মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এক সময় স্বাধীন আরাকান রাজ্য হিসেবে সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক আদান প্রদান ও ডেমোগ্রাফিক দিক থেকে বাংলাদেশের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল। বৃটিশদের ভুল নীতির কারণে আরাকান বার্মার রাখাইন রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করার পর থেকেই এখানে বার্মিজদের অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এক মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। সমস্যাটি মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট হলেও কক্সবাজারের নিকটবর্তী অভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে মিয়ানমারের জান্তা সরকার কৃত্রিম রাজনৈতিক ও আইনগত বৈষম্য সৃষ্টি করে তাদের উপর নির্যাতন ও নির্মূলের পথ বেছে নিলে রোহিঙ্গা মুসলমানরা প্রাণভয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রথম বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জনে সক্ষম হন। তখন প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাকে স্বদেশে ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসিত করেছিল মিয়ানমার সরকার। তবে ১৯৮২ সালের বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন পাস ও জান্তা সরকার এবং স্থানীয় উগ্রবাদী বৌদ্ধদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আশির দশকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রেসিডেন্ট জিয়ার দেখানো পথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছিলেন।
জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ ও দ্রুততম সমাধানে সরকারের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। তিনি তাঁর পিতা ও মাতার সাফল্যজনক পথ অনুসরণের মাধ্যমে এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, ভারতীয় বশংবদ পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধদের সীমাহীন নিপীড়ন ও গণহত্যার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্ব ইতিহাসে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনাকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তরফে এথনিক ক্লিনজিংয়ের ‘টেক্সটবুক এক্সাম্পল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জাতি-গোষ্ঠি হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবিক কারণে এসব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু যে রাজনৈতিক কারণে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হলেছিল তার কূটনৈতিক সমাধান ও রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তেমন কিছুই করেনি। আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসারে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, তুরস্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সহযোগী দেশগুলো ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভরন-পোষণে আর্থিক সহায়তা দিলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কিছু লিপ সার্ভিস ছাড়া তারা আর কিছুই করেনি। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়, তারা এই সমস্যা জিঁইয়ে রাখতেই যেন বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য এত বড় একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে হাসিনার সরকার ন্যূনতম পদক্ষেপ নিতেও ব্যর্থ হয়েছে। ইউএনএইচসিআর, বিশ্বখাদ্য সংস্থাসহ উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য যে অনুদান সহায়তা দিয়ে থাকে তার একটা বড় অংশই এসব সংস্থার কর্মকর্তাদের ভ্রমণ, আবাসন ও তদারকি ব্যবস্থার পেছনে খরচ হয়ে যায় বলে জানা যায়। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ অনেকটা কমিয়ে দেয়ার কারণে সেখানে এক প্রকার মানবিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মধ্যে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনা নেতাদের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পশ্চিমা বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার এই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো পথে মিয়ানমার সরকার, আরাকান আর্মিসহ সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ক্ষেত্রে চীন সরকারের সহযোগিতার আশ্বাস একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বাংলাদেশ আবারো পূর্বমুখী যোগাযোগ তথা কানেক্টিভিটির দিকে নজর দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে চীন পর্যন্ত বাংলাদেশের সাথে একটি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বা ইকোনমিক করিডোর বাস্তবায়নের যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, তা চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। চীন সরকার তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে অগ্রাধিকার ভিত্তিক মহাপরিকল্পনা হিসেবে গণ্য করেছে। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার হয়ে চীনের যোগাযোগ করিডোর প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থেই শি জিন পিং প্রশাসন রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের প্রশ্নে তাদের প্রভাব কাজে লাগাবে বলে আশা করা যায়। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরো কার্যকর যোগাযোগ ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষত মিয়ানমার সরকার এবং রাখাইন সীমান্তে বিবদমান গ্রুপগুলোর গতিবিধির উপর নিবিড়ভাবে নজর রাখা এবং তাদের সাথে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। চীনের হাত ধরে মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়ন ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফল অভিযাত্রা তাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে পারে।