প্রিয়জনদের সাথে সাক্ষাৎ, বছর শেষে আবারো শৈশবের স্মৃতিমুখর পরিবেশে ফিরে যাওয়ার, খেলার সাথী, স্কুলের সহপাঠী, পাড়ার বড়দের সাথে দেখা করার আনন্দ— সবকিছু মিলিয়ে ঈদ। এ আনন্দ পরিচিতজন, স্বজনদের সাথে ভাগ করে নেয়ার আকাঙ্ক্ষায় শহর ছেড়ে সব কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়ে গ্রামে ছুটে যাওয়া, যেখানে আকুল প্রত্যাশায় কারো বাবা-মা, ভাইবোন, কারো স্ত্রী-সন্তান অপেক্ষমাণ। পথে নানান ঘটনা দুর্ঘটনা। তবুও থেমে থাকে না ছুটে চলা। পথের সব কষ্ট, বেদনা মুহূর্তেই সবাই ভুলে যায় অপেক্ষমাণ পরিজনের মুখে আনন্দের, খুশির প্রকাশ দেখে। শেকড়ের টানে ছুটে চলার এই কষ্ট না হলে যেন ঈদ আনন্দ অপূর্ণই থেকে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় এবারো আমরা সপরিবারে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আয়োজনে প্রথমেই ধাক্কা খেলাম তেল নিয়ে। হঠাৎ করেই তেল উধাও। হাহাকার দেশজুড়ে। তেলের লুকোচুরি খেলায় নাস্তানাবুদ ঈদে ঘরমুখো মানুষ। অনিশ্চয়তার শঙ্কা সবার চোখে মুখে। যদিও কর্তৃপক্ষ বারবার বলেছে, তেল নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর আশ্বাস, তাকে জানালেই তিনি তেলের ব্যবস্থা করে দেবেন। কিভাবে দেবেন, তা কিন্তু উহ্যই রয়ে গেছে। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে দিনভর লাইন দিয়েও তেল পাওয়া যায়নি।
আনন্দ সম্প্রীতি, ভালোবাসার উচ্ছ্বাসের বিপরীতে সড়ক দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি তেলসঙ্কটের ঘেরাটোপে ম্রিয়মাণ ছিল এবারের ঈদ আনন্দের আয়োজন। সড়ক পরিবহনমন্ত্রীর আশ্বাস, ঈদে মানুষকে ট্রেনের ছাদে উঠতে হবে না, বাসের টিকিটের জন্য গুনতে হবে না বাড়তি অর্থ। কিন্তু বাস্তবে? ‘সকলি গরল ভেল’। তেল মজুদ, কালোবাজারি রুখতে পুলিশ, বিজিবি দিয়ে লাভ হয়নি। তেল এখনো অধরা। বাসের টিকিট নির্ধারিত মূল্যে কতটুকু পাওয়া গেছে তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। পুরনো লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ি রঙ করে মাঠে নামানোর সংস্কৃতি এখনো সগৌরবে দেদীপ্যমান। ফলে সড়কে নিরাপত্তার অভাব ও চালকের অসতর্কতায় হারিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে তিন শ’ পরিবারের চোখের আলো। হুমকিতে ফেলেছে দেড় হাজার ব্যক্তির জীবন। এর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যায়নি। সড়কমন্ত্রী এসব দেখে কতটুকু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ আনন্দ লেজেগোবরে। শেষ মুহূর্তে বাসের টিকিটও নেই। ট্রেনে ওঠার কথা অচিন্তনীয়। অন্য সময় ঈদের ছুটিতে গাড়ি নিয়ে যেতাম। যাওয়া আসার তেল খরচ হতো ১০-১২ হাজার টাকার মতো। এবার গাড়ি নিতে না পারায় পাঁচ দিন গাড়ি ভাড়া দিতে হয়েছে অনেক টাকার। তেলের অভাবে গত্যন্তর না দেখে আকাশপথে। ছয় হাজার টাকার টিকিট ১২ হাজার টাকায় নিতে হয়েছে। সবই যেন ঈদের রাক্ষুসে মাছ। অবস্থাটা এমন যেন, জনগণকে বেকায়দায় ফেলে ছিঁড়ে খাবলে খাবে। দায়িত্ববোধ, দায়বদ্ধতা- জবাবদিহির অনুপস্থিতির এক অনন্য নজির!
প্রকৃতিও যেন এবার ঈদে বাদ সেধেছিল। কালবৈশাখী, শিলাবৃষ্টি এবং বর্ষার চেয়ে বেশি অঝোর বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ক্ষেতের আলু, ভুট্টা, ইরিধানের ক্ষেত, পেঁয়াজ-রসুন সবই পানির নিচে। কৃষকের বুকভরা আশা, নতুন স্বপ্ন কালবৈশাখী ও অকাল বর্ষণে মুহূর্তেই শেষ। আম, লিচুসহ অন্যান্য ফলের মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে! আমেরিকা ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ, দেশের বিপর্যস্ত কৃষি, লম্বা ছুটিতে শিল্প কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার লোকসান, সড়ক দুর্ঘটনায় এতগুলো প্রাণের অকালে ঝরে যাওয়া, এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারো। ট্রেনের লাইন বিচ্যুতির তদন্ত কমিটি গঠনেই তৃপ্তিবোধ, কী চমৎকার!
এত কিছুর মধ্যেও ঈদের ছুটিতে রয়েছে এক অনাবিল আনন্দ। এই আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন অনেকে। আমিও যারপরনাই চেষ্টা করেছি। আমাদের বাড়ির লাগোয়া পাড়াটাই দেশীয় খ্রিষ্টানদের।
ঈদের দিন সবার বাড়িতে মিষ্টি পাঠানো, ঈদ জামাতে আগত সবার ভেতর আতর ও মিষ্টি বিতরণ আমাদের ঈদ জামাতটিকে রূপান্তরিত করেছিল এক অনন্য পরিবেশে। বিশেষ করে মেক্সিকো, ক্যালিফোর্নিয়া, ফিলিপাইন এবং বর্তমানে পাকিস্তানের লাহোরে গির্জায় কর্মরত খ্রিষ্টান সিস্টার প্রত্যন্তির সাথে সাক্ষাৎ, আন্তঃধর্মীয় আলোচনা এবং তাকে মিষ্টি পাঠানো এবার আমাদের ঈদ আনন্দে ব্যতিক্রমী ধারা বয়ে আনে। তবুও এবারের ঈদে আনন্দের চেয়ে শঙ্কাই ছিল বেশি। এর মূল কারণ বৈরী আবহাওয়া, যা সামনে কৃষির সম্ভাব্য দুরবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়কে এখনই কার্যকর ভূমিকা পালন করা জরুরি। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সাথে সরাসরি সংযোগ এবং নিবিড় তত্ত্বাবধান। প্রয়োজন যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ। না হলে অর্থনীতি টালমাটাল হওয়ার সমূহ শঙ্কা।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