জামিনে মুক্তির আগে নগদ অর্থ জমা দেওয়ার নতুন নিয়ম কার্যকর হতেই তা নিয়ে শুরু হয়েছে সাংবিধানিক বিতর্ক। কানাডার অন্টারিও প্রদেশে চালু হওয়া এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে কানাডিয়ান সিভিল লিবার্টিজ অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্রিমিনাল লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন। তাঁদের অভিযোগ, নতুন নিয়মটি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং অসচ্ছল অভিযুক্তদের জন্য কার্যত আলাদা দু’টি জামিন ব্যবস্থা তৈরি করবে। দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে আদালতে দেওয়া লিখিত নথিতে বলা হয়েছে, কানাডার জামিন ব্যবস্থার ওপর মূল কর্তৃত্ব ফেডারেল সরকারের। তাই অন্টারিও প্রাদেশিক আইন করে এমন পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজীবীদের আশঙ্কা, নতুন নিয়মের ফলে যাঁদের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই, তাঁদের জামিন পাওয়ার পরও কারাগারে থাকতে হতে পারে। অন্যদিকে, যাঁরা নির্ধারিত অর্থ দিতে সক্ষম, তাঁরা দ্রুত মুক্তি পাবেন। ফলে একজন অভিযুক্তের আর্থিক সামর্থ্যই তাঁর কারাগারে থাকা বা বাইরে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আইনজীবীদের মতে, এই পরিস্থিতি কানাডার চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস-এ সুরক্ষিত জামিনের অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাঁদের যুক্তি, যুক্তিসংগত ও ন্যায্য কারণ ছাড়া কাউকে জামিন থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
- Advertisement -
অন্টারিওর অ্যাটর্নি জেনারেল ডাগ ডাউনি শুক্রবার জানান, প্রদেশের কিপিং ক্রিমিনালস বাহাইন্ড বারস অ্যাক্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আদালত জামিন মঞ্জুর করার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ দুই কর্মদিবসের মধ্যে জামিনের অর্থ জমা দিতে হবে। তা না হলে অভিযুক্তকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার আগে পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। সাধারণত বিচারক জামিনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার চাইতেন। সেই অঙ্গীকার অভিযুক্ত নিজে দিতে পারতেন, আবার তাঁর হয়ে অন্য কোনো জামিনদারও তা দিতে পারতেন। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রেই সঙ্গে সঙ্গে নগদ অর্থ জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। নতুন ব্যবস্থায় সেই প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এসেছে বলেই মনে করছেন সমালোচকরা।
সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবী ব্র্যান্ডন চ্যাংয়ের দাবি, প্রায় ৫০ বছর ধরে যে ব্যবস্থায় নগদ অর্থের মাধ্যমে জামিন ছিল ব্যতিক্রমী বিষয়, নতুন আইন সেটিকেই কার্যত নিয়মে পরিণত করছে। তাঁর বক্তব্য, পাঁচ দশক আগে নগদ অর্থ দিয়ে জামিনের ধারণা ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। সেটিকে এখন সাধারণ ব্যবস্থার অংশ করে দেওয়ার ফলে জামিন প্রক্রিয়ার মৌলিক চরিত্রই বদলে যাচ্ছে। আইনজীবীদের আরও আশঙ্কা, নতুন নিয়মের প্রভাব শুধু অভিযুক্তদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। অন্টারিওর ইতিমধ্যেই চাপের মুখে থাকা কারাগারগুলিতে আরও বেশি মানুষকে রাখতে হতে পারে। এর ফলে কারাগারে ভিড় বাড়ার পাশাপাশি আদালতের কাজেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রে আদালতের কর্মীদেরও অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হবে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। তাঁদের বক্তব্য, শুধু আইন ভঙ্গের অভিযোগের বিচার করাই নয়, জামিনের অর্থ নির্ধারিত সময়ে জমা পড়েছে কি না, সেটিও প্রতিটি মামলায় নজরদারি করতে হবে। ফলে আদালতের প্রশাসনিক কাজ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং মামলার জট বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন, অন্টারিও সরকারের এই নতুন নগদ জামিন ব্যবস্থা কানাডার সংবিধান ও চার্টার অব রাইটসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। সেই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়েই নির্ধারিত হতে পারে।
- Advertisement -