হাবিবুর রশিদ হিমন, বান্দরবান প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ২৭২ কিলোমিটার জুড়ে আবারও নতুন করে অস্থিতিশীলতার কালো ছায়া নেমে এসেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সুবিধা নিয়ে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’ (এএ) আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখার কাছাকাছি একের পর এক সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা করছে। বিশেষ করে বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড়মদক এলাকার ৭০ নম্বর সীমান্ত পিলারের ঠিক ওপারে মিয়ানমার অংশে সংগঠনটির সামরিক তৎপরতা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার ঘটনায় স্থানীয় সীমান্তবাসীর মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সীমান্তের অতি সন্নিকটে এমন সশস্ত্র কার্যক্রম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলোর রাখাইন তরুণদের বিভিন্ন লোভনীয় সুযোগ-সুবিধা দেখিয়ে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মারাত্মক ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তাদের ওপার থেকে পরিচালিত এসব দুর্গম ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে নিবিড় সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত ও দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ হওয়ার সুযোগে এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধমূলক কার্যক্রম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ওপারের এই সশস্ত্র উপস্থিতি কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার উপায় নেই। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব ক্যাডারদের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অস্ত্র ও মাদক পাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া আরাকান আর্মি তাদের সংগঠনের অর্থনৈতিক শক্তি জোগাতে বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে অবৈধ মাদক ও অস্ত্র বিক্রি করছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে এই আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্কের কারণে সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে এমনিতেই অতীতে বহুবার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মানুষ গোলার শব্দ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। সীমান্ত এলাকায় চলমান এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, কৃষিকাজ এবং সীমানা ঘেঁষা ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কোনো সময় ওপার থেকে সংঘাত এপারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে পুরো থানচি সীমান্ত জুড়ে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সীমান্তজুড়ে নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকসার উদ্দিন খান জানান, সীমান্তে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন চেকপোস্ট স্থাপন করার পাশাপাশি বিজিবির টহল ও নজরদারি সার্বক্ষণিক অব্যাহত রাখা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বা অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি হাতছাড়া হওয়ার আগেই দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা, ড্রোন ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করা এবং একই সাথে পাহাড়ি চেকপোস্টগুলোতে বিজিবির জনবল বৃদ্ধি করা জরুরি। পাশাপাশি আরাকান আর্মি বা কোনো সশস্ত্র দল যেন বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে কোনোভাবেই তাদের রসদ সংগ্রহ বা আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য সীমান্ত জুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।