বাংলাদেশকে শুধু ফুটবলের সমর্থক-নির্ভর দেশ হিসেবে নয়, মাঠে ফুটবল খেলা একটি দেশে পরিণত করতে চান জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলি। সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতি, অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
ডুলির ভাষায়, “আমরা সমর্থকের দেশ। আমাদের সেটা পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের ফুটবল খেলার দেশ হতে হবে।” বাংলাদেশের মানুষের ফুটলের প্রতি প্রবল আবেগ তাকে মুগ্ধ করলেও, এই আবেগকে মাঠের খেলায় রূপান্তর করাকেই তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, সেটিও ডুলির নজর এড়ায়নি। তিনি চান, বাংলাদেশের শিশুরা শুধু আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে না থেকে একদিন সেই দলগুলোর বিপক্ষে খেলার স্বপ্ন দেখুক। তাঁর মতে, এই মানসিক পরিবর্তনই হতে পারে বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।
তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় বাধা অবকাঠামোর ঘাটতি। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অসংখ্য বহুতল ভবনের মাঝে শিশুদের ফুটবল খেলার মাঠ খুবই অপ্রতুল—ডুলির চোখে এটি বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম মৌলিক সমস্যা। তাঁর পরিকল্পনায় তাই শুধু জাতীয় দলের উন্নয়ন নয়, স্থানীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলার সুযোগ ও একটি কার্যকর উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় দলের উন্নয়নে প্রবাসী ও বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদেরও কাজে লাগাতে চান ডুলি। লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী ইতোমধ্যে সেই উদ্যোগের অন্যতম উদাহরণ। পাশাপাশি বিদেশে থাকা সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করা হচ্ছে। তবে ডুলি স্পষ্ট করেছেন, শুধু বিদেশে খেললেই কাউকে দলে নেওয়া হবে না; যে খেলোয়াড় সত্যিই জাতীয় দলকে শক্তিশালী করতে পারবেন, তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় খেলোয়াড়দের উন্নয়নে অর্থ ও প্রশিক্ষণ বিনিয়োগের ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে ডুলির লক্ষ্য ধাপে ধাপে একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা। তাঁর বিশ্বাস, জাতীয় দলের সাফল্য বাড়লে দর্শক, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ বাড়বে। সেখান থেকেই গড়ে উঠবে যুব একাডেমি, তৃণমূল ফুটবল ও পেশাদার লিগকে যুক্ত করা একটি পূর্ণাঙ্গ ফুটবল পিরামিড।
বাংলাদেশ বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৮১তম অবস্থানে থাকলেও ডুলির বিশ্বাস, সঠিক খেলোয়াড়, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং খেলার ধরনে পরিবর্তন আনতে পারলে র্যাঙ্কিংয়ের ১৫০-এর মধ্যে ওঠা সম্ভব। তাঁর কাছে এটাই শেষ লক্ষ্য নয়; এশিয়ান কাপের পাশাপাশি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়াই বড় স্বপ্ন।
সামনে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে জাতীয় দলকে এগিয়ে নিতে চান ডুলি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে তাঁর লক্ষ্য আরও বড়—বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমকে শুধু গ্যালারি ও টেলিভিশনের উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি প্রজন্মকে মাঠে নামানো।সমর্থক থেকে খেলোয়াড়—বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে এই পরিবর্তনই থমাস ডুলির স্বপ্ন।