মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও এলএনজি আমদানিতে বাড়তি খরচ হবে। বাজেটের আগেই সমন্বয় করতে হবে এই খরচ। এতে লেনদেন ভারসাম্যে বড় ধরনের চাপ পড়বে। ফলে বাজেটে অর্থসংস্থান বাড়াতে কর ছাড় কমানো এবং করের আওতা বাড়তে হবে। পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা জরুরি। মঙ্গলবার ধানমন্ডিতে সিপিডির সম্মেলন কক্ষে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত শুধু বাজারদর বা সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না। বরং তা ক্রমেই ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এতে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য কাঠামোর ভেতরেও বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

তার মতে, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুসারে আয় বাড়াতে সম্পদের ওপর কর আরোপ করতে হবে। ব্রিফিংয়ের বিষয় ছিল-‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা’। তার মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের সুপারিশ নতুন সরকারকে পর্যালোচনা করতে হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে রাশিয়ার মতো দেশ থেকে সস্তায় তেল আমদানি করতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত কেবল বাজারদর বা সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ক্রমেই তা ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। ড. দেবপ্রিয় বলেন, দেশের অন্যতম সমস্যা কর আদায় কম। কর সংগ্রহে অনিয়মের কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা ও করদাতারা লাভবান হন। কিন্তু সরকার ঠকছে। এনবিআর কর্মকর্তাদের বড় সমস্যা হলো তারা তাদের হাতে থাকা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছাড়তে চান না। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবস্থায় গেলে এই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ফলে তারা ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনাগ্রহী। তিনি বলেন, করদাতাদের অভিযোগ-ইন্সপেক্টর বা কমিশনাররা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। এর ফলে কর আদায় যতটুকু কম হয়, আমরা জানি তা তিন ভাগ হয়। করযোগ্য যে আয় আছে তার এক-তৃতীয়াংশ যায় যারা আদায় করেন তাদের কাছে। একাংশ যায় সরকারের কাছে। বাকি একাংশ যার দেওয়ার কথা তিনি দেন না। সবাই লাভ নিয়ে বের হয়ে যায়। ঠকে যায় সরকার।

পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর ওপর জোর দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, চুরি করা টাকা ফেরত আনতে হবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে হবে। ছোট অঙ্কের টাকা ফিরছে, কিন্তু বড় অঙ্কের টাকা কেন আসছে না? তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামষ্টিক অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি। দেশের আর্থিক সক্ষমতা, ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা ও বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতির অবস্থা পরিষ্কারভাবে নিরূপণ না করে জ্বালানি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভুল পথে যেতে পারে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় যদি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সমন্বয়ের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সরকার বলেছে পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো এক দেশের মুখাপেক্ষী থাকা হবে না। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির কারণে যেন অন্য কোনো দেশ থেকে তেল ও জ্বালানি আমদানিতে কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির ভাষায় সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু এমন আইনি অনিশ্চয়তা সেখানে আছে, যার ফলে রাশিয়ার মতো দেশ থেকে তুলনামূলক সস্তা তেল আমদানি করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ছাড় নেওয়া পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত কেবল বাজারদর বা সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে না। বরং তা ক্রমেই ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ‘ফুড, ফুয়েল ও ফার্টিলাইজার’ অর্থাৎ খাদ্য, জ্বালানি ও সারের ওপর। এই তিন ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণে আমদানি করতে হয়। ফলে এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এবারের বাজেট যেন গতানুগতিক না হয়। সেজন্য প্রকল্প যাচাই-বাছাই করতে হবে। দেশে এমন অনেক প্রকল্প আছে, যেগুলো ১০ বছর ধরে চলছে। এসব প্রকল্প টিকিয়ে রাখার জন্য দেখা যায়, প্রতি বছর কিছু অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকে ‘সুইটহার্ট ডিল’ বলা হয়। যেসব প্রকল্প এভাবে বছরের পর বছর ধরে চলছে, সেগুলোকে ‘জম্বি প্রকল্প’ বলা হয়। এর মাহাত্ম্য হলো-এসব প্রকল্প শেষ করতে চাইলেও শেষ করা যায় না। অর্থাৎ মারতে চাইলেও মারা যায় না। সরকারি ব্যয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাহিদা বাড়বে। তাই ভর্তুকির মধ্যে অদক্ষ ও অন্যায্য খাতগুলো চিহ্নিত করে তা পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। পাশাপাশি ধাপে ধাপে নগদ প্রণোদনা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। বাজেটে বিপুল পরিমাণে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই ভর্তুকি কে পাচ্ছে, তা নিশ্চিত করা দরকার। যে প্রণোদনা দেওয়া হয়, তার একাংশ কৃষকরা পাচ্ছেন। তবে সব ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী নির্ধারণ ঠিক হয় না। বর্তমান বিএনপি সরকার নির্বাচনি অঙ্গীকারে বাজেটে বিভিন্ন ধরনের ছাড় তুলে নেওয়ার কথা বলেছে। সেই সঙ্গে তারা সম্পদে করারোপ করে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কথা বলেছে। এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।

দেবপ্রিয় বলেন, আমলাদের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার গতানুগতিক বাজেট থেকে বেরোতে পারেনি। এখন নির্বাচিত সরকার তা পারে কি না, সেটা দেখার বিষয়। তিনি রাজস্ব আয়ে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা না দেওয়ার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে করের আওতা বাড়িয়ে করহার কমাতে হবে। সেই সঙ্গে শুধু আয়ের ওপর করারোপ করলেই হবে না, সম্পদের ওপরও কর আরোপ করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক শক্তি না থাকায় এক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রথম বছরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম বছরে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে শেষ বছরে তা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন পে-স্কেলের দাবি আছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এটি করে গেছে। যেটি নিজে করতে পারেনি, সেটি অন্যের জন্য রেখে গেছে। বিগত সরকার অনেক কিছু এই সরকারের ওপর প্রলম্বিত দায় দিয়ে গেছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বর্তমান সরকারের উচিত, নিজের মতো করে নতুন করে কমিশন করে এটি পুনর্বিবেচনা করা। এক্ষেত্রে আগের বেতন কমিশনের প্রতিবেদন একটি উপাদান হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রশ্নহীনভাবে প্রস্তাবিত বেতন বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এরপরও বিবেচনা করে একটি যৌক্তিক জায়গায় আনতে হবে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কতটা বাড়ল, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। বেতন বাড়লে পেনশনও বাড়ে। তবে পেনশনে খরচ কতটা বাড়ল, তা নিয়ে আলোচনা হয় না। প্রকৃতপক্ষে বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সরকারের ক্রমাগত ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি লুকানো থাকে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews