গত ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে দেশে যে নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে সেটাকে শুভই বলতে হবে। কারণ, দেশের দুই প্রধান দল বিএনপি ও জামায়াত এবং তাদের দুই শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমান যথাক্রমে ঢাকা ও সিলেটে বড় জনসভা করে তাদের ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন। আগেই বলেছি যে, শুরুটা ভালোই। কারণ, নির্বাচনী প্রচারণায় অতীতে দেখা গেছে, সমালোচনার নামে দল বা ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে পার্সোনাল অ্যাটাক। অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে মারামারি এবং খুনাখুনি। ২৫ জানুয়ারি সকালে যখন এই কলামটি লিখছি তখন পর্যন্ত দেশের কোথাও বড় ধরনের কোনো গোলযোগ বা সংঘর্ষ হয়নি। দৈনিক ‘যুগান্তর’ ও ‘মানবজমিনে’ দেখলাম, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পিরোজপুর প্রভৃতি জায়গায় ছোট খাটো ঘটনা ঘটেছে, যেটিকে কোনো সংঘর্ষ বলা যায় না। যেখানে ৩০০টি আসন, যেখানে ভোট কেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৭৪১টি, সেখানে এ ধরনের তুচ্ছ ঘটনা ঘটতেই পারে। গত ২৪ তারিখ পর্যন্ত যে বিষয়টি আমাকে ইমপ্রেস করেছে সেটি হলো, এ পর্যন্ত বিএনপি প্রধান এবং জামায়াত প্রধান ঢাকার বাইরে একাধিক জেলায় বড় বড় জনসভা করেছেন। কোথাও তারা কেউই সমালোচনার ভাষা আক্রমণাত্মক করেননি। এই ৩ দিনে এটিই আমার কাছে নির্বাচনের সবচেয়ে ভালো দিক বলে মনে হয়। কারণ, আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ভারত একটি বড় গন্ডগোল পাকানোর ষড়যন্ত্র করছে। তারা এবার শেখ হাসিনাকে লাইম লাইটে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ ভারতে বসে বাংলাদেশ বিরোধী রাজনীতি করার জন্য ইন্ডিয়া শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে পারমিশন দিয়েছে। জায়গা কুলালে আমি কিছুক্ষণ পর ঐ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করবো।
এই নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমের এমন অবাধ স্বাধীনতা আমি বিগত ৫৪ বছর দেখিনি। যার যা মনে হচ্ছে তিনি তাই লিখে যাচ্ছেন। যার যা মনে হচ্ছে তিনি তাই টেলিভিশনে টকশোতে বলে যাচ্ছেন। যার যা মনে হচ্ছে তিনি তাই ইউটিউবে আপলোড করছেন। আমি ইউটিউবে এমন ভিডিও দেখেছি যেখানে জুলাই বিপ্লবকে খাটো করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নাই। কিন্তু তাদের প্রেতাত্মারা রয়ে গেছে। তারা এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানকেও জুলাই বিপ্লবের চেয়ে বড় করে তুলে ধরছে। মানুষ যেমন পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করে, তেমনি বেহুদা ঐ লোকগুলো ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে জুলাই বিপ্লবের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করায় এবং দাঁড় করিয়ে জুলাই বিপ্লবকে খাটো করে দেখানোর অপচেষ্টা করে। অথচ, জুলাই বিপ্লবের সাথে ’৭১ এর কোনো সংঘাত নেই। বস্তুত ’৪৭, ’৭১ এবং ’২৪ একই সূত্রে গাঁথা।
যতই দিন যাচ্ছে ততই তারা উত্তরবঙ্গের ভাষায় ‘উদান মাথা’ পাচ্ছে। জানি না নির্বাচন যতো এগিয়ে আসবে ততো তারা আর কতো স্বাধীনতা ভোগ করবে? স্বাধীনতারও একটি লিমিট আছে। কিন্তু এরা কোনো লিমিট মানছে না। আর সরকারের চামড়াও মনে হয় গন্ডারের চামড়া। সকলেই জানেন, ধর্ম, রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী এবং বিচার বিভাগ সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক উক্তি করা যাবে না। কিন্তু সেগুলিও ওরা মানছে না। তবে সুখের বিষয় হলো এই যে, ওরা সংখ্যায় হাতে গোনা। অতীতে ওরা গণমাধ্যম দখল করেছিলো। এখন গণমাধ্যম ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমেও ওদের দাপট বাড়ছে।
তারপরেও বলবো এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অনেক ভালো। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি থেকে নির্বাচন করছেন যথাক্রমে ২৮৮, ২২৪ এবং ৩২ জন প্রার্থী। সিপিবি ৬৫, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ৩৪, ইসলামী আন্দোলন ২৫৩, জিএম কাদেরের জাতীয় পার্টি ১৯২, এলডিপি ৭, এবি পার্টি ৩, জাসদ রব ১, নাগরিক ঐক্য ১২। এবার রেজিস্টার্ড ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লক্ষ। এদের মধ্যে তরুণ ভোটার সংখ্যা ৫ কোটি ৫৬ লক্ষ। বাংলাদেশ সরকারের মান মোতাবেক তরুণরা হলেন ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষ। আর এখানে যে ৫ কোটি ৫৬ লক্ষ ভোটারদের তরুণ বলা হয়েছে তারা হলেন ১৮ থেকে ৩৭ এজ গ্রুপের মানুষ।
॥দুই॥
এই এজ গ্রুপের মানুষ শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত তামাশার ৩টি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। এমনকি এতদিন ধরে গলাবাজি করে বলা হচ্ছিলো যে, ২০০৮ সালের ভোট নাকি ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হয়েছে। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে নতুন কথা। ঐ ভোটের আগে দিল্লীতে নাকি আমেরিকা এবং ভারতের রাষ্ট্রদূতরা বসেছিলেন। তারা উভয়েই যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন তৎকালীন সেনা প্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদের সাথে। সেখানেই নাকি ঠিক হয় যে, এবার (২০০৮ সালে) ইলেকশনে ক্ষমতায় আনতে হবে আওয়ামী লীগকে। কারণ, আওয়ামী লীগই পারবে ইসলামী জঙ্গিবাদকে শায়েস্তা করতে।
যাই হোক, সেদিন হয়েছে বাসি। ২০০৮ সালে ভোটার ছিলো ৮ কোটি ১০ লক্ষ ৮৭ হাজার। আর আগেই বলেছি, এবার ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লক্ষ ৯৫ হাজার। অর্থাৎ বিগত ১৭ বছরে ভোটার সংখ্যা বেড়েছে ৪ কোটি ৬৬ লক্ষ ৮ হাজার ১৮০। এবার ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটাররা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এই ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ ভোটার ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। তাদের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই ভোট দেবেন এবং তারাই হবেন এবারের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর।
এদের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো যে আগামী ৫ বছরের জন্য তারা কোন ইস্যুটিকে প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার দেবেন? উত্তরে ৬৭ শতাংশ বলেছেন দুর্নীতি দমন। ৫৬ শতাংশ প্রায়োরিটি দিয়েছেন বেকারত্বের ওপর। ২৪ শতাংশ নিরাপত্তার ওপর এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর মাত্র ১৪ শতাংশ। কাজেই আমরা গণতন্ত্রের জন্য যতই গলা ফাটাই না কেনো, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু দুর্নীতি এবং বেকারত্বের অবসান চান। যে দল বা জোট দুর্নীতি দূর করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে বলে তাদের কাছে মনে হবে, তাদেরকেই তারা এবার বেছে নেবেন।
ঠিক এই কারণে আমি এবার কোনো নির্বাচনী পূর্বাভাসের মধ্যে যাচ্ছি না। যদিও গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), আলজাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, রয়টার্স প্রভৃতি বিশ^বিখ্যাত সংস্থা নানান রকম মন্তব্য ও পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে আমি অতীতে দেখেছি, ভারতের লোকসভা এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কিত পূর্বাভাস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক প্রমাণিত হয় নাই।
॥তিন॥
আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে আমি আশাবাদী এবং তাই অনেক ইতিবাচক কথা বললাম। তবে একটি বিষয় আমাকে হতাশ করেছে। সেটি হলো, বিদেশি নাগরিক হওয়া আমাদের সংবিধানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় অযোগ্য ঘোষণা করেছে। তারপরেও ২৫ জনের মধ্যে ২২ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ব্যাপারে দৈনিক ইনকিলাবের ১৯ জানুয়ারির সংখ্যায় যে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে সেই রিপোর্টটি পড়ার পর কারো মনে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকবে না যে, বিদেশি নাগরিকদের নির্বাচনে অংশ গ্রহণের অনুমতি দেওয়া সংবিধানের গ্রস ভায়োলেশন। ইনকিলাবের ঐ খবরটির শিরোনাম, ‘এমপি পদে দ্বৈত নাগরিকত্ব সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি করবে।’
ঐ রিপোর্টে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি মামলার আদেশের রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে। রেফারেন্স নাম্বার হলো, রিট নম্বর-১৬৪৬৩/২০২৩। হাইকোর্ট বিভাগ বলেছেন, ‘নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হিসাবেই বিবেচিত থাকবেন। কেবল আবেদন করাই নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া (যেদেশের নাগরিকত্ব তারা গ্রহণ করেছেন) অফিসিয়ালি না জানাচ্ছে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন গৃহীত হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন। এই বিষয়টি ইসি রিজিডলি ফলো করেছেন বলে আমার মনে হয় না।’
ইনকিলাবের ঐ রিপোর্টে আরো বলা হয়, ‘বৃটিশ ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট ১৯৮১-এর ১২ ধারা অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। একজন নাগরিককে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ডিক্লারেশন অব রেনানসিয়েশন (ফর্ম আরএন) প্রদান করতে হয়। এর জন্য ৪৮২ পাউন্ড ফি জমা দিতে হয়। স্বরাষ্ট্র সচিবের দফতরে এই ঘোষণা নিবন্ধিত হওয়ার পরেই কেবল নাগরিকত্ব কার্যকরভাবে সমাপ্ত হয়।’
রিপোর্টে আরো বলা হয়, ‘মার্কিন পাসপোর্ট ত্যাগের শর্তাবলীতেও একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট (সেকশন ৩৪৯(এ)) অনুযায়ী নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থিত কোনও দূতাবাস বা কনস্যুলটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কনস্যুলার অফিসারের সামনে শপথ নিতে হয়। এর জন্য প্রায় ২,৩৫০ ডলার ফি গুণতে হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ‘সার্টিফিকেট অব লস অব ন্যাশনালিটি’ (সিএলএন) প্রদান করা হলে তবেই তিনি নাগরিকত্ব হারাবেন।’
এসব বিষয় কঠোরভাবে অনুসরণ না করায় দেশের উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং সংবিধানকে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করেছে ইসি।
এর মধ্যে আরেকটি গুরুতর বিষয় ঘটে গেছে। গত ২৩ জানুয়ারি শুক্রবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে ইউনূসকে বার বার ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে তীব্র আক্রমণ চালান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ না দেওয়ায় কাল বিলম্ব না করে ইউনূস সরকারের পতনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আওয়ামী লীগার এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহবান জানান। একই সাথে আসন্ন নির্বাচন ভন্ডুল করার জন্যও তিনি আহবান জানান।
আমরা জানি, শেখ হাসিনার এই সব আহবানে কোনো কাজ হবে না। হয়তো কিছু নাশকতামূলক সহিংস হামলা হবে। কিন্তু ভারতের রাজধানী দিল্লীতে বিদেশি সংবাদদাতাদের সাথে শেখ হাসিনাকে অনলাইনে যুক্ত হওয়ার পারমিশন দিয়ে ভারত সরকার প্রকাশ্যে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা চালানোর অনুমতি দিলো। তারা, সোজা কথায়, হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে মাঠে নামিয়ে দিলো। এর আগে ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার দিল্লীতে বাংলাদেশের বিতাড়িত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এবং শিক্ষামন্ত্রী নওফেলকে সংবাদ সম্মেলন করার অনুমতি দেয় দিল্লী।
এর পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ও ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, বাংলাদেশে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভিনা সিক্রি, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণ, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী প্রমুখ।
এসব ঘটনা থেকে পরিষ্কার যে ইলেকশনের আগে এবং ইলেকশনের পরেও ভারত বাংলাদেশের বর্তমান এবং পরবর্তী সরকারকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।
Email:[email protected]