, তাকে পরিচালনা করা সহজ।

সামাজিক মাধ্যম এখানে একধরনের ‘দ্বৈত বাস্তবতা’ তৈরি করেছে। একদিকে এটি তথ্যের গণতন্ত্র, সবাই কথা বলতে পারে। অন্যদিকে এটি বিভ্রান্তির কারখানা, সবাই সত্য বলছে না।

আজকের তরুণরা খবর জানে, কিন্তু প্রেক্ষাপট জানে না। তারা মতামত দেয়, কিন্তু বিশ্লেষণ করে না।

আমরা দ্রুততার প্রতি এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছি যে ধীরতা আমাদের কাছে দুর্বলতা মনে হয়। অথচ বই পড়া মানে ধীর হওয়া, ভাবা, প্রশ্ন করা। আরেকটা বিপজ্জনক পরিবর্তন হয়েছে, আমরা এখন ‘শুনতে’ ভুলে নিরপেক্ষ চোখেযাচ্ছি। আমরা শুধু বলতে চাই। ফলে সংলাপের জায়গায় তৈরি হচ্ছে একমুখী বক্তব্য। এটা শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্যও একটি বড় সংকেত।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ আজ আমরা সেই কঠিন কাজটা এড়িয়ে যাচ্ছি। আমরা সহজ কথা বলতে চাই, কিন্তু কঠিন সত্য এড়িয়ে যেতে চাই। ফলে তৈরি হচ্ছে একধরনের ‘শব্দের ভিড়’-যেখানে সবাই বলছে, কিন্তু কেউ শুনছে না। আর যখন কেউ শুনছে না, তখন সত্যও ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে।

৩. শিক্ষা, পরিচয়, আর বিভাজনের রাজনীতি

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি অদৃশ্য বিভাজন দিনদিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, মেইনস্ট্রিম শিক্ষা বনাম মাদ্রাসা শিক্ষা। এই বিভাজন শুধু কারিকুলামের নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গির, ভবিষ্যতের, এমনকি রাষ্ট্রচিন্তার বিভাজন।

আমরা একদিকে আধুনিক শিক্ষাকে উন্নয়নের একমাত্র পথ হিসেবে তুলে ধরছি, অন্যদিকে ধর্মীয় শিক্ষাকে একটি আলাদা জগতে রেখে দিচ্ছি। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সংলাপ নেই, কোনো সেতুবন্ধন নেই। ফলে তৈরি হচ্ছে দুই ধরনের নাগরিক-যারা একই দেশে বাস করে, কিন্তু একই বাস্তবতায় বিশ্বাস করে না।

এখানেই রাজনীতির ভূমিকা এসে পড়ে। বিভাজন যত বাড়ে, নিয়ন্ত্রণ তত সহজ হয়। মানুষকে আলাদা করে রাখা গেলে তাকে পরিচালনা করা সহজ। কিন্তু ইতিহাস বলে এই ধরনের বিভাজন দীর্ঘ মেয়াদে কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না, বরং দুর্বল করে।

আমাদের দরকার প্রতিযোগিতা নয়, সমন্বয়। এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে একজন ছাত্র বিজ্ঞান জানবে, আবার মানবিক মূল্যবোধও বুঝবে; যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান থাকবে, কিন্তু সেটি আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাতে যাবে না।

আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি ‘জ্ঞান’ নয়, ‘সমন্বিত জ্ঞান’-যেখানে বিভিন্ন ধারা একসঙ্গে কাজ করে। আর আমরা যদি সেই সমন্বয় করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা শুধু দক্ষ মানুষ পাব, কিন্তু প্রজ্ঞাবান মানুষ পাব না। কারণ শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার উপায় নয়, এটি মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়া।

৪. নিয়ন্ত্রণ, বিশৃঙ্খলা, আর নীরবতার শক্তি

রাজনীতি হোক বা ব্যক্তিগত জীবন-একটি পুরোনো কৌশল বারবার ফিরে আসে : প্রথমে বিশৃঙ্খলা তৈরি কর, তারপর সেটাকে নিয়ন্ত্রণের নামে স্থিতিশীলতা হিসেবে উপস্থাপন কর। যারা নিয়ন্ত্রণ চায়, তারা প্রায়ই অদৃশ্যভাবে সংকট তৈরি করে। তারপর সেই সংকটের সমাধানকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। এটাই সবচেয়ে পুরোনো খেলা।

কিন্তু এখানে একটি গভীর সত্য আছে-সব সংকটে প্রতিক্রিয়া জানানো প্রয়োজন হয় না। কিছু সংকট তৈরি করা হয় শুধুই আমাদের মনোযোগ কাড়ার জন্য। এই জায়গায় নীরবতা একটি কৌশল হয়ে ওঠে।

আমরা প্রায়ই মনে করি, প্রতিটি আক্রমণের জবাব দিতে হবে, প্রতিটি অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে, এই প্রতিক্রিয়াই অনেক সময় আমাদের দুর্বল করে তোলে। কারণ যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তারা চায় আমরা প্রতিক্রিয়া দিই-কারণ সেটাই তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ।

আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ সে নয়, যে সবচেয়ে বেশি কথা বলে; বরং সেই, যে জানে কখন কথা বলতে হয়, আর কখন চুপ থাকতে হয়। নীরবতা শুধু প্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতি নয়, এটা একধরনের শক্তি। এটা এমন এক অবস্থান, যেখানে আপনি পরিস্থিতিকে নিজের গতিতে চলতে দেন, কিন্তু নিজে স্থির থাকেন।

সত্য কখনো চিৎকার করে না। মিথ্যাই চিৎকার করে। যারা বারবার নিজেদের সততা ব্যাখ্যা করে, তারা আসলে নিজেদেরই বোঝাতে চায়। এই বাস্তবতায়, দূরত্ব কখনো পরাজয় নয়, এটি কৌশল। সব লড়াই লড়তে হয় না। কিছু লড়াই এড়িয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় জয়।

শেষ কথা

ঢাকার মেট্রোরেল থেকে শুরু করে আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক-সব জায়গায় একটি অদৃশ্য সূত্র কাজ করছে। এই সূত্রটি হলো, আমরা কি গভীরতার দিকে যাচ্ছি, নাকি শুধু গতির দিকে?

আমরা যদি শুধু খরচের হিসাব করি, কিন্তু ভবিষ্যতের মূল্য বুঝতে না পারি, তাহলে আমরা উন্নয়ন হারাব। আমরা যদি শুধু স্ক্রল করি, কিন্তু পড়তে না শিখি, তাহলে আমরা চিন্তা হারাব।

আমরা যদি বিভাজন তৈরি করি, কিন্তু সমন্বয় না করি, তাহলে আমরা সমাজ হারাব। আর আমরা যদি প্রতিটি শব্দের জবাব দিতে যাই, তাহলে আমরা নীরবতার শক্তি হারাব।

এখানে একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই বুঝতে পারছি, আমাদের চারপাশে কী ঘটছে? নাকি আমরা শুধু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি, বুঝে ওঠার আগেই? কারণ আজকের বিশ্বে তথ্যের অভাব নেই, অভাব আছে বোধের। আমরা যত বেশি জানছি, তত কম বুঝছি। আমরা যত বেশি বলছি, তত কম শুনছি।

এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, আমরা ধীরে ধীরে ‘সচেতন অচেতনতা’-র মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি। সবকিছু দেখছি, কিন্তু গভীরভাবে দেখছি না। সবকিছু শুনছি, কিন্তু ভিতরে নিচ্ছি না। সমাজ, রাষ্ট্র, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সব জায়গায় এই অস্থিরতা কাজ করছে। আর এই অস্থিরতার সুযোগ নেয় তারা, যারা নিয়ন্ত্রণ চায়।

তাই এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজেকে স্থির রাখা। অপ্রয়োজনীয় শব্দ থেকে দূরে থাকা। প্রয়োজন হলে চুপ থাকা। কারণ সব কথা বলা শক্তি নয়। সব সময় সামনে থাকা শক্তি নয়। কখনো কখনো পিছিয়ে যাওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, এটাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

এই সময়টা আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে-আমরা কি শুধু প্রতিক্রিয়া জানাব, নাকি আমরা চিন্তা করব? কারণ শেষ পর্যন্ত, শক্তি তাদেরই থাকে, যারা জানে-কখন এগোতে হয়, আর কখন থেমে গিয়ে শুধু দেখতেই হয়। আর যারা এই ‘থেমে থাকা’-র শক্তিটা বোঝে, তাদের কাছেই ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে নিজেকে খুলে দেয়।

লেখক :  প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews