২০২৪ এবং ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৩টি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। প্রথমটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। সেদিন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। জনগণের প্রতিবাদে সেদিন শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান এবং তার সরকারের পতন ঘটে। সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং দলটির অধিকাংশ বড় বড় নেতাও পালিয়ে যান। শেখ হাসিনা, তার সরকার এবং দলের প্রতি জনগণ কেবল ঘৃণা এবং ক্ষোভই প্রকাশ করেছে। দ্বিতীয়টি ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির এবং তৃতীয়টি ৩০ ডিসেম্বর বেগম জিয়ার মৃত্যু। জনতা তাদের জন্য ভালোবাসা এবং শোকে কেঁদেছে। তাদের জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ এবং তাদের জন্য দোয়া করেছে। তারা জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত এবং সম্মানের পাত্রে পরিণত হয়েছেন। জনগণ যেখানে শেখ হাসিনা ও তার পিতার মূর্তি ভেঙ্গেছে, সেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ওসমান হাদি এবং খালেদা জিয়ার কবর জেয়ারত করছে। শেখ হাসিনা জনগণের ঘৃণা আর ওসমান হাদি এবং খালেদা জিয়া জনগণের ভালোবাসা অর্জন করেছেন ।
প্রথমত: শেখ হাসিনার প্রতি জনগণের ঘৃণার কারণ আলোচনা করছি। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ হতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসন দুঃশাসনে ভরা ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ষিবাহিনী সিরাজ সিকদারসহ জাসদের ২০ হাজার কর্মীকে হত্যা করে। ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ হয়, যাতে বহু মানুষ মারা যায়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসন বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং ৪টি ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলে আওয়ামী শাসনের অবসান হয়। জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে এবং ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত শাসনটা তুলনামূলক ভালো ছিল। কারণ, তখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। ২০০৬ সালে বিএনপির ক্ষমতা শেষে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আওয়ামী লীগ মানেনি। ফলে ২০০৭ সালে ১/১১ সৃষ্টি হয় এবং ১/১১ সরকারের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত ভোটে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সেনাবাহিনীর ৫৭ জন কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। কয়েক হাজার বিডিআর সদস্য দীর্ঘ কারাভোগ করে। সেনাবাহিনী-বিডিআরের অপূরণীয় ক্ষতি করা হয়। ব্যাংক-শেয়ার বাজার থেকে ঋণের নামে লক্ষ কোটি টাকা লুট করে পাচার করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ বছরে ১৫ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ এবং ১৫০ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে। বিরোধী মালিকাধীন ব্যাংক, বীমা এবং স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় দখল করা হয়। বিরোধী মালিকানাধীন দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান, সিএসবি চ্যানেল, দৈনিক আমার দেশ এবং দৈনিক দিনকাল বন্ধ করে দেয়া হয়। বিরোধী দলের অফিস বছরের পর বছর বন্ধ রাখা হয় এবং জনসভায় অনেকবার হামলা সংঘটিত হয়। সবকিছু দলীয়করণ করা হয়। তাদের শাসনামলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সংসদে বলেন, বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে ৮১০৫ মামলা রয়েছে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষ আসামী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছিল ছাত্রলীগের একক দখলদারিত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ। যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে জামায়াত ও বিএনপির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে ফাঁসি দিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে সাজানো মামলায় কারাদ- দিয়ে জেলে নিয়েছে, চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে দেয়নি। তারেক রহমান দীর্ঘদিন নির্বাসিত ছিলেন এবং তাকে বিভিন্ন মামলায় কারাদ- দেয়া হয়। খুন ঘুম ছিল সাধারণ বিষয়। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী এখনো নিখোঁজ। ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে হেফাজতের কর্মসূচিতে আইনশৃংখলা বাহিনী হামলা চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করে। দুর্নীতি ছিল লাগামহীন। শেখ হাসিনা বলেন, তার অফিসের পিয়ন চারশত কোটি টাকার মালিক, হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে অবজ্ঞা এবং আলেম সমাজকে বরাবরই নির্যাতন করেছে। ভারতের প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও তার স্বার্থে সব সময় কাজ করেছে। ফলে জনগণ ছিল খুবই অসন্তুষ্ট এবং আওয়ামী লীগের করুণ পরিণতি হয়েছে ।
