প্রচলিত সিমবক্স ও গেটওয়ে প্রযুক্তির ওপর বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকার পরও অসাধু চক্রগুলো এখন সম্পূর্ণ নতুন অ্যাপ ও সফটওয়্যার-ভিত্তিক আইপি নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বিটিআরসির চোখে ধুলো দিয়ে বর্তমানে ওটিটি (ঙাবৎ-ঃযব-ঞড়ঢ়) অ্যাপের আড়ালে অবৈধ ভিওআইপি (ঠড়ওচ) কল টার্মিনেশন করা হচ্ছে। আর এর মাধ্যমে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। যদিও এটি একটি নতুন ও অত্যন্ত পরিশীলিত কৌশল বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা। আগে প্রচলিত পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল ধরার জন্য হাজার হাজার মোবাইল সিম ও ভারী সিমবক্স ব্যবহার করা

হতো, যা বিটিআরসির ট্র্যাকিং সিস্টেম সহজে শনাক্ত করতে পারত। কিন্তু অসাধু চক্রের অ্যাপভিত্তিক নতুন এই কৌশলে ভিন্নতা থাকায় সেটা সহজে ট্রাকিং করা যায় না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

ডিজিটাল মাস্কিং বা ছদ্মবেশী লোকাল কল : প্রচলিত গেটওয়ে বাইপাস করে আন্তর্জাতিক কলগুলোকে সাধারণ ইন্টারনেট ডেটা বা ওটিটি অ্যাপের (যেমন- কাস্টমাইজড কোনো মেসেজিং অ্যাপ) ট্রাফিক হিসেবে পাঠানো হয়। বিদেশ থেকে আসা কলটি গ্রাহকের ফোনে পৌঁছানোর সময় কোনো সাধারণ লোকাল নম্বর কিংবা ইন্টারনেট কল হিসেবে প্রদর্শিত হয়, ফলে মূল উৎস আড়ালে থেকে যায়। কল গ্রহণের পর লোকাল নম্বরটি কখনো কখনো প্রদর্শিত হয় আবার কখনো কখনো কয়েকটি সংখ্যা প্রদর্শিত হলেও ওই নম্বরে পরবর্তী সময়ে কারো কল গ্রহণ করতে সক্ষম হয় না বলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

সফটওয়্যার-ভিত্তিক সুইচ : চক্রগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ওটিটি অ্যাপ বা থার্ড-পার্টি ডায়ালার অ্যাপের ব্যাকগ্রাউন্ডে বিশেষ সফটওয়্যার-ভিত্তিক সুইচ (ঝড়ভঃংরিঃপয) ব্যবহার করছে, যা কোনো ফিজিক্যাল সিম বা ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই দূরবর্তী সার্ভার ও বিশেষায়িত সফটওয়্যার সুইচের মাধ্যমে কল রাউট করা সম্ভব হচ্ছে।

ইন্টারনেট প্রোটোকল (ওচ) কল রাউটিং : আন্তর্জাতিক কলগুলোকে সাধারণ সেলুলার নেটওয়ার্কে না পাঠিয়ে সরাসরি ডেটা বা ইন্টারনেট প্রোটোকল ব্যবহার করে রাউট করা হচ্ছে। আইপি হাইডিং (ভিপিএন ও প্রক্সি): কল টার্মিনেশনের মূল আইপি ঠিকানা গোপন রাখতে উচ্চক্ষমতার প্রক্সি ও ভিপিএন টানেল ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সীমান্তবর্তী রেডিওলিংক : অনেক ক্ষেত্রে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা সীমান্ত এলাকায় হাই-ফ্রিকোয়েন্সি রেডিওলিংক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির বাইরে এই নেটওয়ার্ক চালানো হয়।

ভার্চুয়াল ও ক্লাউড প্রযুক্তি : এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বাড়িতে বড় সার্ভার বা সিমবক্স রাখার প্রয়োজন পড়ছে না; ক্লাউড হোস্টিং ও উন্নত এনক্রিপশন ব্যবহার করে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে।

দেশের ক্ষতি ও রাজস্বের ওপর প্রভাব

বিপুল অর্থনৈতিক লোকসান : অবৈধ এই আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশনের কারণে সরকার প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈধ বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব হারাচ্ছে। বৈধ অপারেটরদের লোকসান : লাইসেন্সধারী ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (ওএড) এবং মোবাইল অপারেটররা তাদের প্রাপ্য ট্রাফিক ও আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি : অ্যাপ ও আইপি-ভিত্তিক এই বেনামি যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অপরাধী বা দুষ্কৃতকারীদের ট্র্যাকিং করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

আইজিডব্লিউ বাইপাস : আন্তর্জাতিক গেটওয়ে সম্পূর্ণ বাইপাস হওয়ায় সরকার প্রতি মিনিটে নির্ধারিত টার্মিনেশন চার্জ হারাচ্ছে। হুন্ডি ও অর্থ পাচার : ওটিটি অ্যাপের মাধ্যমে আসা কলের পেমেন্ট বা রিচার্জের টাকা বিদেশে অবৈধ হুন্ডি চ্যানেলে লেনদেন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিটিআরসির চোখ ফাঁকি দেয়ার কারণ

বিটিআরসি নিয়মিতভাবে কল ডিটেইলস রেকর্ড (ঈউজ) এবং ট্রাফিক প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে অবৈধ কল শনাক্ত করে। তবে ওটিটি বা অ্যাপের ডেটা ট্রাফিকের আড়ালে এই অবৈধ ভিওআইপি কলগুলো চলায় তা সাধারণ ইন্টারনেট ব্রাউজিং বা মেসেজিং ট্রাফিকের মতো দেখায়। ফলে সাধারণ নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে এই কলগুলোর আসল উদ্দেশ্য ও উৎস ধরা বিটিআরসির জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ

নতুন প্রযুক্তির মোকাবেলায় বিটিআরসি তাদের নজরদারি ব্যবস্থার লজিক ও প্রযুক্তি নিয়মিত আপডেট করছে। বিটিআরসি এবং র‌্যাব যৌথভাবে বিভিন্ন গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সিম কার্ড, অবৈধ আইপি গেটওয়ে এবং উন্নত সফটওয়্যার সরঞ্জাম জব্দ করছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ও অবৈধ ভিওআইপি কলিং কার্ড ও সরঞ্জাম কেনাবেচা এবং অবৈধ অ্যাপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে কঠোর আইনি হুঁশিয়ারি জারি করা হয়েছে। তা ছাড়া বিটিআরসি ও ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার এখন উন্নত ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন এবং ট্রাফিক অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে ওটিটি-মাস্ক কল শনাক্তের চেষ্টাও করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিশেষজ্ঞ মত

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইটি বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. ফজলুল করিম পাটোয়ারী মনে করেন- দিন যত যাচ্ছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তত হচ্ছে, অসাধু চক্রগুলোও অপরাধ করার ক্ষেত্রে তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। আগে অবৈধ ভিওআইপি কলে মোবাইল সিম ও ভারী সিমবক্স ব্যবহার করা হতো এখন অ্যাপভিত্তিক প্রতারণা চলছে। বিদেশ থেকে ভিওআইপি কলগুলো যখন ওটিটি অ্যাপের মাধ্যমে (যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, ইমু, ভাইবার, সিগন্যাল, ডিসক্রিট ইত্যাদি) প্রবেশ করে তখন বিটিআরসির পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বলা চলে বিটিআরসি এক্ষেত্রে অসহায় হয়ে আছে। তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর ওটিটি অ্যাপের মাধ্যমে অবৈধ ভিওআইপি কলে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এই রাজস্ব যদিও ফিরে আসবে না। তবে রাজস্ব যাতে ভবিষ্যতে হাতছাড়া না হয় সেজন্য ওটিটি অ্যাপগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে- সৌদি আরবে হোয়াটসঅ্যাপ চালু আছে কিন্তু ভিডিও এবং ভয়েস চালু নাই। যদিও সেখানকার মানুষ বিকল্প হিসেবে ইমু, ভাইবার ব্যবহার করছে। এখানেও সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রথমত: ওটিটি অ্যাপগুলোতে বিদেশী আইপি সংবলিত কল বিটিআরসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিদেশী কল যদি আসে সেখানে বিটিআরসি নিজেরাই ভিওআইপি করে পাঠাতে পারে। দ্বিতীয়ত: রাজস্ব আদায় পুশিয়ে নিতে চাইলে বিটিআরসি ব্যান্ডউইথকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। ইন্টারনেট প্রোভাইডাররা শেয়ার ব্যান্ডউইথের নামে ডেটার ব্যবহার হিসাব করে কয়েক গুণ বেশি আয় করছে। সেখানে বিটিআরসি ব্যান্ডউইথ বিক্রির পাশাপাশি মোট ব্যবহারের উপর রাজস্ব আদায় করতে পারে। ড. পাটোয়ারী বলেন, যাইহোক প্রযুক্তির এই নিত্যনতুন পরিবর্তনের সাথে সাথে বিটিআরসিকে তাদের মনিটরিং সিস্টেম আরো বেশি সফটওয়্যার কেন্দ্রিক ও এআই চালিত হতে হবে, যাতে কোনো চক্র অ্যাপের আড়ালে ডেটা ট্রাফিকের ছদ্মবেশে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার কৌশল কার্যকর করতে না পারে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews