বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তিগুলোর একটি হলো নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ। বিদ্যুৎ আজ আর কেবল আলো জ্বালানোর মাধ্যম নয়, এটি শিল্প, কৃষি সেচ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের প্রাণভোমরা। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে দ্রুতগতিতে। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি মিশ্রণ, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মিলিয়ে খাতটি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। এই বাস্তবতা মোকাবিলায় সরকার ২০৩০ সাল লক্ষ্য ধরে একটি সুস্পষ্ট রূপান্তরের পথে হাঁটছে - যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেবল বিকল্প নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৭ (সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতকরণ) অর্জনের সঙ্গেও এই যাত্রা নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এখানে দেশের বিদ্যুৎ খাতের সামনে থাকা মূল চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় সরকার নানা পদক্ষেপ, হাতে নিয়েছে বিশেষ করে নরায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
বিদ্যুৎখাতের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো অবকাঠামো জুড়ে বিস্তৃত। সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি (এপিএসসিএল), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লি এবং আরও কয়েকটি সংস্থা বেসলোড, কয়লা, গ্যাস, ও সরকারি সৌর প্রকল্প পরিচালনা করে। এর পাশাপাশি রয়েছে স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তথা আইপিপি, যারা বিপিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় কাজ করে। সঞ্চালন লাইনে জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারণ ও আন্তঃসংযোগের দায়িত্বে আছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি, আর মিটারিং, স্কাডা ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে বিপিডিবি, আরইবি, ডেসকো, ডিপিডিসিসহ কয়েকটি বিতরণ কোম্পানি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নীতি প্রণয়ন ও পর্যবেক্ষণ দায়িত্ব পালন করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। এত বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখাই বড়ো চ্যালেঞ্জে।
দেশের বিদ্যুৎ খাত আজ যেসব বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তা মূলত তিনভাগে উল্লেখ করা যায়। প্রথমত, জমি, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত জটিলতা। বড়ো আকারের সৌর বা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত জমির সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা; জনবহুল ও কৃষিনির্ভর এই দেশে কৃষিজমি রক্ষা করে প্রকল্প স্থাপনের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকল্পের উচ্চ প্রাথমিক ব্যয় এবং সাশ্রয়ী দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমিত সুযোগ: বিশেষত বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক হারে ঋণ পাওয়া এখনও কঠিন। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও নানা স্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব ঘটায়, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয়ত: গ্রিড অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। পরিবর্তনশীল প্রকৃতির নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ: বিশেষত সৌর ও বায়ু: নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রিডে সংযুক্ত করতে হলে গ্রিডের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো জরুরি। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে গ্রিডে যে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়, তা সামলাতে নির্ভরযোগ্য লোড ব্যালান্সিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। এ জন্য নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম-এর সম্প্রসারণ প্রয়োজন, অথচ দেশীয়ভাবে সৌর যন্ত্রাংশ, ইনভার্টার ও স্টোরেজ প্রযুক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা এখনও সীমিত থাকায় আমদানি-নির্ভরতা থেকেই যাচ্ছে। সবে সুখবর হলো, এখাতে অধিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সরকার নুতন বাজেটে এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য শুল্ক সুবিধা ঘোষণা করেছে।
তৃতীয়ত: দুর্বল বাজার কাঠামো, গবেষণা ও প্রকৌশলগত উপাত্তঘাটতি ও দক্ষ জনশক্তির অভাব। মানসম্মত পরীক্ষণ ও সনদায়ন সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি-সম্পদ উপাত্ত এবং প্রযুক্তি-কার্যকারিতার নির্ভরযোগ্য উপাত্তভা-ারের অভাবও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। গ্রিড ইন্টিগ্রেশন, স্টোরেজ ও উন্নত নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবলের ঘাটতিও অগ্রগতির গতি শ্লথ করে। এর সাথে অপর্যাপ্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব একে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। তাছাড়া, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎখাতের বাস্তবতা মাথায় রেখেই সরকার প্রণয়ন করেছে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র, যা জনমত গ্রহণ এবং একত্রিশটি মন্ত্রণালয়, সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও বিনিয়োগকারী সংগঠনের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হয়েছে। কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করা এবং কার্যকর চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অন্তত ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য অর্জিত হলে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে, বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক ভর্তুকির চাপ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও তা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। উল্লেখযোগ্য যে, এসডিজি অভীষ্ট-৭ বাস্তবায়নের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, দেশে ইতোমধ্যে ইনস্টলড নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা ১,৮১৭.৯ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা আগামী বছরগুলোর লক্ষ্যপূরণের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
বর্তমানে অনগ্রিড ও অফগ্রিড মিলিয়ে দেশে প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অতিরিক্ত ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫,৫০০ মেগাওয়াট আসবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে, ৪,৫০০ মেগাওয়াট ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে, এবং বাকি ৪৫০-৫০০ মেগাওয়াট আসবে বায়ু, বর্জ্য, হাইড্রো ও ভাসমান সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে। বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, নেট মিটারিং, ওপেক্স মডেল, স্মার্ট গ্রিড, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, সৌরচালিত সেচ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বায়োগ্যাস, বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং অবকাঠামো এবং ক্লিন কুকিং প্রযুক্তির সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অর্থায়ন সহজ করতে গঠন করা হচ্ছে একটি পৃথক নবায়নযোগ্য জ্বালানি তহবিল, সহজ শর্তে অর্থায়ন, ক্রেডিট গ্যারান্টি, কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার বিকাশ, আমদানি শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, কর অবকাশ এবং স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা। একইসঙ্গে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশগত সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—কৃষিজমির সুরক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, সৌর প্যানেল ও ব্যাটারির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার উদ্যোগ এর অন্তর্ভুক্ত। লক্ষণীয় বিষয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরিতে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এই রূপান্তরকে শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিকভাবেও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিদ্যুৎ বিভাগ ইতিমধ্যে একাধিক দিকনির্দেশনামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র বাস্তবায়নের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিং কর্মসূচির সম্প্রসারণ, গ্রিড আধুনিকীকরণ, জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রসার এবং জ্বালানি দক্ষতা ও সাশ্রয় বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে, ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সংযুক্তকরণের লক্ষ্যে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ও নেট মিটারিং কাঠামো এগিয়ে চলেছে, অনশোর উইন্ড নির্দেশিকা চূড়ান্ত হয়েছে এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল ও কর্মপরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হয়েছে। কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নির্দেশিকা প্রণয়নের কাজও চলমান।
জলবায়ু অর্থায়ন ও সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানো হচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার করা হচ্ছে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা - যেমন নেপাল-ভুটান থেকে সীমান্ত-বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তার বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গ্রিড সংযুক্তকরণ নিশ্চিত করার কাজও এগিয়ে চলেছে, যা ভবিষ্যতে দেশের বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গ্রিড স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে ৪০০/৭৬৫ কিলোভোল্ট সঞ্চালন নেটওয়ার্কের ব্যাপক সম্প্রসারণ, শতভাগ ফ্রিকোয়েন্সি গভর্নর অপারেশন ও অটোমেটিক জেনারেশন কন্ট্রোল বাস্তবায়ন এবং স্মার্ট/প্রিপেইড মিটারিং, স্কাডা ও জিআইএস-নির্ভর প্রযুক্তির প্রসার চলছে। শিল্প এলাকায় ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ নির্ভরতা কমিয়ে গ্রিড সরবরাহ জোরদার করার একটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ে এবং সামগ্রিক জাতীয় গ্রিডে লোড ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। বিদ্যুতের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে শুল্ক সমন্বয় করা হয়েছে, যা মূল্য কাঠামোকে আরও যৌক্তিক, জনবান্ধব ও স্বচ্ছ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০) কার্যকর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে চালু করা হবে একটি রিয়েল-টাইম অনলাইন মনিটরিং ড্যাশবোর্ড, যার মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি নিয়মিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভার মাধ্যমে কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হবে, এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে নীতিগত দিকনির্দেশনা, সমন্বয় ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত হবে একটি জাতীয় পলিসি কাউন্সিল। নীতি-প্রণয়ন থেকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক এই কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জমি, অর্থায়ন, গ্রিড সক্ষমতা কিংবা দক্ষ জনবলের প্রশ্নে এখনও অনেক কাজ বাকি। কিন্তু জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র এবং তার সঙ্গে যুক্ত সমন্বিত নীতি-কাঠামো প্রমাণ করে সরকার এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করতে বদ্ধপরিকর। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আর ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি জ্বালানি নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার, আমদানিনির্ভরতা কমানোর এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
এই রূপান্তর সফল করতে হলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকের সম্মিলিত অংশগ্রহণও জরুরি। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ থেকে শুরু করে জ্বালানি সাশ্রয়ী আচরণ গড়ে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই সচেতন অংশগ্রহণ এই যাত্রাকে বেগবান করবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বানুমেয় নীতি-পরিবেশ, দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা যতটা জরুরি, ঠিক ততটাই জরুরি স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি করা, যাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুফল দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনে।
লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়