তানহা আজমী
কখনো একটি পথ মানুষের পায়ের ধুলা, স্লোগান, প্রত্যয় আর প্রত্যাশার ভারে হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। একটি দীর্ঘ পদযাত্রা বা লংমার্চ তাই সময়ের চাহিদা পূরণে কোটি মানুষের কুচকাওয়াজ। এটি রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেয়ার শক্তিশালী প্রতীক।

লংমার্চ আক্ষরিক অর্থে দীর্ঘ পদযাত্রা বা অভিযাত্রা হলেও এর অর্থ অনেক বিস্তৃত। কখনো এটি অগ্রযাত্রা, কখনো আন্দোলনের কৌশল, কখনো নিপীড়িত গণমানুষের দাবি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশের ইতিহাসে লংমার্চ শব্দটির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ১৯৭৬ সালের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ। আর ২০২৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে আবারো এক নতুন পদধ্বনি জাগিয়েছে।

ভাসানীর ফারাক্কা লংমার্চ : ১৯৭৬ সাল; বাংলাদেশের উত্তর- পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও জনজীবনে পানির সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছিল। এর কেন্দ্রে ছিল ফারাক্কা ব্যারাজ।

বাংলাদেশের কথা ছিল, উজানে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশকে শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমিতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি, নৌপথ, মৎস্য, পরিবেশে; যা মানুষের জীবন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দেয়। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চললেও কাক্সিক্ষত সমাধান কখনোই হয়নি। এই পটভূমিতে মওলানা ভাসানী জনমত সংগঠিত করেন, উদীপ্ত করেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে ছিল তার ঐতিহাসিক লংমার্চ।

ফারাক্কা লংমার্চ ফারাক্কা প্রশ্নকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় জোরালো করে এবং পানি কূটনীতিতে জনমতের চাপ তৈরি করে। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের ১৩ দফা দাবি ছিল ধর্মীয় অনুভূতি, ইসলামবিরোধী বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

১৯৯০ সালের লংমার্চ : ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী তিন জোটের লংমার্চের প্রধান দাবি ছিল এরশাদ সরকারের পতন। সেই লংমার্চ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে নব্বইয়ের আন্দোলনকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দিনের লংমার্চ হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনা বোঝা যাবে না। লংমার্চ, হরতাল, অবরোধ, সচিবালয় ঘেরাও, ছাত্র আন্দোলন, পেশাজীবীদের আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থান— সব মিলিয়েই এরশাদ পতনের আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়।

নব্বইয়ের চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি তিনটি বড় জোটে সংগঠিত ছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট এবং বামপন্থীদের পাঁচদলীয় জোট।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। তবে জামায়াত কোনো জোটের আনুষ্ঠানিক শরিক ছিল না। তারা আলাদাভাবে একই দাবিতে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করে। জামায়াতও ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত লংমার্চ করে।

২০২০ সালের লংমার্চ : ঢাকা থেকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ অভিমুখী এই লংমার্চের উদ্দেশ্য ছিল ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, বিচারব্যবস্থার সংস্কার, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং নারী-পুরুষের বৈষম্য কমাতে বিভিন্ন আইন ও নীতিগত পরিবর্তনের দাবি তোলা হয়।

২০২১-এ ম্রো জনগোষ্ঠীর লংমার্চ : চিম্বুক পাহাড় থেকে বান্দরবান অভিমুখী এই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল ভূমি, পাহাড়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্ন। এর দাবি ছিল ম্রো জনগোষ্ঠীর ভূমি ও জীবনযাত্রা রক্ষা এবং পাহাড়ে বিতর্কিত পর্যটন প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান।

চব্বিশের লংমার্চ টু ঢাকা : ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই- আগস্টের আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে লংমার্চ টু ঢাকা ঘোষণা করা হয়। এটি আগের লংমার্চগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে এক দফা দাবিতে পরিণত হয়।

তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার পদত্যাগে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন ঘটায়। জাতীয়ভাবে এটি ক্ষমতার পালাবদলের প্রতীক এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে বিশ্বমনোযোগ সৃষ্টি করে।

এবার আসা যাক গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ প্রসঙ্গে। ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয় জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ। ঢাকায় সমাবেশের পর সকালেই চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। পথে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও মিরসরাইয়ে পথসভা এবং শেষে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। লংমার্চে জামায়াতসহ আরো ছিল— এনসিপি, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, বিডিপি, জাগপা, এলডিপি, এবি পার্টি ও লেবার পার্টি।

এই লংমার্চের বিশেষত্ব হলো— এতে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দাবি সামনে রাখা হয়েছে। যেমন— গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার সঙ্কটের সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং চাঁদাবাজি-দুর্নীতি ও প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ, গণতান্ত্রিক সংস্কার, জনগণের অর্থনৈতিক স্বস্তি, সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা।

এখানে ইতিহাসের একটি চমৎকার ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর লংমার্চের কেন্দ্র ছিল ‘পানি চাই ন্যায্য অধিকার চাই’। ২০২৬ সালে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের কেন্দ্রীয় বক্তব্য— গণরায়ের বাস্তবায়ন চাই, ন্যায়বিচার চাই, মানুষের মৌলিক সেবা ও অর্থনৈতিক স্বস্তি চাই, সুশাসন চাই।

৫০ বছরে বাংলাদেশের লংমার্চের বিষয়বস্তু বদলেছে। কিন্তু মৌলিক রাজনৈতিক সূত্র একই আছে। জনগণের কোনো দাবি শুধু কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে রাজপথের দৃশ্যমান শক্তিতে রূপ দেয়া।

৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির তাৎক্ষণিক জাতীয় প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট। এটি সরকারের ওপর বিরোধী রাজনৈতিক চাপ দৃশ্যমান করেছে এবং সংসদের বাইরে বিরোধী জোটের আন্দোলনকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

বর্তমান ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা-চট্টগ্রামের পর ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-সিলেট অভিমুখী আরো লংমার্চ এবং পরে ঢাকায় বড় সমাবেশের কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। ফলে ৫ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি কোনো বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি নয়। এটি ধারাবাহিক আন্দোলন কৌশলের প্রথম বড় ধাপ। লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হওয়ায় সরকার ও আন্দোলনকারীদের ভূমিকা প্রশংসা পেয়েছে। আন্দোলনকে সফল বলা চলে।

লেখক : তরুণ সাংবাদিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews