বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এ ফলাফলকে ঘিরে সতর্ক আশাবাদ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে ভারত। নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে, অন্তর্বর্তী সময় শেষ হয়ে নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতীয় সরকারের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো বলেছে, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারই দুই দেশের সম্পর্কে স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারে—এ অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে ধরে রেখেছে নয়াদিল্লি। তাদের মতে, সাম্প্রতিক ভোটের রায় সেই বিশ্বাসকে জোরদার করেছে।
নয়াদিল্লির কৌশলগত মূল্যায়নে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময়টিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অস্থিরতার পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনর্বহালে বিলম্ব, ‘অরাজকতা উৎসাহিত করা’ এবং দ্বিপক্ষীয় টানাপোড়েনের জন্য ভারত ও ভারতীয় গণমাধ্যমকে দায়ী করার প্রবণতা সম্পর্কের অবনতির কারণ হয়েছে। এ বর্ণনাকে ভারত প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্তই পরিস্থিতির অবনতি ডেকে আনে।
ভারতীয় সরকারি সূত্র এনডিটিভিকে জানিয়েছে, ‘জনপ্রিয় ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই ভারত সবসময় সম্পৃক্ত থেকেছে।’ এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সরকারই ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।’ তাঁর মতে, এবারের রায় ‘উদার মূল্যবোধ ও ১৯৭১ সালের চেতনার প্রতি সম্মানকে সমর্থন করেছে।’
অন্তর্বর্তী সময়ে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও ভীতির ঘটনায় দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব ছিল—এটি ভারতের কাছে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। দিল্লির দাবি, ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্যভাবে উদ্বেগ জানালেও তা যথাযথভাবে সমাধান হয়নি, ফলে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। একই সঙ্গে ইসলামপন্থী প্রান্তিক গোষ্ঠী ও পাকিস্তানপন্থী উপাদান রাজনৈতিক পরিসরে বেশি সুযোগ পেয়েছে বলেও ভারতীয় মহলের অভিযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তনকে ‘উপযুক্ত সময়’ হিসেবে দেখছে ভারত। এখন নজর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে। অতীতে বিএনপি সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্য ছিল স্বীকার করলেও, বর্তমান বাস্তবতায় তিনি আরও বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থান নেবেন—এমন আশা করছে নয়াদিল্লি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলার কথা জানিয়ে নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানান। তিনি দুই দেশের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির প্রতি ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথা উল্লেখ করেন।
কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ভারতীয় সূত্রগুলো। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে সেখানে ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারেন। এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ সফর করেন।
ভারতের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট—গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন, গঠনমূলক সম্পৃক্ততা এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন; পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ে সতর্ক নজর রাখা। নয়াদিল্লির মতে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাই দুই দেশের ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের ভিত্তি হতে পারে।