আমাদের রাজনীতির এক অদ্ভুত কিন্তু বহুলচর্চিত বাস্তবতা হলো—সরকার বদলালেই যেন রাষ্ট্রের চেহারা পাল্টে যায়। নীতি বদলে যায়, ভাষা বদলে যায়, আচরণ বদলে যায়, এমনকি নৈতিকতার সংজ্ঞাও বদলে যায়। যেন রাষ্ট্র কোনো স্থায়ী কাঠামো নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছামতো রঙ বদলানো এক চলমান মঞ্চ।
এই পরিবর্তনকে যদি আমরা কেবল রাজনৈতিক কৌশল বলে ব্যাখ্যা করি, তাহলে আসল সংকটকে আড়াল করা হবে। বাস্তবে এটি একটি গভীর মানসিক, সাংগঠনিক এবং সংস্কৃতিগত অসুখ—যেখানে ক্ষমতা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং এক ধরনের “মনস্তাত্ত্বিক নেশা”তে রূপ নেয়।
ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের যে চেহারা আমরা দেখি, তা অনেকটাই মানবিক, সহনশীল এবং জনমুখী। তারা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যায়, সাধারণ মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে তুলে ধরে, কথাবার্তায় বিনয়ী থাকে, আচরণে নম্রতা দেখায়। তখন তাদের প্রতিটি বাক্যে থাকে আবেদন, প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে সংযোগ গড়ার চেষ্টা। কারণ তারা জানে—তাদের শক্তির উৎস জনগণ, আর সেই জনগণের মন জয় করাই তাদের টিকে থাকার একমাত্র উপায়।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই এই চিত্র যেন মুহূর্তে বদলে যায়। যেন কোনো অদৃশ্য সুইচ চাপা পড়ে। যে মানুষটি গতকালও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আজ তিনি হয়ে ওঠেন দূরবর্তী, অপ্রাপ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্বপরায়ণ। যে কণ্ঠে ছিল অনুরোধ, সেখানে আসে নির্দেশ; যে আচরণে ছিল সহমর্মিতা, সেখানে জন্ম নেয় এক ধরনের ঔদ্ধত্য।
এই রূপান্তর শুধু বিস্ময়কর নয়—এটি ভীতিকরও। কারণ এটি প্রমাণ করে, সমস্যাটি ব্যক্তি নয়; সমস্যাটি কাঠামো, সংস্কৃতি এবং মানসিকতার গভীরে প্রোথিত।
এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় কারণ হলো ভোগবাদী মানসিকতা। আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই “সেবা” নয়, “ভোগের” প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্ষমতা মানেই সুযোগ, প্রভাব, অর্থনৈতিক প্রবাহ, সুবিধা—এই ধারণা এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় যাওয়া মানেই যেন একটি বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত জীবনে প্রবেশ করা।
এই মানসিকতা রাজনীতিকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে সুবিধাবাদের দিকে ঠেলে দেয়। তখন রাজনীতি আর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থাকে না; এটি হয়ে ওঠে সুযোগের বণ্টন এবং প্রভাবের ব্যবস্থাপনা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় তোষামোদনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি—যা এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তোলে। ক্ষমতায় আসার পর খুব দ্রুত একটি বলয় তৈরি হয়। এই বলয় কোনো স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি এক ধরনের “ক্ষমতার দুর্গ”, যেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত, তথ্য নিয়ন্ত্রিত, এবং মতামত একমুখী।
এই বলয়ের ভেতরে যারা থাকে, তারা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের চারপাশে তৈরি হয় প্রশংসার এক কৃত্রিম জগৎ—যেখানে নেতা সবসময় সঠিক, সিদ্ধান্ত সবসময় নিখুঁত, আর সমালোচনা মানেই ষড়যন্ত্র। এই পরিবেশে সত্য বলার সাহস কেউ দেখায় না; বরং সবাই নিরাপদ থাকতে চায়। ফলে ভুলগুলো সংশোধন হয় না, বরং আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
এই বলয়ই নেতাকর্মীদের মানসিকতায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনে। তারা নিজেদের আর জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দেখে না; বরং ক্ষমতার মালিক হিসেবে ভাবতে শুরু করে। তাদের কাছে রাষ্ট্র হয়ে যায় একটি নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র, আর জনগণ হয়ে যায় পরিচালিত একটি গোষ্ঠী।
এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হয়, তা হলো—জবাবদিহিতার মৃত্যু। যখন ক্ষমতাসীনরা মনে করে তারা প্রশ্নাতীত, তখন তারা আর জনগণের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধ মনে করে না। আর যখন জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়, তখন দুর্নীতি, অপব্যবহার এবং অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা এই চক্রটি বারবার দেখেছি। ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার—এই শব্দগুলো উচ্চকিত হয়। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সেই একই শব্দ অনেক সময় প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়। এটি শুধু দ্বিচারিতা নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক ভণ্ডামি, যা ধীরে ধীরে সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই পরিবর্তনকে অনেকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছে। যেন ক্ষমতায় গেলে বদলে যাওয়াই নিয়ম, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে ভদ্র হওয়াটাই কৌশল। এই মানসিকতা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এটি নৈতিকতার মানদণ্ডকে ধ্বংস করে দেয়।
ক্ষমতার সঙ্গে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধাগুলো যুক্ত, তা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
একটি বড় অংশ রাজনীতিকে দেখে ব্যক্তিগত উন্নতির সিঁড়ি হিসেবে। ফলে আদর্শ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা—সবকিছুই গৌণ হয়ে যায়। প্রধান হয়ে ওঠে লাভ-ক্ষতির হিসাব।
এই অবস্থায় রাজনীতি আর জনকল্যাণের হাতিয়ার থাকে না; এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের “সুযোগের বাজার”, যেখানে নীতি নয়, সুবিধাই মূল মুদ্রা।
সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিবর্তনটি স্থায়ী থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত ক্ষমতা থাকে। কারণ ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থেকে আত্মসমালোচনা করা কঠিন। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা আবার সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন আবার জনগণের কাছে যেতে হয়, আবার বিনয়ী হতে হয়, আবার সংবেদনশীলতার মুখোশ পরতে হয়।
এই পুনরাবৃত্ত চক্রটি আমাদের রাজনীতিকে এক ধরনের নাট্যমঞ্চে পরিণত করেছে—যেখানে চরিত্র একই, কিন্তু তাদের আচরণ ক্ষমতার অবস্থান অনুযায়ী বদলে যায়।
এখন প্রশ্ন হলো—এই চক্র থেকে বের হওয়ার উপায় কি?
প্রথমত, রাজনীতিকে ভোগের মাধ্যম থেকে সেবার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে—কথায় নয়, কাজে।
দ্বিতীয়ত, তোষামোদনির্ভর বলয় ভেঙে সত্য বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে জবাবদিহিতামূলক কাঠামো তৈরি করতে হবে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসতে হবে মানসিকতায়—যেখানে ক্ষমতাকে দেখা হবে দায়িত্ব হিসেবে, সুবিধা হিসেবে নয়।
যতদিন না এই পরিবর্তন আসছে, ততদিন সরকার বদলালেই সবকিছু বদলে যাওয়ার এই অস্বাভাবিক বাস্তবতা আমাদের সঙ্গেই থাকবে। আমরা বারবার নতুন আশায় বুক বাঁধব, আবার হতাশ হব, আবার একই চক্রে ফিরে যাব। সুতরাং ভোগবাদ,তোষামোদ ও দোষারোপ-ক্ষমতা ও রাজনীতির এই দুষ্টু চক্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তা না হলে রাজনীতি কখনোই দেশ,জনগণ এমনকি সাধারণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্যও কল্যাণকর হবে না।
পরিশেষে এই আলোচনার একটি ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটও উল্লেখ করা জরুরি। এই লেখার শিরোনামটি আমার নিজস্ব নয়; এটি আমি পরম শ্রদ্ধেয়, বাংলাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তি সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর কাছ থেকে ধার করেছি। তিনি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশন-এ প্রচারিত বহুল আলোচিত টকশো ফ্রন্টলাইন সঞ্চালনা করেন—যেখানে সমসাময়িক জাতীয় ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো গভীরভাবে বিশ্লেষিত হয়। গতকাল মঙ্গলবার এই অনুষ্ঠানেই আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু পহেলা বৈশাখের যানজটের বাস্তবতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে পারিনি। অনেক চেষ্টার পরও যখন স্টুডিওতে পৌঁছাই, তখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফলে মূল আলোচনায় আমার বক্তব্য পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরার সুযোগ হয়নি। এ জন্য আমি মতি ভাই, অনুষ্ঠানের সম্মানিত দর্শক-শ্রোতা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক সমস্যার মতোই, রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অপূর্ণ থেকে যায়, পূর্ণতা পায় না। সেই অপূর্ণতাকে পূরণ করার একান্ত প্রয়াস থেকেই এই কলামটি লেখা। এখানে আমি যে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছি, তা কেবল একটি মতামত নয়; বরং সেই আলোচনারই একটি বিস্তৃত রূপ, যা বলা হয়নি, কিন্তু বলা জরুরি ছিল।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
ই-মেইল: [email protected]