প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট। কথিত আছে, ৩৬০ জন আউলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে হজরত শাহজালাল (রা.) সিলেটে আগমন করেন। পরবর্তীতে সিলেটেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। আজও তাঁর মাজার প্রাঙ্গণ হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত। সেখানে রয়েছে ঝাঁক ঝাঁক জালালি কবুতর। এই সৌন্দর্যের লীলাভূমিরই অধিবাসী শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

গত ২৩ জুলাই ছুটির পর স্কুল প্রাঙ্গণে বিউটি রানী পাল নীল রঙের শাড়ি পরে, কপালে টিপ দিয়ে হেঁটে হেঁটে, কিছুটা নাচের তালে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে কয়েক সেকেন্ডের একটি জনপ্রিয় গানের ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওটিতে নেতিবাচক মন্তব্য শুরু হলে সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে নারী ও নারী শিক্ষকেরা তাঁর পক্ষে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। বিউটি রানী পালের ভিডিওতে ব্যবহৃত গানটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। গানটি তিন দশকেরও বেশি আগে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এবং আজও সমানভাবে শ্রোতাপ্রিয়।

গানটি ‘ডিফারেন্ট টাচ’ ব্যান্ডের একটি সিগনেচার গানে পরিণত হয়েছে। এর গীতিকার ও সুরকার আসরাফ বাবু এবং কণ্ঠ দিয়েছেন ব্যান্ডশিল্পী মেজবাহ রহমান।

গানের স্মৃতিতে একটু পেছনে যেতেই হয়। আশির দশকের শেষের দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালে আমার সেজো বোনের পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। তখন নাম রাখার আলোচনা চলছিল। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো…’ গানটি থেকে ‘শ্রাবণ’ নামটি বেছে নিয়ে শেষ পর্যন্ত তার নাম রাখা হয় ‘শাওন’।

আমাদের বাসার প্রথম তলায় সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ভাই-বোন ও ভাগ্নেরা যে যার মতো গানের কলি গাইত। আমার কনিষ্ঠ ভাই গাইত— ‘জানালার পাশে চাপা মাধবী, বাগানবিলাসী হেনা দুলেছে।’

যাই হোক, একজন বাঙালি নারীর সৌন্দর্য তাঁর শাড়ি, টিপ এবং সর্বোপরি তাঁর সংস্কৃতিবোধে। গান মানুষের জীবনের স্পন্দন।

শিক্ষার প্রথম ধাপেই শিশুদের শেখানো হয়— বাংলাদেশ গানের দেশ, ধানের দেশ, নদীর দেশ। শিক্ষকের কাছ থেকে শিখতে শিখতেই শিশুরা একদিন বড় হয়ে ওঠে। সেই শিশুই একদিন শিক্ষক হয়। মাত্র তেরো মাস আগের কথা। রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলের শিক্ষিকা মেহেরিন চৌধুরী প্রিয় শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য। একজন মানুষ একদিনে শিক্ষক হয়ে ওঠেন না। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, “A good teacher is a good student.” একজন ভালো শিক্ষক হতে হলে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।

বিউটি রানী পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মাননাও অর্জন করেছেন। কোনো কাল্পনিক প্রদীপের ছোঁয়ায় নয়, বরং দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় ও যোগ্যতার মাধ্যমে তিনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। তিনি একজন আধুনিক রুচিসম্পন্ন, স্মার্ট নারী শিক্ষক।

২০০০ সালের কথা। আমি তখন কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করতাম, আর আমার বোন রেনু আপা ও ভাই নাজিম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। একদিন ক্লাস্টার ট্রেনিংয়ে তাঁরা আমাকে অতিথি হিসেবে নিয়ে গেলেন ময়মনসিংহ ডেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

দিনব্যাপী সেই প্রশিক্ষণে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিনোদন ও খাবারের আয়োজন। এ.টি.ও. স্যার ছিলেন প্রশিক্ষক। রেনু আপার গানের পালা এলে প্রথমে ভাবলাম, তিনি কীভাবে গাইবেন! কিন্তু তিনি চমৎকারভাবে গাইলেন— ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে…’

পরে এ.টি.ও. স্যার আসর জমিয়ে তুললেন। তিনি প্রথমে গাইলেন আব্দুল আলীমের বিখ্যাত গান ‘হলুদিয়া পাখি…’, এরপর গাইলেন ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে…’। তাঁর সুমধুর কণ্ঠে গান শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নাচ ও গান। সুতরাং বিউটি রানী পালকে কোনোভাবেই গান গাওয়ার কারণে হেয় প্রতিপন্ন করা যায় না।

গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, “সেখানে কোনো অশ্লীলতা নেই। শুধু গান গাওয়াকে আমি অন্যায় মনে করি না।”



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews