কানাডায় লাগামহীন খাদ্যমূল্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন একা বসবাসকারী মানুষজন। একই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খরচ ভাগাভাগি করার সুযোগ না থাকায় তাদের গ্রোসারি বিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনের তুলনায় বড় প্যাকেটে খাদ্যপণ্য কিনতে বাধ্য হওয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাবারও নষ্ট হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপের পাশাপাশি অপচয়ের বোঝাও বইতে হচ্ছে তাদের। সম্প্রতি ইন্টার্যাক্টের পক্ষে পরিচালিত এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র। সমীক্ষাটি পরিচালনা করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসন।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, কানাডার একজন সিঙ্গেল ব্যক্তি প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১০২ কানাডিয়ান ডলার গ্রোসারির পেছনে ব্যয় করছেন। অন্যদিকে একই বাসায় থাকা দম্পতিদের ক্ষেত্রে জনপ্রতি এই ব্যয় গড়ে প্রায় ৮০ ডলার। একাধিক ব্যক্তি একসঙ্গে বসবাস করলে বড় পরিমাণে খাদ্যপণ্য কিনে খরচ কমানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি অনেক খাদ্যসামগ্রী ভাগ করে ব্যবহার করায় অপচয়ও কমে। কিন্তু একা বসবাসকারীরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
- Advertisement -
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জন সিঙ্গেল কানাডিয়ানের মধ্যে আটজন জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় কমানোর মতো কার্যকর কোনো পথ তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, বাজারে অনেক খাদ্যপণ্য এমন পরিমাণে বিক্রি হয়, যা একজন মানুষের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। ছোট পরিমাণে পণ্য সহজে পাওয়া যায় না, ফলে অতিরিক্ত খাবার কিনতে বাধ্য হন তারা।
একক পরিবারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো খাদ্য অপচয়। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩২ শতাংশ সিঙ্গেল উত্তরদাতা জানিয়েছেন, অন্য কারও সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রায়ই সব খাবার শেষ করার আগেই তা নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি শুধু বেশি দাম দিয়েই খাবার কিনছেন না, সেই খাবারের একটি অংশ ব্যবহার না করেই ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে প্রকৃত ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যাংক অব কানাডার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যও এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে কানাডায় গ্রোসারির দাম বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ, যেখানে একই সময়ে অন্যান্য ভোক্তা পণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সার্বিক মূল্যস্ফীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সবচেয়ে বড় চাপ এখন খাদ্য খাতেই অনুভূত হচ্ছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে নিজেদের কেনাকাটার ধরনও বদলে ফেলছেন অনেক কানাডিয়ান। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা এখন আর প্রিমিয়াম মানের মাংস নিয়মিত কিনছেন না। অনেকেই সম্পূর্ণভাবে তা কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া প্রস্তুত করা খাবার এবং দামি ডেলি আইটেম কেনার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্যদিকে প্রতি ১০ জনের মধ্যে চারজন জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে তারা পরিচিত ব্র্যান্ডের পরিবর্তে তুলনামূলক কম দামের জেনেরিক বা নামবিহীন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনা শুরু করেছেন।
খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি শুধু একা বসবাসকারীদের জন্যই সমস্যা তৈরি করছে না। এর প্রভাব পড়ছে পারিবারিক সম্পর্কেও। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক দম্পতি জানিয়েছেন, গ্রোসারিতে কত টাকা ব্যয় করা উচিত, তা নিয়ে তাদের এবং সঙ্গীর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই চাপ বেশি স্পষ্ট। মিলেনিয়ালদের ৩৯ শতাংশ বলেছেন, খাদ্য ব্যয় তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে বেবি বুমারদের ক্ষেত্রে এই হার ১৭ শতাংশ। ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবারের বাজেট নিয়ে মতবিরোধ বাড়ছে এবং অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রেও নতুন করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
ইন্টার্যাক্টের উদ্যোগে পরিচালিত এই সমীক্ষাটি সম্পন্ন করেছে বারসন। চলতি বছরের ৮ থেকে ১২ মে পর্যন্ত কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলের ১,৫০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
সমীক্ষার ফলাফল ইঙ্গিত করছে, কানাডায় খাদ্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে একা বসবাসকারী মানুষের ওপর। বড় পরিমাণে কেনাকাটার সুবিধা না পাওয়া, খাবার অপচয়, সীমিত বিকল্প এবং মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক চাপ সব মিলিয়ে তাদের মাসিক ব্যয় দ্রুত বেড়ে চলেছে। একই সঙ্গে এই সংকট এখন শুধু ব্যক্তিগত অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি পারিবারিক সম্পর্ক, জীবনযাত্রার মান এবং ভোক্তাদের কেনাকাটার অভ্যাসেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনে দিচ্ছে।
- Advertisement -