গত বছরই টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের প্রায় সব রেকর্ড নতুন করে লিখেছে বাংলাদেশ। এক পঞ্জিকাবর্ষে সবচেয়ে বেশি জয়, ছক্কা, স্ট্রাইক রেট, বোলিংয়ে উইকেট- সবই বাংলাদেশ করেছে ২০২৫ সালে। এই সংস্করণে ভিন্ন ধাঁচের ক্রিকেট খেলার শুরুটাও ওখান থেকেই। যে সংস্করণটার সঙ্গে আগের সময়ে প্রতিপক্ষের সেভাবে পাল্লা দিতে পারেনি তারা, সেখানেই তারা গত বছর জিতেছে টানা চার সিরিজ। শ্রীলঙ্কাকে দিয়ে শুরু মাঝে পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস ও সর্বশেষ আয়ারল্যান্ড। শেষ দুটি আবার এই চট্টগ্রামেই। মাঝে একটি টি- টোয়েন্টি বিশ^কাপ না খেলতে পারার যন্ত্রণা কাটিয়ে দীর্ঘ ৫ মাস পর বন্দরনগরীতে নেমেই এই সংস্করণে উড়ন্ত শুরু করেছে ফিল সিমন্সের শিষ্যরা।
গতপরশু রাতে চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথমটিতে নিউজিল্যান্ডকে ৬ উইকেটে উড়িয়ে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে লিটন দাসের দল। আজ একই ভেন্যুতে আছে সিরিজ নিশ্চিতের সুযোগ। সবকিছু ঠিক থাকলে দ্বিতীয় ম্যাচটি শুরু হবে বেলা ২টায়। ‘সবকিছু ঠিক’ থাকার প্রশ্নটা আসছে গত ম্যাচের রাত থেকেই চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় অধিকাংশ স্থানেই অঝোর ধারায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এই বৃষ্টির কারণে গতকাল পূর্ব নির্ধারিত ঐচ্ছিক অনুশীলনও করতে পারেনি সিরিজে ফিরতে মরিয়া নিউজিল্যান্ড দল। হোটলবন্দীই কেটেছে দু’দলের ক্রিকেটারদের। বৃষ্টির সম্ভাবনা যে আছে আজও।
তবে ক্রিকেটের ব্যকরণে টি-টোয়েন্টিতে আগের ফিকে হয়ে যাওয়া সম্মান ফিরে পেতে শুরু করেছে এই সংস্করণে এক ‘নতুন’ বাংলাদেশ। গত বছরের শুরু থেকেই তানজিদ হাসান তামিম-পারভেজ হোসেন ইমনরা দলের একরকম মেরুদ- হয়ে উঠেছেন। তাওহীদ হৃদয়-শামীম হোসেনরাও নিজেদের চেনাচ্ছেন নতুন করে। বোলিংটা তো এখন সব সংস্করণেই বাংলাদেশের জন্য ত্রাতা। নতুন ধাঁচের সেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ পরের ধাপে পৌঁছানোর মিশনটাও শুরু কওে দিয়েছে আরেকটি বিশ^কাপকে সামনে রেখে। ঘরের মাঠে রেকর্ড ১৮২ রান তাড়া করে জিতেছে। কিন্তু শুধু তো আর সংখ্যার বিচারে সব হয় না, বাংলাদেশ যেভাবে ম্যাচটা জিতেছে, তা-ও তো মুখ্য। নিউজিল্যান্ড এই সিরিজে দ্বিতীয় সারির দল পাঠিয়েছে, তা ঠিক। কিন্তু তাদের বিপক্ষেও পাওয়ারপ্লের বাইরের ৮ ওভারে ওভারপ্রতি দশের বেশি রান তোলা যেকোনো মানদ-েই ভালো। ৭৭ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর তা সম্ভব হয়েছে চাপের মুখে দাঁড়িয়েও হৃদয়-পারভেজদের প্রতি-আক্রমণের কারণে। ২৮ বলে ৫৭ রানের ঝোড়ো জুটি গড়ে দলকে জয়ের পথে তোলেন পারভেজ হোসেন ইমন ও হৃদয়। পারভেজ আউট হলেও হাফসেঞ্চুরি করে জয় নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়েন হৃদয়। নিজের পরিকল্পনা জানাতে গিয়ে বললেন, ‘পরিকল্পনা ছিল আমি আক্রমণ করব। কারণ, আমি যদি তা না করি, দলের জন্য কঠিন হয়ে যেত। চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে।’
যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই হোক না কেন, সাধারণত এভাবে ঘুরে দাঁড়াতে খুব একটা দেখা যায় না বাংলাদেশকে। টি-টোয়েন্টিতে বদলে যাওয়া দলটা কি এখন পরের ধাপে যাওয়ার চেষ্টায় আছে? প্রশ্নটা করা হয়েছিল প্রথম টি-টোয়েন্টির ম্যাচসেরা তাওহীদ হৃদয়কে। উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘ভালোর তো শেষ নেই। সবাই সবার জায়গা থেকে যতটুকু ভালো করা যায়, সব সময় চেষ্টা করে। অনেক দিন ধরে সবাই একসঙ্গে খেলছি। বোঝাপড়া অনেক ভালো আছে প্রতিটা খেলোয়াড়ের। আমার কাছে যেটা ইতিবাচক মনে হয়েছে যে আমরা চাপটা নিইনি।’ টপ অর্ডারের ব্যর্থতার পর এই তিনজনের ইনিংসেই রেকর্ড রান তাড়া সম্ভব হয়েছে। সতীর্থদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হৃদয় মনে করিয়ে দিলেন, ‘৫-৬ নম্বর এমন জায়গা, এখানে হঠাৎ এক-দুই দিন ফিফটি হবে। কিন্তু শামীম ও ইমনের ইনিংসটা আমার কাছে ফিফটির চেয়েও বড় মনে হয়েছে। আসলেই ইমপ্যাক্টফুল ইনিংস কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমাদের বুঝতে হবে।’
নিজে ফিফটি করেছেন, ম্যাচ জিতিয়েছেন। আনন্দটা তার জন্য একটু বাড়তি হলেও দায়িত্ববোধই বড় হয়ে উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘এটা তো ক্রিকেট। একদিন পাওয়ারপ্লে ভালো হবে, একদিন মিডল অর্ডার খারাপ হবে। যেদিন ওপরে রান আসবে না, সেদিন মিডল অর্ডারের দায়িত্ব বেড়ে যায়। আবার যেদিন ওপরে ভালো হয়, সেদিনও দায়িত্ব থাকে। দলীয় খেলায় সবাই নিয়মিত ভালো করবে না, এটাই স্বাভাবিক।’ হৃদয় মনে করেন, এ রকম পরিস্থিতি থেকে যত তারা ম্যাচ জেতাবেন, দলের আত্মবিশ্বাসও ততই বাড়বে তাতে, ‘এ রকম ম্যাচ যদি আমরা না জেতাতে পারি, তাহলে তো এটা আমাদের জন্য এটা ভালো সাইন না। এগুলোতে ব্যাটসম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিতে হবে।’
তা হৃদয়রা পেরেছেনও। বছরের প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলতে নেমে তারা দিয়েছেন লম্বা পথে হোঁচট না খেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। আজ সিরিজ নিশ্চিত হলে সে পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।