শশধর দত্তের সেই কালজয়ী ‘দস্যু মোহন’ সিরিজের ভৃত্য বিলাসের কথা মনে আছে? যার কাছে সময় জিজ্ঞাসা করলে সে ঘড়ির দিকে একটা আড়চোখে তাকিয়ে ঘোৎ করে শব্দ করে বিজ্ঞের মতো গম্ভীর স্বরে উত্তর দিত, ‘তা কত্তা, ১০টা ২টা হবে!’
বিলাসের সেই উত্তর শুনে মোহন তো বটেই, পাঠকরাও ভুরু কুঁচকে ভাবতেন, সময়টা আসলে ঠিক কত? ১০টা নাকি ২টা? আজ ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত মার্চে এসে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বসে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরান, ভেনিজুয়েলা বা কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছক কষছেন, তখন সেই বিলাসের ছায়াই যেন দীর্ঘতর হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও থেকে শুরু করে সামরিক উপদেষ্টা—সবার কথাতেই সেই ‘১০টা ২টা’র সুর। লক্ষ্যটা আসলে কী? শাসন বদল নাকি শুধু স্বভাব বদল? এই ধোঁয়াশার ভেতর দিয়েই শুরু হচ্ছে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক থ্রিলার।
আকাশ যখন আগুনের বৃষ্টি: এক নাটকীয় সূচনা
দৃশ্যপটটি কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। গত শনিবারের সেই নিঝুম রাতে তেহরানের আকাশ চিরে ধেয়ে এলো ইসরাইলি আর মার্কিন বোমারু বিমানের ঝাঁক। যে আকাশ থেকে শান্তির বার্তা ঝরার কথা ছিল, সেখান থেকে ঝরল আগুনের বৃষ্টি। সেই প্রলয়ঙ্করী আঘাতে প্রাণ হারালেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা আলি খামেনেয়ীসহ ডজন ডজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। এই দৃশ্য দেখে পৃথিবীর যেকোনো কোণ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক, দস্যু মোহনের সেই দুর্ধর্ষ অভিযানের মতো ট্রাম্পও বুঝি এবার তেহরানের সিংহাসনটা সমূলে উপড়ে ফেলবেন। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সেই মার্কিন বিরোধী কঠোর শাসনব্যবস্থা কি তবে চিরতরে মুছে যাচ্ছে?
কিন্তু না, এখানেই আসল টুইস্ট। পলিটিকোর প্রবীণ সংবাদদাতা নাহাল টুসীর বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের এই অভিযানে এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চাল রয়েছে। একদিকে রক্তের বন্যা, অন্যদিকে আলোচনার টেবিল। ট্রাম্প আসলে শাসন বদলের চেয়ে ‘স্বভাব বদলানো’ বা বিহেভিয়ার চেঞ্জ করতেই বেশি আগ্রহী।
ঝানু পুলিশ বনাম ছদ্মবেশী মোহন: স্বভাব বদলানোর খেলা
দস্যু মোহনের গল্পে আমরা দেখতাম, পুলিশের ঝানু কর্তারা সবসময় তার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকতেন। তারা ভাবতেন মোহনকে জালে পুরে ফেলেছেন, কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে মোহন এমন এক ছদ্মবেশ ধরতেন যে পুলিশের গোয়েন্দারা বোকা বনে যেতেন। ট্রাম্পের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিও ঠিক সেই ছদ্মবেশের মতো। তিনি কোনো আদর্শবাদী নেতা নন যে পৃথিবীতে গণতন্ত্রের চারা রোপণ করবেন। তিনি একজন জাঁদরেল ডিল-মেকার।
হোয়াইট হাউসের এক ঝানু আমলা নাম গোপন রাখার শর্তে স্বীকার করেছেন, আমাদের সংস্করণে রেজ্যিম চেঞ্জ মানেই হলো আসলে তাদের স্বভাব বদলে দেয়া। ইরাক আর আফগানিস্তানে দেশ গড়তে গিয়ে আমেরিকা যে বিপুল টাকা আর সৈন্য হারিয়েছে, ট্রাম্প আর সেই চোরাবালিতে পা দিতে রাজি নন। তার কাছে একটা শাসনব্যবস্থা হলো একটা পুরোনো জীর্ণ বাড়ির মতো। তিনি পুরো বাড়িটা ধূলিসাৎ না করে শুধু তার বিগড়ে যাওয়া মালিকদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চান, যাতে পরের বাসিন্দারা আমেরিকার শর্ত মেনে চলে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ঝানু বিশ্লেষক আলী ওয়ায়েজের ভাষায় এটি হলো ‘রেজ্যিম ট্রান্সফরমেশন’। ভায়েজ বলছেন, ট্রাম্প চান না পুরো রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়ুক। কারণ তাতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে তা সামলানোর দায়ভার আমেরিকা নিতে পারবে না। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য খুব পরিষ্কার, ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির কারখানা আর ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রামগুলো যেন জঞ্জালের মতো সাফ হয়ে যায়। আর তেহরান যেন প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধ করে আমেরিকার বাধ্য ছেলের মতো বসে থাকে। এর জন্য যদি পুরোনো সিস্টেমের কারো সাথেই হাত মেলাতে হয়, ট্রাম্পের তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। অথচ ইরানের লড়াকু নেতা আলি লারিজানি এখনো হুঙ্কার দিচ্ছেন যে তারা আমেরিকার সামনে নতজানু হবে না।
ভেনিজুয়েলার ডেলসি ম্যাজিক আর তেলের খেলা
ইরানে যখন রক্তের হোলি খেলা চলছে, তখন ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্প দেখিয়েছেন দস্যু মোহনের সেই ‘ইজি উইন’ বা সহজ জয়ের জাদু। এক ঝটিকা অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে পাকড়াও করে সোজা নিউইয়র্কে উড়িয়ে আনা হয়েছে। অপরাধ? ড্রাগ স্মাগলিং বা মাদক পাচার। মাদুরো নেই তো কী হয়েছে? তার অনুসারী ডেলসি রদ্রিগেজ এখন হোয়াইট হাউসের নতুন প্রিয়পাত্র। ট্রাম্প তো তার স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ভেনিজুয়েলাকে ‘নতুন বন্ধু’ বলে পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন। ডেলসি এখন ট্রাম্পের কথামতো তেলের খনিগুলো খুলে দিচ্ছেন, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিচ্ছেন। অর্থাৎ মাদুরো শাসনের কঙ্কালটা টিকে আছে ঠিকই, শুধু তাদের চলন-বলন বা স্বভাবটা বদলে গেছে। ট্রাম্পের কাছে একনায়কতন্ত্র কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো যখন সেই একনায়ক আমেরিকার তেল বা স্বার্থে বাধা দেয়।
কিউবার কিস্তিমাত: তলোয়ার নয়, টাকা
কিউবার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের রণকৌশল আবার একদম আলাদা। সেখানে তিনি গানপাউডার খরচ করছেন না, বরং ব্যবহার করছেন ‘ইকোনমিক সোর্ড’ বা অর্থনৈতিক তলোয়ার। কিউবার কমিউনিস্ট শাসন এখন ভেনিজুয়েলা বা ইরানের তেলের অভাবে ধুঁকছে। ট্রাম্প একে বলছেন- ফ্রেন্ডলি টেকওভার। অর্থাৎ বন্ধুত্বপূর্ণ এক গ্রাস। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যিনি একসময় কিউবার শাসন উপড়ে ফেলার জন্য পাগল ছিলেন তিনিও এখন বিলাসের মতোই সুর বদলে বলছেন— কিউবাকে একবারে বদলানোর দরকার নেই। আগে তারা অর্থনীতিটা বেসরকারীকরণ করুক, আমাদের বিনিয়োগ মেনে নিক, ব্যস! তাতেই ট্রাম্পের কেল্লাফতে। কিউবার মানুষ হয়তো এখনো পরাধীন, কিন্তু ট্রাম্পের লাভ হলো কিউবা এখন আর আমেরিকার শত্রু নয়।
সেই ‘১০টা ২টা’র ফাঁদ: একটি অনিশ্চিত উপসংহার
গল্পের শেষে এসে প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়। আকাশ থেকে ঝরে পড়া আগুনের গোলাগুলো কি সত্যিই শান্তি আনবে? দস্যু মোহনের গল্পে পুলিশের ঝানু কর্মকর্তারা যেমন মোহনের আসল পরিচয় উদ্ধার করতে না পেরে ধন্দে পড়ে যেতেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল রাজনীতিতেও ট্রাম্প হয়তো এক অজানা ফাঁদে পা দিচ্ছেন। খামেনেয়ীকে হত্যার পর ইরান হয়তো বাহ্যিকভাবে খানিকটা নাজুক হয়েছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা কি কোনো মরণ কামড় দেয়ার পরিকল্পনা করছে?
ইরানের সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর যদি কোনো বিকল্প সুস্থ নেতৃত্ব না জন্মায় তবে দেশটি সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানা হয়ে উঠতে পারে। অথবা ইরানের সেনাবাহিনী যদি পুরো ক্ষমতা দখল করে আরো বড় একনায়কতন্ত্র কায়েম করে, তবে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা আবারো হুমকিতে পড়বে। যে নাটকীয় আগুনের ফুলকি দিয়ে যুদ্ধের শুরু হয়েছিল, সেই আগুনের লেলিহান শিখাই এখন পুরো বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করছে।
ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন তিনি একাই সব কলকাঠি নাড়ছেন, কিন্তু ইতিহাসের ঝানু গোয়েন্দারা সবসময় ওঁৎ পেতে থাকে। শেষমেশ সেই বিলাসের কথাই ফিরে ফিরে আসে। সময় জানতে চাইলে যেমন সে ১০টা আর ২টার মাঝখানে আমাদের ঝুলিয়ে রাখত, ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্রনীতিও বিশ্ববাসীকে এক অনিশ্চিত জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটি কি গণতন্ত্রের জয় নাকি এক নতুন ধরনের সাম্রাজ্যবাদী দাদাগিরি? দিনশেষে বিলাস হয়তো তার ভাঙা ঘড়িতে দম দিয়ে আবারো সেই রহস্যময় হাসি হেসে বলবে— ‘তা কত্তা, পতনটা কি ১০টায় হবে নাকি ২টায়?’ এই প্রশ্নের উত্তর ট্রাম্প নিজেও জানেন কি না, তা নিয়ে খোদ হোয়াইট হাউসেই এখন ফিসফাস চলছে। আর পৃথিবী রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে, দস্যু মোহন কি শেষ পর্যন্ত ধরা দেবেন নাকি এক নতুন ছদ্মবেশে আরো বড় কোনো প্রলয় ঘটিয়ে দেবেন?