দ্বিতীয়ত: জুলাই যোদ্ধা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র মোহাম্মদ শরিফ ওসমান হাদির কথা বর্ণনা করছি। ৩৩ বছরের ছোট্ট জীবনে হাদির অর্জন ইতিহাসে বিরল। আততায়ীর গুলিতে আহত হলে সুস্থতার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রার্থনা করেছে, মৃত্যু সংবাদে কেঁদেছে। হাদি জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা ছিলেন। ইনকিলাব মঞ্চ এবং ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে ভারতীয় আধিপত্য এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। সবসময় ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর হাদি ইন্তেকাল করেন। মানিক মিয়া এভিনিউতে ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জানাজা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সারা দেশে অসংখ্য গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। হাদি খাঁটি ঈমানদার ছিলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। তিনি সহজ, সরল, বিনয়ী ছিলেন, সাধারণ জীবন যাপন করতেন। হাদি বাংলাদেশকে এবং দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং আদর্শকে ধারণ করেছেন। তিনি অমুসলিম জনগণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের কথাও বলেছেন। তিনি মৃত্যুকে ভয় করেননি, দেশ এবং ইনসাফের লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গ করে আল্লাহর কাছে পৌঁছার ইচ্ছার কথা বলেছেন। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। হাদির ভালো কর্মই হাদিকে জনপ্রিয় করেছে। হাদি আমজনতার কাছে ভালবাসার আপনজনে পরিণত হয়েছেন। হাদির প্রতি মানুষের ভালবাসা বিস্ময়কর এবং কল্পনাতীত।
তৃতীয়ত: বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি জনগণের ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার বিষয়টি আলোচনা করছি। বিএনপি চেয়ারপার্সন, তিন বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন এবং ৩১ ডিসেম্বর মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা করা। তার জানাজায় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল কল্পনার বাইরে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তার জানাজা ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজায় পরিণত হয়। তিনি দেশকে এবং দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং আদর্শকে ধারণ করেছেন। অমুসলিম জনগণের অধিকারও নিশ্চিত করেছেন। তিনি ছিলেন আগোগোড়া সৎ মানুষ। তিনবার প্রধানমন্ত্রী সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ বের করতে পারেনি। গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আপোসহীন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন অবিচল। স্বৈরাচার এরশাদ এবং হাসিনার সাথে কখনোই আপোস করেননি এবং আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে দুজনকেই ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। হাসিনা সরকারের মিথ্যা মামলায় কারাভোগ করেছেন, বাড়ি থেকে উৎখাত হয়েছেন, বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাও করাতে পারেনি। চরমভাবে নির্যাতিত হয়েছেন কিন্তু অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি। প্রচন্ড চাপ সত্ত্বেও তিনি দেশ ছেড়ে চলে যাননি। তিনি সব সময় রাজনীতিতে ঐক্যের কথা বলেছেন এবং কাজ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, দেশের বাইরে তার কোনো ঠিকানা নাই এবং দেশেই থাকবেন। দেশ, দেশের মাটি এবং মানুষই তার ঠিকানা। শেষ পর্যন্ত তিনি তার কথা রেখেছেন। দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি ভালবাসা, গণতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্ট এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপোসহীন সংগ্রাম খালেদা জিয়াকে দেশ ও জনগণের অভিভাবকে পরিণত করেছে। তিনি জনগণের ভালোবাসা, শ্রদ্ধার আইকন এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন ।
জীবনে কোন কর্মই প্রতিফল ছাড়া বিফলে যায় না। ছোট কিংবা বড়, ভালো কিংবা মন্দÑ যাই করেন না কেন তার প্রতিফল আপনি ভোগ করবেন। আপনি যা কিছু অন্যের জন্য করবেন, তাই তাদের কাছ থেকে ফেরত পাবেন। আপনি যদি মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষও আপনাকে ভালোবাসবে। আপনি যদি মানুষকে ঘৃণা করেন, মানুষও আপনাকে ঘৃণা করবে। জোর করে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। আপনি অন্যের জন্য যা করবেন সময়ের ব্যবধানে তাই আপনার দিকে ফেরত আসবে। ভালোবাসা এবং ঘৃণা, সবই কর্মফল। এটা প্রকৃতির নিয়ম এবং ইতিহাসের অনিবার্য সত্য।
লেখক: প্রকৌশলী এবং রাষ্ট্র চিন্তক।
[email protected]