বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এখন আগস্ট মাসের ৫ তারিখ কেবল একটি সাধারণ পঞ্জিকার তারিখ নয়; এটি একটি নিপীড়িত-নিষ্পেষিত জাতির শৃঙ্খলমুক্তির স্মারক, ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার রক্তস্নাত অধ্যায় এবং চব্বিশের অদম্য ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয়ের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। বহু বছর ধরে চেপে বসা দুঃশাসন, বাকস্বাধীনতা হরণ, সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং স্বৈরাচারের রশি ছিঁড়ে সেদিন দেশের আপামর জনসাধারণ রাজপথে নেমে এসেছিল। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর অর্জিত সেই মহাবিজয়ের দিনটিই আজ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে আমাদের জাতীয় জীবনে প্রতিভাত। এই দিবসটি উদযাপন কেবল আনন্দের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অতীতকে গভীরভাবে অনুধাবন করা, বর্তমানের কঠোর বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নিজেদের সঠিক অবস্থান মেপে নেওয়া এবং ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যমুক্ত এক ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের সংকল্প পুনর্নবীকরণের মহাসন্ধিক্ষণ।
কোনো বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান রাতারাতি কিংবা শূন্য থেকে সংঘটিত হয় না। চব্বিশের জুলাই-আগস্টের এই ছাত্র-জনতার মহাজাগরণের পেছনে ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা বঞ্চনা, শোষণ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ। দেড় দশকের দুঃশাসনে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে একে একে পঙ্গু ও অকার্যকর করে ফেলা হয়েছিল। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণ নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোকে ব্যবহৃত করা হচ্ছিল স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর মসনদ টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে। দেশের অর্থনীতিকে এমন এক বৈষম্যমূলক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছিল, ব্যাংক খাতকে লুটপাট করে ফাঁপা বানিয়ে ফেলেছিল; আর অন্যদিকে সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছিল তরুণ ও যুবসমাজের আত্মমর্যাদায়। চাকরির বাজার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে যে কোটা, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির রাজত্ব গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ছিল দেশের লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রতি সরাসরি অবিচার। সরকারি চাকরিতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি তরুণদের মনে গভীর হতাশা ও প্রচ- ক্ষোভের জন্ম দেয়। মেধাবীদের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যখন বৈষম্যবিরোধী কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে আছড়ে পড়ল, রাষ্ট্র তখন ন্যায়সংগত সমাধানের পথ না খুঁজে বুলেটের ভাষা বেছে নিল। রংপুরের আবু সাঈদের বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া কিংবা চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম এবং ঢাকার মুগ্ধসহ আরো অনেকে অকাতরে জীবনদান প্রমাণ করলÑ ন্যায্য অধিকার ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ মৃত্যুকে ভয় পায় না। ছাত্র আন্দোলন দ্রুতই পরিণত হলো সর্বস্তরের গণমানুষের ‘একদফা’ গণদাবিতে, যার অনিবার্য পরিণতিতে ৫ আগস্ট দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত পতন ঘটে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মূল দর্শনই ছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক অধিকারের সুদৃঢ় দাবি। কিন্তু এই বৈষম্য কেবল চাকরির কোটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর ক্যানভাস ছিল সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থাজুড়ে। এটি ছিল রাজনৈতিক বৈষম্য ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম, যেখানে সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার ও বাকস্বাধীনতার গ্যারান্টি চেয়েছিল জনগণ। এটি ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অদম্য প্রতিরোধÑ মুষ্টিমেয় লুটেরা পুঁজিবাদীদের হাতে দেশের সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া এবং শ্রমজীবী মানুষের রক্ত পানি করা আয় শোষিত হওয়ার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদ। ধনী-দরিদ্র কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের চোখে সবার সমান ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার দাবিই ছিল এই অভ্যুত্থানের আসল প্রাণ। ৫ আগস্টের শিক্ষা আমাদের কঠোরভাবে স্মরণে এনে দেয় যে, যে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করা হয়, যে রাষ্ট্রে আইনি সুরক্ষা ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, সেই রাষ্ট্র বা ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কখনো টিকে থাকতে পারে না। বৈষম্য ও অন্যায়ের প্রাচীর ভেঙে তছনছ করাই ছিল চব্বিশের অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বার্তা।
জুলাই অভ্যুত্থানের সুবাদে বাংলাদেশ আজ ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ভোরের মুখোমুখি। তবে ইতিহাসের শিক্ষা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, কোনো বিপ্লব সম্পন্ন করা যত কঠিন, বিপ্লবের অর্জনকে সংহত করা এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। বর্তমানে আমাদের সামনে প্রধান দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হলো ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ধসে পড়া রাষ্ট্র কাঠামোকে পুনর্গঠন করা। বর্তমান জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার এবং দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর এখন এক আমানতস্বরূপ গুরুদায়িত্ব বর্তেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ঘুষখোরি ও দলীয়করণের কলঙ্কজনক সংস্কৃতি দূর করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই প্রশাসনিক অবকাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু গুরুতর শঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ এখনো দৃশ্যমান। দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা সম্পূর্ণ ফিরিয়ে এনে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি কাজ। পাশাপাশি, দেড় দশকের লুটপাটে জর্জরিত ব্যাংকিং খাত ও ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং চরম মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা, অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই স্পর্শকাতর সময়ে নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা এবং দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্তকারী চক্র সার্বক্ষণিক সক্রিয় রয়েছে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অর্জিত ঐক্য বিনষ্ট করতে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি আবার পুরোনো দিনের মতো সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ, ক্ষমতা দখল ও সংঘাতের রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে হাজারো শহীদ ও পঙ্গুত্ববরণকারী বীরদের আত্মত্যাগ চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।
অতএব, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের রূপরেখা প্রণয়নে। শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে হলে আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে মজবুত নীতি-নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড় করাতে হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নতুন করে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচার গড়ে তুলতে না পারে, তার স্থায়ী সাংবিধানিক ও আইনি নিশ্চায়ক তৈরি করা আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সংসদকে জনকল্যাণে কার্যকর করা এবং নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও শক্তিশালী সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে।
একই সঙ্গে কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে লুটেরা পুঁজিবাদ ধ্বংস করতে হবে, বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য কর্মসংস্থান, চিকিৎসা ও মানসম্মত শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে, দেশের বিপুল তরুণ ও যুবশক্তিকে কেবল ভোটের সংখ্যা হিসেবে না দেখে, তাদের সুশিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তিতে বলীয়ান করে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লবে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। স্বাধীনতার মূল চেতনাÑ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার, যেটি বিগত দেড় দশকে পদদলিত করা হয়েছিল, তাকে চব্বিশের অভ্যুত্থানের রক্তস্নাত অভিজ্ঞতার আলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই হবে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। রাষ্ট্র পরিচালনায় সাধারণ মানুষের মতামত, সামাজিক ন্যায় বিচার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের স্থায়ী ভিত্তি।
পাশাপাশি, ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে একটি পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র। কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা আধিপত্যবাদী শক্তি কিংবা বৈশ্বিক প্রেসক্রিপশনের কাছে নতজানু না হয়ে, সবার আগে বাংলাদেশ অর্থাৎ বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, দেশীয় সংস্কৃতি ও জনগণের আকাক্সক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই আমাদের বৈদেশিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ৫ আগস্ট আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক মহান সন্ধিক্ষণ ও পুনর্জাগরণের প্রতীক। চব্বিশের রক্তঝরা জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা তাদের বুকের তাজা রক্ত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে নতুন ইতিহাসের অধ্যায় লিখে গেছে, তা কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। রক্তে রঞ্জিত রাজপথ, শহীদদের নিষ্পাপ তাজা রক্ত আর হাজার হাজার আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী তরুণের চোখের পানি আমাদের কাঁধে এক বিশাল ঐতিহাসিক আমানত সঁপে দিয়েছে। আজকের দিনে আমাদের সবার স্পষ্ট ও দৃঢ় শপথ নেওয়া উচিত, ক্ষুদ্র রাজনৈতিক বিভেদ, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দলীয় সংকীর্ণতা ভুলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতেই হবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail : [email protected]