এবারের নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করার গুরুদায়িত্বে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবিও। ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’ বিধানের আওতায় তারা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে আহত শত ছাত্র-জনতাকে সহায়তা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণের পর এখন তারা নির্বাচনি দায়িত্বে সাফল্য দেখানোর পরীক্ষায়। ভোটের চার দিন আগে অর্থাৎ ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বিজিবি মোতায়েন শুরু হবে। তা চলবে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখরভাবে আয়োজন নিশ্চিত করতে রাজধানীসহ দেশের ৪৮৯টি উপজেলায় বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের মোট ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতেই মোতায়েন থাকবে তারা। বাকি থাকবে স›দ্বীপ, হাতিয়া, কুতুবদিয়া, দাকোপ, মনপুরা ও রাঙ্গাবালি এই ছয়টি উপজেলা। এ ঘোষণার আগে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি জানিয়েছে, নির্বাচনকালীন শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সারা দেশে এরই মধ্যে মোট ১ হাজার ১৫১ প্লাটুন মোতায়েন করা হয়েছে। 

বিজিবির ঐতিহ্য মূলত দেশের সীমান্ত রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, ও সার্বভৌমত্বে অটুট রাখার এক গৌরবময় ও বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস। এর সমান্তরালে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ভ‚মিকা রেখে আসছে সুদূর অতীত থেকে। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় প্রশাসনকে করে আসছে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজের সহযোগিতা। ভ‚মিকা রাখছে নারী ও শিশুসহ মাদকদ্রব্যের পাচার রোধেও। ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে দেশের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে, যা ২৩০ বছরেরও বেশি সময়ের গৌরব ও ত্যাগের ইতিহাস বহন করে। ব্রিটিশ আমলের ‘বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ’ থেকে ‘ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস’ ইপি আর হয়ে বিডিআর এবং সবশেষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি। ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ নামে এই বাহিনীর ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। 

দীর্ঘ দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের গৌরবময় এ পথচলায় মহান মুক্তিযুদ্ধে  ইপি আর সদস্যরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ১৪১ জন সদস্য বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য খেতাবপ্রাপ্ত হন। সাত জন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে দুজনই এই বাহিনীর ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ও ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ। এছাড়া আট জন বীর-উত্তম, ৩২ জন বীরবিক্রম এবং ৭৭ জন বীরপ্রতীক খেতাব অর্জন করেন। যার মধ্যে রয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ  কেবল সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে নিজেদের ঐতিহ্য ও গৌরব অক্ষুন্ন রেখে চলেছে বিজিবি। 

অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাহিনীটির কাঁধে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ রাইফেলস বিডিআর’। সেই থেকে আরো সাহস ও অভিজ্ঞতায় বিডিআরের সদস্যরা দেশের সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রম রোধে ব্যাপকভাবে কাজ করে আসছিল। ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় অবস্থিত বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক বিদ্রোহ। বিদ্রোহে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। বিদ্রোহের মূল কারণ হিসেবে বিডিআর সদস্যদের বেতনবৈষম্য, পদোন্নতির সুযোগ না পাওয়া এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথা উঠে আসে। এই বিদ্রোহ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কিন্তু, বাহিনীটি তাদের দায়িত্ব থেকে এক চুলও সরেনি। দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা, চোরাচালান, মাদক ও মানব পাচার প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তার মধ্য দিয়ে জনতার সঙ্গে তাদের একটি রসায়ন তৈরি হয়েছে। সীমান্তের নিরাপত্তা ও জাতীয় আস্থার প্রতীক হিসেবে বিজিবি ২৪ ঘণ্টা, সাত দিন, ৩৬৫ দিন দেশের প্রতিটি সীমান্তে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। 
দেশের প্রতিটি সীমানায় বিজিবি সদস্যদের আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা ও সাহসিকতা আমাদের চিরন্তন প্রেরণা। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় বা বিদ্যুৎ চমকানো রাত কোনো কিছুর কাছেই তাদের দায়িত্ববোধ হার মানে না। ঐতিহ্য, আত্মত্যাগ ও শৃঙ্খলার অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়ে তোলা বিজিবির সামনে এখন নির্বাচনি দায়িত্ব্ও। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের সঙ্গে তাদের নির্বাচনি দায়িত্বেও এভাবে সারথী হওয়া এ সময়ের জন্য অন্যতম একটি ভালো খবর। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সীমান্ত উত্তেজনা ও পুশইন রোধসহ বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজের আরেকটি অংশ নির্বাচনের এ দায়িত্ব। সময়ের স্রোতে বিজিবির কাঠামো, কার্যক্রম এবং দায়িত্বের ব্যাপক পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন হয়েছে। বাহিনীর কার্যক্রমে ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগ, প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারির জন্য আধুনিক সরঞ্জামাদি সংযোজন হয়েছে। বিজিবি এখন আন্তর্জাতিক মিশনেও অংশগ্রহণ করে দেশের গৌরব বৃদ্ধি করছে। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্ব ও মোতায়েন পরিকল্পনা চ‚ড়ান্ত করে পরিপত্র জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে নির্বাচন-পূর্ব, ভোটের দিন ও পরবর্তী সময়ের নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিপত্র অনুযায়ী, পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি, বিজিবি, র‍্যাব, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, নির্বাচনি কর্মকর্তা ও সরঞ্জামের সুরক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, এবারের নির্বাচনের সঙ্গে অন্য সময়ের নির্বাচনের তুলনা  চলে না। সময়, ঘটনা, প্রেক্ষাপটে সব বাহিনীর জন্যই এবারের নির্বাচন একটি পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উচ্চ নম্বরে পাশ করতেই হবে। নির্বাচনের মুখ্য দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও তা কেবল তাদেরই একার দায়িত্ব নয়। এখানে প্রার্থী, ভোটার, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অংশীজন অনেক। ইসি অনেকটা রেফারির মতো। জানা-বোঝার পরও এ কথাগুলো আবার বলার কারণ পতিত আওয়ামী লীগ সরকার দেড় দশকে জাতীয়-স্থানীয়, এমনকি পেশাজীবী নির্বাচনি ব্যবস্থাকেও শেষ করে দিয়ে গেছে। নির্বাচনকে এনে ঠেকিয়েছে একটা তামাশা-মশকরায়। যে কারণে নির্বাচন কমিশনকে পড়তে হয়েছে মহাইমানি পরীক্ষায়। জনমানুষের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের আকাক্সক্ষা পূরণের সরাসরি দায় পূরণ করতে হবে এই কমিশনকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে সহায়ক। প্রশ্নমুক্ত, অবাধ নির্বাচনের দাবি বা আশা তখনই আসে, যখন নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বা নাগরিক সমাজের মধ্যে উদ্বেগ থাকে। 

বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনি ব্যবস্থা বা ভোটগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যা ‘প্রশ্নহীন’ নির্বাচনের দাবিকে আরো জোরালো করে। স্বাধীনতার ৫৩-৫৪ বছরে এ দেশে ভোটের বহু মডেল প্রদর্শন হয়েছে বাংলাদেশে। এখানে গণতন্ত্রের বহু মারপ্যাঁচ। সব প্যাঁচ কাটিয়ে এবার অবাধ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের রেকর্ড গড়ার দায়িত্ব সবারই। কিন্তু, দায়িত্ব প্রশ্নে মানুষের সবার আগে চোখ যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে। কোন বাহিনীটি কেমন দায়িত্ব পালন করে, মানুষ সেদিকে বেশি তাকায়। আর অনিবার্য কিছু কারণে বিজিবির দিকে এবার আরেকটু বেশি পর্যবেক্ষণের চোখ ফেলবে মানুষ।  

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews